তথ্য প্রযুক্তির কল্যানে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত প্রায় সব ক’টি খবরের কাগজ অনলাইনে সবার নাগালে পৌছে গেছে। কম্পিউটার খুললেই দেখা যায় দেশ এবং বিদেশের নানা খবর। আইপিটিভির কল্যানে বাংলা টেলিভিশন চ্যানেলগুলোও অনায়াসে দেখা যাচ্ছে অল্প খরচের মাধ্যমেই। তারপরও যেন একটা অতৃপ্তি কাজ করে সবসময়।
স্মৃতির পাতায় যেন বার বার ফিরে আসে ২০০৭ সালের নভেম্বর মাস। বাংলাদেশ থেকে নিউইয়র্কে এসে পৌছালাম। বাইরে রৌদ্র যেন ঝল ঝল করছে। কিন্তু জেএফকে বিমান বন্দর থেকে বের হতেই কনকনে শীতের ধাক্কা খেলাম। অজানা এক শহর। কোথায় কাজ পাব সেই শংকা মনে। কতদিন লাগবে সেটিও জানিনা। বাংলাদেশে থাকাকালীন মনজুর-ই-মওলা স্যারের সাথে কাজ করার সুবাদে পত্রিকার কাজের সাথে অনেকটাই জড়িত ছিলাম উনার কলাম লেখার সহায়ক হিসেবে। স্যারই তার নিকট আত্মীয়ের মাধ্যমে কাজ ম্যানেজ করে দিলেন নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকায়।
তখন বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমের দৌড়াত্ম পশ্চিমের দেশে অতবেশী একটা পৌছাতে পারেনি। কেবল এনটিভি তাদের নিউইয়র্ক শাখা খুলেছে। এছাড়া বাংলাভিশন, আরটিভি সহ মোট চারটি টিভি চ্যানেল চড়া দামে দেখার সুযোগ ছিল কেবল। বাংলাদেশের কোনও পত্রিকা দেখার সুযোগ তখন ছিল না। কমিউনিটির মানুষদের কাছে প্রবাস থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকাগুলোর জনপ্রিয়তা অনেক। পত্রিকাগুলো সাপ্তাহিকভাবে বেড় হয় তবে ভিন্ন ভিন্ন দিনে। কমিউনিটির সবাই যেন সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকত। বাজারের তালিকার মাঝে পত্রিকা কেনাটাও নিয়মিত ছিল। প্রবাস থেকে প্রকাশিত বাংলা গণমাধ্যমগুলো যেন প্রান যুগিয়ে রেখেছে সবার মাঝে।
প্রবাসে প্রকাশিত বাংলা গনমাধ্যমগুলো যে শুধু বাঙ্গালীদের মাঝে কেবল বাংলাদেশের বা বাংলা ভাষার সাথে বন্ধন তৈরি করে রেখেছে তা নয়। এই সব গণমাধ্যমগুলো বিদেশে অবস্থানরত বাঙ্গালীদের ছোট বড় সব রকমের খবর প্রকাশ করে বিদেশে আমাদের কমিউনিটির গুরুত্ব বাড়াতেও বেশ সহযোগিতা করে চলেছে। সুযোগ করে দিচ্ছে বিদেশে অবস্থানরত মানুষগুলোর নানা ধরনের প্রতিভাকে আমাদের মাতৃভাষাতে প্রকাশ করার। অনেক ক্ষেত্রে আমাদের সামাজিক সংস্কৃতির সাথে বিপরীতমুখী বিদেশী সংস্কৃতির কারনে আমাদের কমিউনিটির মানুষগুলো যে নানা ধরনের অসুবিধার সম্মুখীন হন, প্রবাসে প্রকাশিত বাংলা গণমাধ্যমগুলো অনেক বড় ভূমিকা পালন করে সেই সব সমস্যার সমাধানে আমাদের কমিউনিটিকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে।
তবে, প্রবাসে প্রকাশিত বাংলা গণমাধ্যমগুলো সম্পর্কে নেতিবাচক সমালোচনাও আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশী যে বিষয়টি আলোচিত তা হচ্ছে মৌলিক লেখার সংকট। বিষয়টি দুই ভাবেই দেখা যায়। বেশীর ভাগ গণমাধ্যমগুলোতে জনবল সংকট রয়েছে। কোনও কোনও গণমাধ্যম এক ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, ফলে সেখানে বেশীরভাগ প্রকাশিত সংবাদ বা লেখা অন্য কোথাও আগেই প্রকাশিত হয়ে গেছে। জনবল সংকটের কারনে, অন্য পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বা লেখা দিয়ে প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে চলেছে কেবল নাম ফলানোর জন্য। অন্যদিকে, সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে সবার মাঝেই লেখক হবার প্রবনতাও বেড়েছে। এটি অবশ্য মন্দ না। কিন্তু অতিরিক্ত প্রচার পাবার আশায় লেখকগনও একই লেখা ভিন্ন ভিন্ন পত্রিকায় পাঠাচ্ছেন ছাপানোর জন্য।
প্রতিটি প্রকাশিত বিষয় পাঠক সমাজের মাঝে নানাভাবে বিশ্লেষিত হয়। অতি প্রচার কিংবা অন্যত্র প্রকাশিত সংবাদ কিংবা লেখ ছাপানো গণমাধ্যম এবং লেখক উভয়ের জন্যই সফলতা বয়ে আনে না, বরং ক্ষতির কারন হয়ে দাড়ায় ধীরে ধীরে পাঠকের গ্রহণযোগ্যতা হারানোর ফলে।
দীর্ঘদিন পর “পড়শী” আবার নতুন উদ্যমে প্রকাশ করার জন্য কাজ করছে। এই গণমাধ্যমটির নীতিমালাগুলোর মধ্যে সবচাইতে দৃষ্টিনন্দন বিষয়টি “শুধুমাত্র মৌলিক ও অপ্রকাশিত লেখা গ্রহন করা হবে।” এটি একদিকে যেমন “পড়শী”র নিজস্ব অবস্থান তৈরি করতে সহায়ক হবে, তেমনি লেখকদের মাঝেও মৌলিক লেখা লেখার আগ্রহ বাড়াবে বলে আমি মনে করি। “পড়শী”র নতুন যাত্রায় শুভ কামনা রইল।

মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ) | জার্মানটাউন, ম্যারীল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
সফটওয়্যার অটোমেশন আর্কিটেক্ট, সমাজকর্মী ও সংগঠক।
প্রেসিডেন্ট, আগামী।
