প্রবাসে সাহিত্য চর্চা

অ্যান্থনি পিউস গোমেজ | ২৩ মার্চ, ২০২৬
April 16, 2026

দেশের সাথে প্রবাসের রয়েছে ভৌগোলিক দূরত্ব, কিন্তু তার চেয়ে নিবিড় হলো হৃদয়ের নৈকট্য! আমরা যারা দেশ ছেড়ে প্রবাসে এসেছি, তারা প্রবাসী অনাবাসী অভিবাসী ইত্যাদি বিভিন্ন নামে পরিচিত। একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে স্বদেশের মাটি ছেড়ে যখন আমরা প্রবাসের মাটিতে নতুন যাত্রা শুরু করি, তখন অনেক কিছুই বিসর্জন দিয়ে থাকি নতুন কিছু অর্জনের আশায়। বাস্তব জীবনের আবর্তে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির সমীকরণে বদলে যায় আমাদের আশা আকাঙ্ক্ষা, আমাদের স্বপ্নের বুনন কিংবা বেঁচে থাকার দৃষ্টিভঙ্গি। উন্নত জীবনের অলীক স্বপ্নে বিভোর হয়ে আমরা প্রবাস জীবনের সমস্ত চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে স্বদেশপ্রেম বুকে নিয়ে বেঁচে আছি প্রবাসের মাটিতে, বুকের গভীরে বেজে চলে দেশ মাতৃকার মায়াময় অনুরনণ।

দেশ থেকে দেশান্তরী হবার ইতিহাস নতুন কোন কিছু নয়, অনেক প্রাচীন। মানব সভ্যতার স্বাভাবিক ক্রমবিবর্তনের অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে জীবনের স্বাভাবিক নিয়ম হিসেবেই। প্রবাসের মাটিতে বাঙালির বিচরণ বিগত প্রায় সাত দশকের ইতিহাস। কাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন অর্জনের স্বপ্নিল অভিযাত্রা উদ্বুদ্ধ করেছে প্রবাসীদের। আর সেই অনুভূতি বুকে নিয়ে, স্বদেশের মায়া বুকে জড়িয়ে আমরা যারা প্রবাসের মাটিতে গড়ে তুলেছি আমাদের নতুন আবাস, সামনের দিকে এগিয়ে চলেছি স্বপ্ন আর সংগ্রামের সমান্তরাল পথ ধরে।

প্রবাস জীবনে আমরা ধীরে ধীরে স্বদেশের ছোঁয়া থেকে, স্বদেশের প্রাত্যহিক প্রেক্ষাপট থেকে বাহ্যিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, কিন্তু সে শুধুমাত্রই এক ভিন্ন প্রান্তে নতুন জীবন-সংগ্রামের তাগিদে। বাঙালি — সে তো চিরকালীন বাঙালি! অন্তরের গভীরে নাড়ির টান কখনো ম্রিয়মান হয় না, বরং সময়ের সাথে সাথে মা-মাটি-মানুষের ছোঁয়া পাবার জন্য মনটা উতলা হয়ে উঠে, স্মৃতিকাতরতায় ব্যাকুল হয়ে উঠি আমরা, স্বদেশকে যেন আমরা আরও গভীরভাবে ভালবাসতে শিখি। প্রবাসের মাটিতে অন্য জীবন গড়তে গিয়েও আমরা ভুলে যাই না আমাদের কৃষ্টি-সংস্কৃতি-সাহিত্য। তাইতো আমাদের কেবলই পিছন ফিরে দেখা, স্মৃতির পানসীতে উজান বাওয়া।

বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে অনাবাসী বাঙালি সমাজ। চালিয়ে যাচ্ছে তাদের জীবন-জীবিকার সংগ্রাম, পাশাপাশি অব্যাহত রয়েছে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা। দুই বাংলার মানুষ তাদের নিজস্ব গন্ডিতে সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা অব্যাহত রাখলেও বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে যৌথ প্রয়াসে বা একসঙ্গেও তারা অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে থাকে, যা বৃহত্তর ঐক্যের চেতনায় সামাজিক সেতুবন্ধনের এক নান্দনিক বহিঃপ্রকাশ।

বৈশ্বিক পরিবর্তনে সাহিত্যচর্চা এবং এর প্রচার ও প্রসারের ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। মুদ্রিত বই থেকে শুরু করে এখন প্রকাশনার জন্য ডিজিটাল পাবলিকেশন, ই-বুক, আন্তর্জালিক বা অনলাইন প্ল্যাটফর্ম, নেটজিন, অনলাইন পোর্টাল, ফেইসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে প্রকাশনার উন্মুক্ত ক্ষেত্র তৈরী হয়েছে। অতীতে প্রকাশনার ক্ষেত্র ছিল গন্ডিবদ্ধ, যা আজকের প্রেক্ষাপটে বৃত্তের সীমানা পেরিয়ে পৌঁছে গিয়েছে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত পর্যন্ত। চলছে লেখালেখির চর্চা – লেখার বৈচিত্র্য, আঙ্গিক, উপজীব্য বিষয়, জীবনদর্শন ভিন্ন মাত্রা নিয়ে প্রকাশ পাচ্ছে এসব সাহিত্য চর্চার পথ ধরে। কিন্তু সাহিত্য চর্চার উন্মুক্ত ক্ষেত্র তৈরী হলেও এর গুণগত মানের বিষয়টি গভীর আলোচনার দাবি রাখে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সাহিত্য একাডেমি, সাহিত্য ফোরাম, কবিতা ও আবৃত্তি সংগঠন।

এছাড়াও যে বিষয়টি ইদানীং কালের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো প্রথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসকারী প্রবাসী বাঙালি সমাজ আয়োজিত আন্তর্জাতিক বই মেলা- নিউ ইয়র্ক, ওয়াশিংটন ডিসি, লন্ডন, টরন্টো, জার্মানী, প্যারিস, অস্ট্রেলিয়া সহ বিভিন্ন জায়গায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে বইমেলা, যোগ দিচ্ছেন স্থানীয় সাহিত্যানুরাগী সহ দেশ-প্রবাসের লেখক-প্রকাশক এবং চর্চা অব্যাহত রয়েছে বাংলা সাহিত্যের। এর মধ্যে দিয়ে সাহিত্যের সমৃদ্ধি হচ্ছে সন্দেহ নেই, কিন্তু বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে এখনো আন্তর্জাতিক কোন ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস বা সংগঠন গড়ে উঠেনি সামগ্রিকভাবে সাহিত্যের চর্চা বা এর প্রচার ও প্রসারের কাজে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যাবার জন্য, হলে সাহিত্যের সমৃদ্ধির গতি আরো বৃদ্ধি পেত বলে মনে করি এবং বাংলা সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে আরো বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখা সম্ভব হতো বলে মনে হয়। অনলাইন বা ডিজিটাল মাধ্যমগুলোতে, সাহিত্য পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে প্রবাসীদের সৃষ্টিশীল সাহিত্য, হচ্ছে সাহিত্য নিয়ে অনলাইন আলোচনা, আবৃত্তি, কর্মশালা ইত্যাদি। এটা সাহিত্যের সমৃদ্ধির পথে একটি ইতিবাচক দিক সন্দেহ নেই, তবে এখনো অনেক কাজ বাকী, বিশ্বের কাছে বাংলা সাহিত্যকে তুলে ধরতে হলে আমাদের আরো অনেক প্রয়াসের প্রয়োজন রয়েছে।

বাংলা সাহিত্যে অনাবাসীদের সাহিত্যচর্চা এক নতুন মাত্রা যোগ করছে তাতে সন্দেহ নেই। প্রবাসী সাহিত্যিকদের সৃষ্টিগুলো বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ তা স্বীকার করতে হবে। প্রবাসী লেখকগণ যে পরিবেশ-প্রেক্ষাপটে জীবন-যাপন করেন, তাঁদের যে জীবনদর্শন, অভিজ্ঞতা এবং উপলব্ধি, সেই বোধ থেকে প্রবাসী লেখকদের সাহিত্যসৃষ্টি দেশের সাহিত্যচর্চা থেকে কিছুটা আলাদা হবে — এটা বলাই বাহুল্য। প্রবাসে যে সাহিত্য সৃষ্টি হচ্ছে, তা বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং প্রবাসী সাহিত্যিকদের সাথে দেশের পাঠকদের, এমনকি প্রবাসী পাঠকদেরও একটি আত্মিক বন্ধন বা অন্তরের সেতুবন্ধন তৈরী হচ্ছে, যা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। দেশে হোক আর প্রবাসে হোক, কিভাবে পাঠক তৈরী করা যায়, কিভাবে বই পড়ার প্রতি মানুষের আগ্রহ ধরে রাখা যায়, তা গভীরভাবে ভেবে দেখা প্রয়োজন এবং পদক্ষেপ গ্রহণ প্রয়োজন। তা না হলে বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আবর্তিত জীবনধারার বিবর্তনে সাহিত্যের প্রতি মানুষের অনীহা বাড়বে দিন দিন, বিশেষ করে আকাশ সংস্কৃতির ভিন্ন মাত্রার বিনোদনের অদম্য প্রভাবের এই দু:সময়ে।

প্রবাসের মাটিতে সাহিত্য চর্চা চলছে ভিন্ন ধারায়, নতুন মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে নতুন সৃষ্টিগুলো, যেখানে বিষয়ভিত্তিক বৈচিত্র্য এবং অভিনবত্ব রয়েছে, যা দেশেও গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে ধীরে ধীরে। অনেক সময় ব্যাক্তিগত আলাপচারিতায় শোনা যায় আমাদের ইতিহাস, আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি তুলে দিতে হবে নতুন প্রজন্মের হাতে। এই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হলে নতুন প্রজন্মকে, বিশেষ করে প্রবাসের তরুণ প্রজন্মকে আমাদের সাহিত্যের অমূল্য সব সৃষ্টির সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন অনুবাদ সাহিত্য। আমাদের তরুণ প্রজন্মের কাছে অনুবাদ ছাড়া বাংলা সাহিত্য পৌঁছে দেওয়া সম্ভব নয়। এছাড়াও আমাদের সাহিত্য বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যানুরাগীদের কাছে, ভিনদেশী পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেবার জন্যও অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। অপরদিকে, তাদের সৃষ্টিশীল সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ করে পৌঁছে দিতে হবে আমাদের পাঠকদের কাছে। বেশ কিছু কাজ হচ্ছে, কিন্তু তবুও এদিকটাতে আমাদের এখনো অনেক কাজ বাকি, অনেক পেছনে পড়ে আছি আমরা। তবে কিছুই যে হয়নি তা নয়, প্রবাসের বিভিন্ন জায়গায় হতো অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে কাজ হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে, কিন্তু এখনো আমাদের তেমন কোন নির্ভরযোগ্য তথ্যভান্ডার তৈরী হয়নি, যার ভিত্তিতে আমরা আমাদের অবস্থান সম্পর্কে সচেতন হতে পারি বা নিজেদের মাঝখানে একটি যোগাযোগের সেতুবন্ধন রচনা করতে পারি। কাজ হচ্ছে ক্ষুদ্র পরিসরে, ভবিষ্যতে তা বৃহত্তর পরিসরে বর্ধিত হবে, স্টেই প্রত্যাশা।

একথা প্রায়ই শোনা যায় যে প্রবাসে বসে সাহিত্য রচনা করলে সেটা ‘প্রবাসী সাহিত্য’ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, লেখকগণ ‘প্রবাসী লেখক’ হিসেবে পরিগণিত হচ্ছেন। সাহিত্যানুরাগী বা সাহিত্য বোদ্ধাদের অনেকেই মনে করেন এটা ঠিক নয়, সৃষ্টিশীল সাহিত্যাঙ্গনে এটা গ্রহণযোগ্য হওয়া উচিত নয়। কারণ সাহিত্য, সে প্রবাসের মাটিতে বসেই হোক বা স্বদেশভূমিতে — তা সাহিত্য। রচনার প্রেক্ষাপট ভিন্ন হতে পারে, ভাবনায় বিশেষত্ব থাকতে পারে, প্রবাস জীবনের ছায়া থাকতে পারে, চিন্তা-চেতনার পার্থক্য থাকতে পারে, রূপক-উপমা-উৎপ্রেক্ষার ব্যাবহারে পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য তো সাহিত্যই। এটা অনস্বীকার্য যে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাঙালি লেখকদের সংখ্যা অনেক এবং বর্তমানে প্রবাসী অনেক লেখক তাঁদের বই প্রকাশ করছেন একুশের বই মেলায়, বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলা একাডেমি সহ দেশের বিভিন্ন সাহিত্যসেবী সংস্থা ও সংগঠনগুলোর দ্বারা পুরস্কৃত হচ্ছেন তাঁদের সাহিত্যসৃষ্টির স্বীকৃতিস্বরূপ। প্রবাসের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যগুলোতে গড়ে উঠা অনেক বাংলাদেশী সংগঠন ঐকান্তিক প্রয়াস নিয়ে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মাঝে বাংলা ভাষা শিক্ষা ও বাংলা সাহিত্যচর্চার বীজ বপন করে যাচ্ছেন, যা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

প্রবাসী হলেও স্বদেশ যেমন আমাদের হৃদয় জুড়ে, শেকড়ের টান যেমন আমাদের অস্তিত্ব জুড়ে, তেমনি বাংলা সাহিত্যও আমাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত, অবিচ্ছেদ্য অনুভূতির অনবদ্ধ অনুরণন সেখানে। সজীব থাক আমাদের দেশকে ভালোবাসার আনন্দ, চির জাগরুক থাক আমাদের বাঙালি আত্মপরিচয়ের অহংকার, বেঁচে থাক স্বদেশের সাথে আমাদের নাড়ির বন্ধন সাহিত্য ও সংস্কৃতির স্পর্শে।


অ্যান্থনি পিউস গোমেজ | উডব্রিজ, ভার্জিনিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সম্পাদক, সমাজকর্মী ও সাংস্কৃতিক কর্মী। লেখালেখি এবং সম্পাদনার সাথে সম্পৃক্ত দীর্ঘ চার দশকেরও বেশী সময় ধরে। প্রকাশিত গ্রন্থ দু’টি।

Previous Story

আপনি কি সত্যিই সুস্থ? — অদৃশ্য অসুস্থতার গল্প

Next Story

আমার শহরের গদ্য পদ্য

Latest from প্রবাস জীবন

আমার শহরের গদ্য পদ্য

পড়শীর জন্য লিখতে ভাবনার সুনিপুন পথ খুঁজি সাগরের কাছে। প্রশান্ত বালুকায় খালি পায়ে... - লিখেছেন মাহমুদা রুনু।