পড়ন্ত বিকেলের মিষ্টি রোদে ঝকঝক করছে কৃষ্ণ সাগরের জল। একদিকে কাফা শহরের দেয়ালের ওপাশে গমগম করেছে বণিকের দল। বাজারে গ্রিক, তুর্কি আর ইতালীয় ভাষায় চলছে বিকিকিনি। আর অন্যদিকে, এক দল সামন্ত নিয়ে কাফা শহরের দুর্গের দিকে এগিয়ে আসছে উজবেক খানের পুত্র, খান জানি বেগ। ২০ সে মে, ১৩৪৬ এর সেই সন্ধ্যা পৃথিবীর ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।
ইউরোপ তখন শত বছরের যুদ্ধে শ্রান্ত। দিল্লী সালতানাতে উপবিষ্ট মুহম্মদ বিন তুঘলক। চীন, তখন সম্রাট ইউয়ানের শাসনাধীন। সিল্ক রুটে বাণিজ্য তখনও সচল। কাফা বন্দর নগরী, ছিল জেনোয়া প্রজাতন্ত্রের অংশ; মধ্যযুগীয় ইতালির অন্যতম শক্তিশালী সামুদ্রিক প্রজাতন্ত্র, ভেনিসের সমকক্ষ। জেনোয়া ক্রাইমিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র সেসময়। মহাদেশ জয় করে নয়, বরং সিল্ক রুট আর জাহাজপথে বণিকদের সহায়তায় সম্পদ গড়ে তুলেছিল কাফা। ভূমধ্যসাগর ও কৃষ্ণসাগর জুড়ে বিস্তৃত ছিল ক্রাইমিয়ার উপনিবেশ। সেই পূর্বাঞ্চলীয় রত্নগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এই নগরী। রেশমপথের কাফেলাগুলো এসে পৌঁছাত ক্রাইমিয়ায়। সেখান থেকে কৃষ্ণসাগরের জাহাজপথ ধরে পণ্য যেত ভূমধ্যসাগরে, ইতালিতে, তারপর ইউরোপের অন্যান্য দিকে। এশিয়ার রেশম, দূরদেশের মসলা, উত্তরের পশম, শস্য ও দাস, সব এসে যেন মিলতো এখানে। মুদ্রার আদানপ্রদান, নানা ভাষার-নানা রঙের মানুষের মিলন মেলা ছিল কাফা বন্দর।
মোঙ্গলদের বেশ লোভ ছিল এই নগরটির ওপর। তখন চেঙ্গিস খানের সাম্রাজ্য বিস্তৃতির যবনিকাপাত ঘটেছে। এই সাহসী যোদ্ধার মৃত্যু ঘটেছে প্রায় এক শতাব্দী হলো। মোঙ্গলরা তখন বিক্ষিপ্ত, বিভক্ত। জেনোয়া আর এর কাফা নগর ছিল কৃষ্ণ সাগরের উত্তরের রাজ্যের সমৃদ্ধির প্রতীক, যা জানি বেগ তাঁর সৈন্য সামন্ত নিয়ে উত্তর পূর্ব দিক থেকে আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। তবে, তিনি জানতেন না যে এই সৈন্যদলের ভেতর কি অদৃশ্য শত্রু লুক্কায়িত আছে!
জানি বেগের সৈন্যদল ঘোড়সোয়ারি হয়ে অপেক্ষায় কাফার দুর্গভেদের। এরই ভেতর, ব্ল্যাক ডেথ মহামারীতে সৈনদের মৃত্যু হতে শুরু করলো। ইয়েরসিনিয়া পেস্টিস নামের ব্যাক্টেরিয়া সংক্রমিত হয়েছিল পুরো জানি বেগ সৈন্যকুলে। তবে জানি বেগকে যে তখন কাফা দখল করতেই হবে। অনেক শ্রম দিয়ে তাঁরা পৌঁছেছে ক্রিস সাগরের পাড়ে। কথিত আছে, এই যুদ্ধ জানি বেগ মৃত সৈন্যের দেহাবশেষ (কাফার দেয়ালের ওপর দিয়ে ) ছুঁড়ে ফেলে ব্ল্যাক ডেথের সাহায্যে জয় চেয়েছিলেন। এমনটি ঘটেছিল কিনা বলা মুশকিল, তবে বণিকদের মাঝে অদৃশ্য জীবাণুর প্রসার ও সংক্রমণের ইতিহাস ঠিক এমনই পুরাতন, ঐতিহাসিক। কাফা আক্রমণ পরবর্তী সময়ে বণিকদের মাধ্যমেই এই জীবাণু পরবর্তী ৭ বছরে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে যায় এবং এই মহাদেশের প্রায় ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ জনগোষ্ঠীকে নির্মূল করে ছাড়ে। অদৃশ্য এক অণুজীবের এমনি অসাধারণ ক্ষমতা!

আজকের পৃথিবীও জীবাণুর আক্রমণের কাছে নতজানু। ২০১৯-২০২১ এর অতিমারীর কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত। আক্রান্ত প্রায় ৬০,০০০ এরও বেশি আর মৃত শিশুর সংখ্যা প্রায় ৫০০ ছুঁইছুঁই। মাত্র দুই মাসের ভেতর এই আউটব্রেক ঘটে গেল। এখন আবার হান্টা ভাইরাস আর ইবোলা ভাইরাসের প্রসারের ভয়ে পরিশ্রান্ত বিশ্ব!
আগামী কয়েক দশকে ব্যাকটেরিয়া আর ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব বেড়েই চলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে একদিকে যেমন হিমবাহের গলন আর পার্মাফ্রস্টের বিনষ্টিতে নতুন জীবাণু বেরিয়ে আসবে, তেমনি তাপমাত্রা বাড়ার সাথে সাথে, নানা জীবাণুর সংক্রমণ ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করতে সক্ষম হবে। এরা হবে আরো বেশি সক্রিয়। এমন ভবিষ্যৎ কাল্পনিক নয়। বরং এদিকেই এগোচ্ছে পৃথিবী। একের পর এক বৈজ্ঞানিক সন্দর্ভে বলা হচ্ছে যে প্রাণীবাহিত বা জুনোটিক ভাইরাসের সংক্রমণ বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সাথে বাড়বে ও ছড়াবে। যেমন স্নেল ফিভার বা সিস্টোসোমিয়াসিস আফ্রিকা থেকে ছড়াতে পারে যুক্তরাষ্ট্রে। মশাবাহিত ডেঙ্গু দেখা দিতে পারে ইউরোপে। ইবোলা পৌঁছতে পারে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত। হান্টা ভাইরাস, ইঁদুর-বাহিত। এর প্রসার রুখতে হিমশিম খাচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।
অন্যদিকে বাংলাদেশের মতো মধ্যআয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও সেখানে অবাধে ব্যবহৃত এন্টিবায়োটিক, জীবাণুর মিউটেশনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। বিজ্ঞানে এটি অজানা নয় যে, একই পরিবেশে থাকতে থাকতে যে কোনো জীবাণু, বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়া অভিযোজন প্রক্রিয়ায় রূপান্তরিত হয়ে পড়ে। অর্থাৎ, মিউটেট করে। এন্টিবায়োটিকের অতি ব্যবহার এন্টিবায়োটিক-রেসিস্টেন্ট ব্যাক্টেরিয়ার প্রসারে তাই সহায়তা করে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশের অধিকাংশ হাসপাতালের ব্যাক্টেরিয়া নানা ঔষধের সংস্পর্শে বেড়ে উঠবার কারণে অনেক বেশি শক্তিশালী ও সংক্রমণ প্রবল। এধরণের জীবাণুকে হসপিটাল-একোয়ার্ড ব্যাক্টেরিয়া বা সুপার বাগও বলা হয়ে থাকে। ব্রড স্পেকট্রাম এন্টিবায়োটিক আর এ ক্ষেত্রে কার্যকর হয়না।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো খামারবাড়িতে এন্টিবায়োটিকের অপব্যবহার। এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত যে চিকিৎসার প্রয়োজনের চেয়ে কম ডোজে, অর্থাৎ সাব-ক্লিনিক্যাল ডোজে এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করে ফার্মের মুরগি ও অন্যান্য পশুপাখি মোটাতাজাকরণ করা হয়ে থাকে। অর্থাৎ, ফার্মের পশু দ্রুত ওজনে বাড়ে। সেই সাথে বাড়ে দোকানির মুনাফা। তাই, ফার্মের গরুর দুধ একটি শিশু নিয়মিত পান করলে, দুধের পুষ্টির পাশাপাশি রোগ ছাড়াই সেই শিশু এন্টিবায়োটিক সেবন করতে থাকবে। এতে তার শরীরের রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা হারাবে ক্রমশঃ। অন্যদিকে, অতিরিক্ত এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করলে পশুপাখির বর্জ্যের সাথে তা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়বে। এতেও ব্যাক্টেরিয়া হয়ে পড়বে এন্টিবায়োটিক-রেসিস্টেন্ট। এই বিষয়গুলো বিশদভাবে আলোচিত হয়েছে মার্টিন ব্লেজারের সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘মিসিং মাইক্রোবস’-এ।
এখন আমাদের করণীয় কী? করণীয় হলো, সংক্রামক জীবাণু সম্পর্কে সচেতন থেকে এর প্রতিরোধ, প্রতিকার, ও চিকিৎসার ব্যবস্থা তৈরী রাখা। এন্টিবায়োটিকের গবেষণাতে ব্রড স্পেকট্রাম এন্টিবায়োটিকের জায়গায় ব্যাকটেরিয়া-স্পেসিফিক এন্টিবায়োটিকের দিকে নজর দেয়া। খামার বাড়িতে অযথা, মুনাফার জন্যে এন্টিবায়োটিকের ব্যবহারকে রোহিত করা।
আগামীতে কোনো দৃশ্যমান সৈন্যদলের কাছে পরাজয় নয়, বরং অদৃশ্য জীবাণুর আক্রমণেই ন্যুব্জ হবে মানবজাতি। পৃথিবীর ভবিষ্যতের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা এই অদৃশ্য অণুজীবদের প্রতি কড়া নজর রাখা ছাড়া আমাদের কীই বা করার আছে?
২২ মে, ২০২৬

ড. নাভিদ সালেহ | অস্টিন, টেক্সাস, যুক্তরাষ্ট্র
ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিন-এ পুরঃ, স্থাপত্য ও পরিবেশ কৌশল অনুষদের অধ্যাপক।
