বড় হয়ে ওঠাটা স্বর্ণযুগে, ১৯৬১ থেকে ১৯৯০ খুব কাছ থেকে স্বর্ণযুগের বাংলা গানের তৈরি হওয়া দেখেছি, ১৯৭৯ থেকে গান তৈরির সঙ্গে অল্পবিশেষ যুক্ত থাকতে পেরেছি। আমার পরম সৌভাগ্য আমার পিতৃদেব গীতিকার ও সুরকার শ্রী সুধীন দাশগুপ্ত। সেই সুবাদে বাড়িতে বসেই বহু কালজয়ী বাংলা গানের জন্ম হতে দেখেছি।
স্বর্ণযুগের বাংলা গানের সঙ্গে এখনকার গানের পার্থক্য কি? আদৌ কি কোনো পার্থক্য আছে নাকি এ আমাদের একরকমের ভ্রম? সত্যিই কি আধুনিক বাংলা গান বিপন্ন? এই নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে, আমরা না হয় আরেকটু করি।
পঞ্চাশ, ষাট, সত্তরের দশকে সারা বিশ্বজুড়ে অভিনব সাংস্কৃতিক বিপ্লব ঘটেছিলো। সাহিত্য, গানবাজনা, চলচ্চিত্র, নাচ, থিয়েটার, অঙ্কন, সমগ্র চারুকলার ক্ষেত্রেই পৃথিবীতে এসেছিলো এক অভূতপূর্ব সৃজনশীলতার জোয়ার। গানবাজনার ক্ষেত্রে মার্কিন মুলুকে Woodie Guthrie, Bob Dylan, Pete Seeger, Joan Baez, Paul Simon, Elvis Presley, Jimi Hendrix, Grateful Dead, ব্রিটেনে The Beatles, Rolling Stones, The Who, Deep Purple, Led Zeppelin, Eric Clapton, Jeff Beck, Pink Floyd আর সেই সঙ্গে বাংলা আধুনিক গানের জগতে সলিল চৌধুরী, সুধীন দাশগুপ্ত, নচিকেতা ঘোষ, সচিন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, মান্না দে, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, গীতা দত্ত, আরতি মুখোপাধ্যায়, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁশলে, বনশ্রী সেনগুপ্ত, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায় – চারিদিকে এতটাই সৃজনশীলতা, কাকে আগে শুনবো, সেটা স্থির করাটা কঠিন কাজ ছিল। আরো আগে কমল দাশগুপ্ত, অনিল বিশ্বাস, হিমাংশু দত্ত, প্রমুখ ব্যক্তিত্ব আধুনিক বাংলা গানকে সমৃদ্ধ করে গেছেন। অখিলবন্ধু ঘোষ কে বাঙালি অনেক পরে চিনতে শিখেছে। জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র স্বর্ণযুগের আরেক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
১৯৯০ নাগাদ আধুনিক বাংলা গানের ক্ষেত্রে একটা বড়ো পরিবর্তন আসে। সুমন চট্টোপাধ্যায়, মহীনের ঘোড়াগুলি, নগর ফিলোমেল, অঞ্জন দত্ত, নচিকেতা চক্রবর্তীদের হাত ধরে আসে তথাকথিত “জীবনমুখী গান” এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এই ধরণের গানের জনপ্রিয়তা খূবই।
পার্থক্যগুলো কোথায়? কি কি ব্যাপার পাল্টে গেল দেখা যাক:
১. গানের সংখ্যা
সেই সময়ে সারা বছরে ১৫০-২০০ গান বেরোতো, বা হয়তো তারও কম। বাবা বছরে ৩-৪টে সিনেমায় সুর দিতেন। সিনেমা প্রতি ৪টে গান অর্থাৎ ১২-১৬ টা সিনেমার গান আর পুজোর সময়ে ৮-১০টা গান, সব মিলিয়ে বছরে ২০-২৬টা গান। নচিকেতা ঘোষ মশাইয়ের সুরেও ২০-২৫টা গান হতো। সলিল চৌধুরীর সুরে একটু কমসংখক বাংলা গান হতো কারণ উনি মুম্বাই বা কেরালাতে বেশি সময়টা থাকতেন। রাহুল দেব বর্মনের ব্যাপারেও তাই। তো সব মিলিয়ে সারা বছরে ওই ২০০টি আধুনিক বাংলা গান।
কমসংখক গান তৈরী হতো বলে প্রতি গানের পেছনে সময়টা অনেক বেশি দিতে পারতেন স্রষ্টারা। আজকাল এক মাসে হয়তো ২০০ গান বেরোয়। এই কারণে গান তৈরির প্রতি সময়টা অতখানি আর দেওয়া সম্ভব নয়। আর এতো গান তৈরী হওয়াতে শ্রোতার ধৈর্য্য যেন একটু কমের দিকে। ভালো গান তৈরী হলেও ভিড়ের মাঝে যেন হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা ছোটবেলায় নতুন গান ভালো লাগলে পরপর ৪-৫ বার শুনে ফেলতাম রেকর্ড চালিয়ে। অথবা রেডিওতে শোনার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকতাম। আজকাল একটা গান মানুষে ৩০ সেকেন্ডও শোনেনা। অনেকের মতে ভালো গান তৈরী হচ্ছেনা তাই বেশীক্ষন শোনা যাচ্ছেনা। আমার নিজস্ব ধারণা ব্যাপারটা একটু অন্যরকম – মানুষ সারাক্ষণ দৌড়চ্ছে আজকাল। চুপচাপ বসে গান শোনার ধৈর্যটুকু অনেকটাই কমে গেছে।
২. কথা আগে না সুর আগে
আগে কথা পরে সুর, অথবা কথা ও সুর একসাথে, এইটা স্বাভাবিক ছিল আগে। এতে কথা আর সুরের মেলবন্ধনটা হয়তো একটু আরো ভালো হতো। কোনো একটা সময় এটা উল্টে যায়। একান্তই আমার নিজের মতে মনে হয়েছে মেলবন্ধনটা একটু মার খাচ্ছে। অবশ্য, এভাবে অনেক সুন্দর গান যে তৈরী হয়নি, তা একেবারেই নয়। সেটাও হয়েছে। কিন্তু সামগ্রিক বিচারে কথা আগে, সুর পরেটা বোধহয় অনেকটাই বেশি নান্দনিক।
৩. বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ
একটা ভালো আধুনিক গান তৈরী করতে যেগুলো প্রয়োজনীয়, সেগুলো হলো ভালো কথা, ভালো সুর, তাল এবং সঠিক বাদ্যযন্ত্রের প্রয়োগ। একটা গান যখন গাওয়া হয়, তখন সেই গানের পেছনে অনেক কিছু বাজতে থাকে। এগুলো সব গানের arrangement এর ওপর নির্ভরশীল। কখনো বা harmony notes, কখনো বা obligato parts বা counterparts বা fugue, এরকম নানারকমের অলংকারের ব্যবহার গানকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করে তোলে। এছাড়া আছে ঠিক জায়গায় ঠিক যন্ত্রের প্রয়োগ যাতে গানের ভাবনা (mood) টা আরো সুন্দর করে বেরিয়ে আসে। এই পুরো ব্যাপারটা আজকাল ঠিকভাবে হচ্ছেনা। তার বিভিন্ন কারণ আছে। প্রথম কারণ অর্থনৈতিক। ২০ জন যন্ত্রী যদি বাজান, তাহলে খরচটা সাংঘাতিকভাবে বেড়ে যাবে। তার চেয়ে বরঞ্চ একজন কিবোর্ডিস্ট কে দিয়ে যদি পুরো arrangement টা প্রোগ্রামিং করিয়ে নেওয়া যায়, অনেকটা খরচ বেঁচে যায়। কিন্তু এই পথটা সবসময়ে ঠিকমতো ফল দেয়না। আগেকার দিনের গানের থেকে আজকের গানের arrangement এর আকাশ পাতাল তফাৎ।
৪. ডিজিটাল পরিবেশ
ডিজিটাল রেকর্ডিং এর যুগে সবকিছু একদম ঠিকঠাক (perfect) হতে হবে। তালের লয় (speed – beats per minute) কখনো একটুও এদিক ওদিক হতে পারবেনা। সুর কখনো একটুও এদিক ওদিক যেতে পারবেনা (যে কারণে আজকে সব গায়ক বা গায়িকা দের pitch correction টা করা আবশ্যিক) আগে কিন্তু এরকম ছিল না। সুর এবং লয় দুটোই একটু এদিক ওদিক হতো। এই ছোট ছোট ত্রুটিগুলি গানগুলো কে অনেক বেশি মানবিক (humane) করতো এবং শুনতেও স্বাভাবিক লাগতো। খুব বেশি পারফেকশন শুনতে এতটা ভালো লাগেনা। কিন্তু আজকের দিনে এর বিকল্প নেই (যতদিন না আমরা analog recording এ ফেরত যেতে পারছি) কারণ কিবোর্ডের perfect pitch আমাদের পথ দেখাচ্ছে।
৫. গানের কথা
গানের কথার ধারা অনেকটাই পাল্টে গেছে আজকাল। কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব সাধারণ কথা, কখনো দুর্বোধ্য ভাষায় লেখা গান মানুষ ঠিকমতো নিতে পারছেনা। আগে গানের কথার একটা নিজস্ব ধারা ছিল। সেটা আজকে নেই। যে কোনো রকমের কথাই চলবে। আসলে চললে যে হবেনা, ভালো লাগতে হবে, এই বিচারটা করা উচিৎ। অনেক ভালো লেখা আজও হয় কিন্তু অন্যটা পাল্লায় বেশি ভারী।
৬. Subaltern culture
Subaltern culture খারাপ কিছু নয় কিন্তু এই ব্যাপারটা যেন আজকাল mainstream-এ একটু বেশিই চলে এসেছে। দুম্দারাক্কা গানবাজনা আজকাল একটু বেশিই শোনা যাচ্ছে, তার সঙ্গে উদ্ভট কথা সোনায় সোহাগা। লোকে ভালো সাহিত্য পড়তে ভুলে যাচ্ছে ক্রমশঃ, কাজেই গানের কথা আজ এতটা মানে রাখছে না সাধারণ জনতার কাছে। এই ব্যাপারটা খুবই আশংকাজনক।
৭. গান দেখা আগে, শোনা পরে
নতুন গানের সঙ্গে ভিডিও করাটা এখন আবশ্যিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটার মানে একটাই, লোকে শোনে কম, দেখে বেশি। খুবই বাজে ধারা (trend) এটা। অহেতুক পয়সার শ্রাদ্ধ হচ্ছে এতে। অথচ গানের অডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য পয়সা নেই। কাজেই শিল্পীদের একাগ্রতা আজকাল visuals-এর দিকে বেশি, audio-র দিকে কম। খুবই চিন্তার বিষয়।
এখন উপায় কি? আমাদের প্রথমতঃ ইতিহাস থেকে একটু শেখা প্রয়োজনীয়। আগেকার দিনের ভালো ব্যাপারগুলো গ্রহণ করতে হবে। তার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি কিভাবে ঠিক করে ব্যবহার করা যেতে পারে, সেই নিয়ে গভীর চিন্তার প্রয়োজন। কিছু ব্যবসায়ী বা শিল্পপতিরা যদি একটু পুঁজি নিয়ে এগিয়ে আসেন, তো ভালো কাজ কিছু করা যেতে পারে, পয়সাকড়ির কথা মাথায় না রেখে। আমি দেখেছি স্বর্ণযুগের স্রষ্টারা নিজেদের সৃষ্টি নিয়েই ভাবতেন, পয়সাকড়ির কথা মাথায় বিশেষ থাকতো না। আজকের দিনে পয়সাকড়ির কথা ভাবতেই হবে কারণ জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে গেছে। তাই পৃষ্ঠপোষক এর প্রয়োজন অসীম। যাতে স্রষ্টারা নিজেদের সৃষ্টি নিয়ে একটু বেশি সময় দিতে পারেন।
৪ জুন, ২০২৬

সৌম্য দাশগুপ্ত | কলকাতা, ভারত
স্থপতি, সঙ্গীত পরিচালক, সুরকার ও গিটারবাদক।
