(২য় পর্ব – ৩ পর্বে বিভক্ত)
কৃষি ছাড়াও যাত্রা বা শুভ কাজের সময় নিয়ে খনার অনেক বচন রয়েছে। সেকালে মানুষ এগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করত। যেমন ‘পিঁপড়ে পালায় ডিম মুখে, তবে জেনো বান ডাকে।’ অর্থাৎ পিঁপড়ে যদি মুখে ডিম নিয়ে উঁচু জায়গায় ওঠে, তবে বুঝতে হবে বন্যা (বান) আসছে। এগুলো মূলত জীবজন্তুর আচরণ পর্যবেক্ষণের ফল।
প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলায় যাতায়াত ব্যবস্থা খুব কঠিন ছিল। বিপদসঙ্কুল পথে যাত্রা করার আগে মানুষ দিনক্ষণ ও শুভ-অশুভ লক্ষণ মেনে চলত। ডাক ও খনার বচনে এই যাত্রালগ্ন ও লোকবিশ্বাসের নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়। এগুলো নিছক কুসংস্কার ছিল না, এর পেছনে গভীর মনস্তত্ত্ব কাজ করত।
‘খালি কলসি দেখলে পথে, কাজ হবে না কোনও মতে।’
যাত্রা করার সময় খালি কলসি দেখা অশুভ বলে মনে করা হত। কৃষিভিত্তিক সমাজে ভরা কলসি হল পূর্ণতা, সমৃদ্ধি ও মঙ্গলের প্রতীক। অন্যদিকে খালি কলসি হল শূন্যতা বা অভাবের প্রতীক। কোনও কাজের শুরুতে শূন্যতার প্রতীক দেখলে মানুষের মনের ভেতর এক ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। কাজের উৎসাহ কমে যায়। তাই এই বচনটির সৃষ্টি।
‘হাঁচি, টিকটিকি, বাধা, পিছন ডাকে ফেরা আধা।’
বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় কেউ হাঁচি দিলে, টিকটিকি ডাকলে বা পেছন থেকে কেউ ডাকলে যাত্রা অশুভ হয়। এর পেছনের মনস্তত্ত্বটি হল মনোযোগের ব্যাঘাত। একজন মানুষ যখন কোনও বিশেষ কাজের উদ্দেশ্যে বেরোন, তখন তার মস্তিষ্ক সেই কাজের চিন্তায় মগ্ন থাকে। পেছন থেকে ডাকলে বা বাধা দিলে সেই মনোযোগ নষ্ট হয়। মনোযোগ বিঘ্নিত হলে কাজে ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
‘ডাইনে সাপ বামে শিয়াল, তবে জানবি যাত্রা বিশাল।’
পথে যাওয়ার সময় ডানদিকে সাপ এবং বাঁদিকে শিয়াল দেখলে যাত্রা খুব শুভ হয় বলে ধরা হত। এটি মূলত প্রাচীন বাংলার অরণ্য ও গ্রামীণ পরিবেশের লোকবিশ্বাস। এই বচনগুলো মানুষের মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস জোগাতে সাহায্য করত।
কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা টিকে থাকে পরিবারের ওপর। আর পরিবারের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলেন নারী। ডাক ও খনার বচনে একজন আদর্শ নারীর শারীরিক গঠন, স্বভাব এবং গুণাবলি কেমন হওয়া উচিত, তার সুস্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। সেকালের পিতৃতান্ত্রিক সমাজ নারীকে কীভাবে মূল্যায়ন করত, তা এই বচনগুলো থেকে বোঝা যায়।
‘শ্যামাংগী সুকেশী তনু লোমরাজি কান্তা। সুভুরু সুশীলা কিম্বা সুগতি সুদন্তা। মধ্য ক্ষীণা যদি হয় পঙ্কজ নয়নী। কুলহীনা হইলেও বরেষ্ট দায়িনী।’
এটি খনার একটি অত্যন্ত বিখ্যাত বচন। এখানে বলা হয়েছে, যে নারীর গায়ের রং শ্যামলা, চুল সুন্দর, শরীর ছিপছিপে, ভ্রু সুন্দর, স্বভাব ভাল, দাঁত সুন্দর, কোমর সরু (মধ্য ক্ষীণা) এবং চোখ পদ্মের মতো (পঙ্কজ নয়নী); সে নারী যদি নিচু বংশের (কুলহীনা) মেয়েও হয়, তবুও তাকে বিয়ে করা শ্রেষ্ঠ কাজ। এখানে শুধু নারীর বাহ্যিক সৌন্দর্যের কথা বলা হয়নি, শারীরিক সুস্থতার কথাও বলা হয়েছে। কৃষিভিত্তিক সমাজে সুস্থ ও সবল নারী পরিবারের সম্পদ ছিল। তাই বংশপরিচয়ের চেয়ে নারীর ব্যক্তিগত গুণ ও স্বাস্থ্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
‘মধুগুষ্টা যদি হয় রাজার বালিকা। কুলে শ্রেষ্ঠা হইলেও অরিষ্ট দায়িকা।’
এর আগের বচনের ঠিক উল্টো কথা এখানে বলা হয়েছে। কোনও নারী যদি বদমেজাজি ও কটুভাষী (মধুগুষ্টা) হয়, তবে সে রাজার মেয়ে বা উঁচু বংশের হলেও পরিবারের জন্য অমঙ্গল (অরিষ্ট) ডেকে আনবে। অর্থাৎ, পারিবারিক শান্তিশৃঙ্খলার জন্য নারীর ভাল স্বভাব ও মিষ্টি কথার ওপর সমাজ সবচেয়ে বেশি জোর দিত।
প্রাচীন বাংলায় উন্নত হাসপাতাল বা ডাক্তার ছিল না। প্রকৃতিই ছিল তাদের চিকিৎসালয়। মানুষ কীভাবে সুস্থ থাকবে এবং রোগ প্রতিরোধ করবে, তার চমৎকার বৈজ্ঞানিক গাইডলাইন ডাক ও খনার বচনে ছড়িয়ে আছে। একে আধুনিক পরিভাষায় প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা বলা যায়।
‘আলো হাওয়া বেঁধো না, রোগ ভোগে মরো না।’
বাড়িঘর এমনভাবে বানাতে হবে যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। ঘরে সূর্যের আলো ও বাতাস না ঢুকলে সেখানে স্যাঁতস্যাঁতে পরিবেশ তৈরি হয়। এতে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস জন্ম নেয়, মানুষ নানা রকম সংক্রামক রোগে ভোগে। হাজার বছর আগে খনা যে জনস্বাস্থ্য ও হাইজিনের কথা বলেছেন, তা আজকের দিনেও শতভাগ বিজ্ঞানসম্মত।
‘দক্ষিণ দুয়ারী ঘরের রাজা, পূর্ব দুয়ারী তার প্রজা। পশ্চিম দুয়ারীর মুখে ছাই, উত্তর দুয়ারীর খাজনা নাই।’
এটি বাস্তুশাস্ত্র ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞানের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। বাড়ির মূল দরজা দক্ষিণ দিকে হলে গ্রীষ্মকালে প্রচুর দখিনা বাতাস ঘরে ঢোকে, যা শরীর জুড়িয়ে দেয়। তাই দক্ষিণমুখী ঘর সবচেয়ে সেরা (রাজা)। পূর্বমুখী ঘরে সকালে রোদ আসে, যা ভাল। কিন্তু পশ্চিমমুখী ঘরে বিকালের কড়া রোদ পড়ে, ঘর তেতে থাকে, তাই তা খারাপ (মুখে ছাই)। উত্তরমুখী ঘরে শীতের সময় উত্তুরে কনকনে হাওয়া ঢোকে, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।
‘নিম নিসিন্দা যেথা, মানুষ মরে সেথা?’
প্রাচীন বাংলায় বাড়ির আশেপাশে নিম ও নিসিন্দা গাছ লাগানো বাধ্যতামূলক ছিল। নিম গাছ বাতাস পরিষ্কার রাখে এবং জীবাণু ধ্বংস করে। নিসিন্দা গাছের পাতাও সর্দি-জ্বর ও ব্যথার মহৌষধ। খনা প্রশ্ন করেছেন, যে বাড়িতে এই দুটি ঔষধি গাছ আছে, সেখানে কি মানুষ সহজে রোগে মারা যেতে পারে? উত্তর হল, না। এটি হল গ্রামীণ ভেষজ চিকিৎসার এক অমূল্য প্রমাণ।
‘বারো মাসে বারো ফল, না খেলে যায় রসাতল।’
সুস্থ থাকতে হলে প্রতিটি ঋতুর নিজস্ব ফল খেতে হবে। আধুনিক পুষ্টিবিজ্ঞান বলে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সিজনাল বা মৌসুমি ফল খাওয়ার বিকল্প নেই। খনা হাজার বছর আগেই বাঙালিকে এই পুষ্টিজ্ঞানের শিক্ষা দিয়ে গেছেন।
বচনের ভাষাতাত্ত্বিক বিবর্তন ও গাণিতিক পরিভাষা
ডাক ও খনার বচন মূলত মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। তাই হাজার বছর আগের মূল ভাষা আজ আর অবিকল অবস্থায় পাওয়া যায় না। কালের নিয়মে বাংলা ভাষার যেমন পরিবর্তন হয়েছে, বচনের ভাষাও আধুনিক রূপ পেয়েছে। তবে এখনও অনেক বচনে প্রাচীন বাংলা বা অবহট্ঠ ভাষার ছাপ স্পষ্ট।
‘ভাষা বোল পাতে লেখি। বাচাহুব বোল পড়ি সাথি।’
ড. দীনেশচন্দ্র সেন এই বচনটিকে প্রাচীন ভাষার একটি চমৎকার উদাহরণ হিসেবে দেখিয়েছেন। এখানে ‘বোল’ মানে বুলি বা কথা। খনা বলছেন, তিনি তাঁর বচন বা কথাগুলো গাছের পাতায় লিখে পাঠ করতেন এবং এভাবেই তা মানুষের মাঝে বাঁচিয়ে (বাচাহুব) রাখতে চেয়েছেন।
খনার বচনে প্রচুর প্রাচীন গাণিতিক ও জ্যোতিষশাস্ত্রীয় পরিভাষার ব্যবহার রয়েছে। এগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন সমাজে গণিতের চর্চা কতটা উন্নত ছিল। বচনে সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত কয়েকটি পরিভাষা হল:
চাঁদা = ১ (চাঁদ একটি)
পক্ষ = ২ (শুক্লপক্ষ ও কৃষ্ণপক্ষ)
নেত্র = ৩ (শিবের তিনটি চোখ)
বেদ = ৪ (ঋক, সাম, যজু, অথর্ব)
বাণ = ৫ (মদনের পঞ্চবাণ)
বসু = ৮ (অষ্টবসু)
ভা = ২৭ (সাতাশটি নক্ষত্র)
হীন বা খালি = ০ (শূন্য)
এছাড়া সমুদ্র, কুম্ভ ইত্যাদি শব্দও সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হত। আধুনিক ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো প্রাচীন বাংলার শব্দভাণ্ডারের অমূল্য দলিল।
ডাক ও খনার বচন শুধু বাংলার নিজস্ব সম্পদ নয়। এর প্রভাব গোটা ভারতীয় উপমহাদেশের কৃষিভিত্তিক সমাজে ছড়িয়ে পড়েছিল। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের লোকসাহিত্যের সঙ্গে বাংলা বচনের এক অদ্ভুত ও চমৎকার মিল পাওয়া যায়।
অসম বা কামরূপে ডাকের বচন অত্যন্ত জনপ্রিয়। অসমীয়া ভাষায় একে ‘ডাকর কথা’ বলা হয়। বাংলা খনার অনেক বচন অসমীয়া ডাকের কথার সঙ্গে মিশে গেছে। অসম ও বাংলার আবহাওয়া, মাটি এবং কৃষিকাজ প্রায় একই রকম হওয়ায় বচনগুলোর মধ্যে কোনও বিরোধ তৈরি হয়নি।
‘পুবে হাঁস, পশ্চিমে বাঁশ…’
বাড়ি তৈরির এই বিখ্যাত আদর্শটি বাংলা এবং অসমীয়া দুই ভাষাতেই সমানভাবে প্রচলিত। ‘অসমীয়া সাহিত্যর চাণেকী’ গ্রন্থে ডাক-ভণিতায় প্রায় এক হাজার ডাকের কথা সংকলিত হয়েছে। তবে অসমীয়া ভাষার বচনগুলোতে বাংলার চেয়ে বেশি প্রাচীনত্বের ছাপ রয়েছে।
ওড়িশায় খনার বচন ‘খনাবচন’ নামেই পরিচিত। ওড়িয়া ভাষাতে খনার বচনের সংখ্যা বাংলার চেয়ে কোনও অংশে কম নয়। ওড়িশায় খনার বচন শুধু মুখে মুখে বলা হয় না, সেখানে বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে এটি গানের মতো গাওয়া হয়। অনাবৃষ্টি বা খরার সময় ওড়িশার কৃষকরা বৃষ্টির আশায় বৃষ্টি-সম্পর্কিত খনার বচনগুলো সুর করে গাইতেন। এটি ছিল মূলত লোকজ জাদুবিশ্বাস। তারা বিশ্বাস করতেন, খনার বচন গাইলে আকাশ থেকে বৃষ্টি নামবে। কিছুদিন আগেও গ্রামবাংলায় এই রীতির প্রচলন ছিল।
লোকসাহিত্য গবেষক আলি নওয়াজ সম্পাদিত ‘খনার বচন, কৃষি ও বাঙ্গালী সংস্কৃতি’ গ্রন্থে ভারতের অন্যান্য ভাষার প্রবচনের সঙ্গে বাংলার তুলনামূলক আলোচনা করা হয়েছে। হিন্দিতে ‘পরাশর বচন’, মিথিলায় ‘ঘাঘ’ ও ‘ঢংক’ এবং রাজস্থানে ‘ভড্ডরী’-র বচন প্রচলিত আছে। এগুলোর বিষয়বস্তু পুরোপুরি বাংলা খনার বচনের মতো। দক্ষিণ ভারতের তেলুগু ভাষায় প্রচলিত কৃষি-প্রবচনের সঙ্গে বাংলা খনার বচনের অদ্ভুত মিল রয়েছে। বাংলা, অসম, ওড়িশা বা দক্ষিণ ভারতে ভাষা আলাদা হলেও এদের মূল ভিত্তি ছিল কৃষি। আর কৃষকদের জীবনের অভিজ্ঞতা সব জায়গায় প্রায় একই রকম। মেঘ, বৃষ্টি, মাটি ও বীজের চরিত্র ভৌগোলিক সীমানা মানে না। তাই বিভিন্ন ভাষার লোকসাহিত্যে একই কৃষিবিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এটি এক অখণ্ড ভারতীয় কৃষিসভ্যতার প্রমাণ দেয়।
প্রাচীনকালে ‘বচন’ বলতে কবিতাকেই বোঝানো হত। নেপালে পাওয়া একটি প্রাচীন কাব্য-সংকলনের নাম ‘কবীন্দ্রবচনসমুচ্চয়’। এটি প্রমাণ করে যে, বচনগুলো নিছক শুকনো উপদেশ ছিল না, এগুলোর মধ্যে চমৎকার কাব্যরস ও গীতিধর্মিতা ছিল। ডাক ও খনার বচনের ছন্দ মূলত স্বরবৃত্ত বা দলবৃত্ত ছন্দ। দুই চরণের শেষে অন্ত্যমিল থাকে। মিলের খাতিরে অনেক সময় শব্দের রূপ ইচ্ছাকৃতভাবে বিকৃত করা হয়েছে। কিছু কিছু খনার বচন গীতিকবিতার মতো বেশ দীর্ঘ এবং শ্রুতিমধুর।
২২ এপ্রিল, ২০২৬
চলবে…

দিব্যেন্দু ঘোষ | সাঁকরাইল (হাওড়া), পশ্চিম বাংলা, ভারত
সাংবাদিক, লেখক, প্রাবন্ধিক, বাচিক শিল্পী।
