দি ইলাভেন্থ আওয়ার

আশরাফ আহমেদ | ১৪ই জুলাই, ২০২৫
April 16, 2026
27 views
42 mins read

The Eleventh Hour: A Curious Mystery by Greame Rowland Base

আপাতদৃষ্টিতে একটি রঙিন ও শিশু-কিশোরদের জন্য আকর্ষণীয় ছবিওয়ালা হলেও বইটিকে বয়স্ক, বিশেষ করে বার্ধক্যে পৌঁছা পাঠকদের জন্যও বেশ উপকারী বলে মনে হয়েছে। বার্ধক্যে পৌঁছে অনেকের নানা ধরণের স্মৃতিশক্তি লোপ পেয়ে যাকে, যার একটিকে আলযহাইমার রোগ বলা হয়। এই রোগকে দূরে সরিয়ে রাখতে ডাক্তাররা মস্তিষ্ককে ক্রিয়াশীল রাখতে পরামর্শ দেন। বার্ধক্যে এই বইটি মস্তিষ্ককে ক্রিয়াশীল করতে সহায়ক হতে পারে।


নাতিদের গ্রীষ্মের ছুটিতে তাদের সাথে সময় কাটাতে বড়ছেলের বাসায় এসেছি কয়েকদিন হলো। এক সকালে নাসতার পর উদ্দেশ্যবিহীনভাবে পায়চারি করছি দেখে বড়োছেলে আনকোড়া নূতন একটি বই হাতে দিয়ে বললো বাবা, এটি তোমার ছোটো নাতিকে নিয়ে পড়। তোমার খুব ভালো না লাগলেও তোমার নাতির কাজে লাগবে। তবে পড়া শেষ হয়ে গেলে তুমিও এটিকে প্রয়োজনীয় ভাববে বলে আমার বিশ্বাস। এর সাথে যোগ করে বললো, বইটি আমার তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষিকা ক্লাশে পড়ে শুনিয়েছিলেন। অনেক বছর পর, কিন্তু বিয়ের আগে যখন তোমার বৌমার সাথে ডেটিং করছিলাম, নিউইয়র্কে গিয়ে আমরা দুজন শুধু এই বইটি পড়েই কয়েকদিন কাটিয়ে দিয়েছিলাম।
প্রচ্ছদে বইটির নাম বড় বড় অক্ষরে ‘দি ইলাভেন্থ আওয়ার’ লেখা থাকলেও তার ঠিক নিচে অনেক ছোটো অক্ষরে ‘এ কিউরিয়াস মিস্ট্রি’ এমনভাবে লেখা যা সহজে চোখে পড়ে না। এর মানে দাঁড়াচ্ছে, বইটির নাম ‘দি ইলাভেন্থ আওয়ার – এ কিউরিয়াস মিস্ট্রি’ অথবা ‘এ কিউরিরিয়াস মিস্ট্রি অফ দি ইলাভেন্থ আওয়ার।’ বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায় ‘বেলা এগারোটা নিয়ে একটি অনুসিন্ধৎসু (কৌতুহলী) রহস্য।’ বইয়ের নামের ঠিক নিচেই লেখকের ‘গ্রেম বেইস’ নাম লেখা আছে।
সাড়ে এগারো ইঞ্চি বাই সাড়ে আট ইঞ্চির আকৃতিতে বেশ বড় হলেও বইতে গল্পের পৃষ্ঠাসংখ্যা ৩০টির বেশি নয়। তার ওপর শেষের কয়েকটি পৃষ্ঠা ইচ্ছাকৃতভাবেই সিলগালা করে লাগানো যেন পাঠকরা সহজেই খুলে পড়তে না পারে। প্রতিটি পৃষ্ঠার তিন চতুর্থাংশের অধিক স্থান জুড়ে লেখক কর্তৃক রঙিন ছবি আঁকা। ছবির নিচে প্রতি চার লাইনের এক বা দুই স্তবকে কবিতার ছন্দে গল্পের বর্ণনা। প্রতিটি পৃষ্ঠার চার সীমান্ত জুড়ে রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গসজ্জা।
যে কোনো বই পড়া শুরুর আগে আমি সাধারণত কিছুটা হলেও ভূমিকা পড়ে নেই। কিন্তু এই বইয়ে কোনো ভূমিকা দেখতে পেলাম না। তবে প্রথম পৃষ্ঠায় উৎসর্গের আগে চার লাইনের একটি ছন্দবদ্ধ বর্ণনা থেকে বোঝা গেল এটি একটি রহস্য গল্প হলেও উত্তরগুলো প্রতি পৃষ্ঠাতেই লুকিয়ে আছে।
সোফায় বসে আমি বইটি পড়া শুরু করলাম। আমার গায়ে হেলান দিয়ে ৫ বছর বয়েসী নাতি এসে বসেছে। সে নিজেই এধরণের বই খুব ভালোভাবে পড়তে পারে। কতটুকু বুঝতে পেরেছিল জানি না, কিন্তু রিডার্স ডাইজেস্টে প্রকাশিত বড়দের জন্য গল্পের একটি সংকলনও পড়ে শেষ করেছিল দেখেছি। তবে আমি কাছে থাকলে আমাকে দিয়ে পড়াতেই সে বেশি আনন্দ পায়। ওর বয়সে ঘুমানোর আগে বড় নাতিও অভিনয়ের স্বরে আমার বই পড়া শুনতে বায়না ধরতো। তাদের আগে আমার দুই ছেলেকেও এভাবে বই পড়ে ঘুম পাড়ানোর দায়িত্ব পালন করে নিজের জ্ঞানও সমৃদ্ধ করেছি। আজ আমি ধীরে ধীরে পড়ছি ছোটোনাতি যেন ভালোভাবে বুঝতে পারে। বড় বড় অক্ষরে ৫-৮ লাইনের বর্ণনা পড়ে পড়ে একটি পৃষ্ঠা উল্টাতে গেলেই সে বাধা দিয়ে পৃষ্ঠায় অঙ্কিত ছবিওগুলোর সাথে আমার পড়া মিলিয়ে দেখতে চায়।
রান্নায় ব্যস্ত বড়ছেলে একবার এসে বলে গেল, বিভিন্ন পৃষ্ঠায় ছবির ঘড়িতে কয়টা বাজে তা খেয়াল রেখো, কেন বলছি তা পরে বুঝতে পারবে। মাঝে মাঝে ১১ বছর বয়স্ক বড় নাতি এসে পাশে বসছিল। অনেক আগে সেও বইটি পড়েছে। এখন স্মৃতি ঝালাই করে নিচ্ছে।
এরই মাঝে আমার স্ত্রী ছোটোছেলের ১৫ মাস বয়েসী কন্যাকে কোলে নিয়ে এসে পাশে বসলে নাতনীটি গভীর মনযোগ দিয়ে আমাদের পড়ার প্রতি চেয়ে রইলো। একফাঁকে উ আ শব্দ করে হাতে ধরা নিজের বইটি তুলে ধরলো, যেন বলতে চাইছে ঐটি নয়, আমার এই বইটি পড়! অশান্ত হয়ে পড়লে ছোটোছেলে বই পড়েই তার কন্যাকে ঘুম পাড়ানোর অভ্যাস গড়ে তুলেছে। দুই শিশু নাতি-নাতনীর আগ্রহে বাধাগ্রস্ত হয়ে থেমে থেমে পড়ায় মাত্র ৩০ পৃষ্ঠার সামান্য গল্পটি শেষ করতে আমার প্রায় একঘণ্টা লেগে গেল।
গল্পটি ছিল নিম্নরূপঃ
১১তম জন্মদিনের উৎসব পালন করতে হোরেস নামের এক হাতি তার প্রাসাদোপম বাড়িতে দশটি নিকটবন্ধু জানোয়ারকে দাওয়াত করেছে। কাজেই উৎসবে অংশগ্রহণকারীদের মোট সংখ্যা দাঁড়ালো ১১। দাওয়াতিদের মাঝে যেমন ছিল সুন্দরবনের ভয়ানক বাঘ, তেমনি ছিল আফ্রিকার নিরীহ জিরাফ। আবার ধীরে চলা অতিকায় গণ্ডারের বিপরীতে ছিল দ্রুতগামী খুব ছোটো এক ইঁদুর। তাদের মাঝে আরো ছিল বিড়াল, কুমির, এবং রাজহাঁস। সবাই টেবিলভর্তি ১১ পদের লোভনীয় খাবারের দিকে এগিয়ে গেলে হোরেস বললো না না না, আগে আমরা ১১টি খেলা খেলবো। খেলাশেষে ঘড়িতে যখন ঠিক ১১টা বাজবে, তখন কেক কেটে আমরা সব খাবার খাবো।
সবাই তখন বিভিন্ন খেলায় মেতে রইলো। লুকোচুরি থেকে ক্রিকেট, সাপলুডু থেকে দাবা, প্রতিটি খেলা কে কে কীভাবে খেললো, কে জিতলো, কে হারলো তার বিবরণ। হারজিত সত্ত্বেও জন্তুগুলো সবাই ছিল খুব ভদ্র, কেউ কাউকে ঠকায় না, মিথ্যাও বলে না। ফলে কোনো খেলায় কেউ বা একটি দল হেরে গেলেও বিজয়ীর প্রতি রাগান্বিত হয় না অথবা নিজেদের মন খারাপও করে না। বর্ণনা সামান্য হলেও ছবির সমন্বয়ে প্রতিটি খেলা ও জানোয়ারের দৈহিক ও চারিত্রিক বৈশিষ্ট প্রশংসামূলকভাবে ফুটে ওঠে, যা শিশুদের ঔৎসুক্য জাগায় – ভয় বা ঘৃণার উদ্রেক করে না।
এভাবে কয়েকঘণ্টা খেলতে খেলতে এগারোটা বেজে গেলে সবাই ঘরে ঢুকে দেখলো কে বা কারা টেবিলের সব খাবার খেয়ে শেষ করে ফলেছে, অগোছালোভাবে পড়ে আছে কিছু উচ্ছিষ্ট। তবে কে এই অপকর্মটি করলো? বাড়িতে তো আর কেউ নেই। অতিথিদের মাঝে নিশ্চয়ই কেউ করেছে! একে অপরের দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকাতে থাকলে প্রমাণসহ সবাই নিজেদেরকে নির্দোষ প্রমাণ করতে চেষ্টা করলো।
হোরেস সবাইকে এই বলে নিরস্ত করলো যে, যা হবার তা তো হয়েই গেছে। এ নিয়ে বাক বিতন্ডায় সময় নষ্ট করে লাভ নেই। তোমরা বরং এখানে অপেক্ষা করো। আমি একটু ভেতর থেকে আসছি। এই বলে সে রান্নাঘরে ঢুকে তাড়াহুরায় যতটুকু পারে, লাল আটা-রুটির অনেকগুলো স্যান্ডইচ বানিয়ে এনে বললো, খাবারগুলো চুরি হয়ে একদিকে ভালোই হয়েছে, তৈলাক্ত মজার খাবারের চেয়ে লাল আটা-রুটির স্যান্ডউইচ অনেক স্বাস্থ্যকর। সবাই আনন্দের সাথে সেসব গপাগপ খেয়ে ফেললো। গল্পে শিশুকে আনন্দ দেয়ার এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক শিক্ষা দেয়ার পর্বটি এখানেই শেষ।
গল্প শেষ হলেও পাঠকের জন্য প্রশ্ন যা রয়ে গেল তা হচ্ছে কে খাবারগুলো খেয়েছিল? প্রশ্নের শেষে বলা হয়েছে যে এই ধাঁধাঁর উত্তরটি বইয়ের প্রতিটি পাতায় আঁকা বিভিন্ন ছবির ভেতরেই লুকিয়ে আছে। সেগুলো মনযোগসহ দেখলেই ধাপে ধাপে উত্তরটির শেষ পর্যায়ে পৌঁছা যাবে। উত্তরটি সঠিক কিনা তা জানতে গল্পের শেষে দেয়া চৌকোণা একটি বিশেষ ছকের সাহায্য নিতে হবে। ছকটিতে এলোমেলোভাবে ইংরেজি বর্ণমালার অক্ষরগুলো সাজানো আছে।
ছোটোনাতিকে নিয়ে আমি প্রথম পাতা থেকে প্রতিটিতে কী কী সংকেত বা ক্লু লুকিয়ে আছে তা খুঁজতে তৎপর হলাম। আমি বিফল হলেও ছোটোনাতি বের করলো দুইটি পৃষ্ঠার একটিতে খাবার আছে কিন্তু অন্যটিতে নেই এবং সেই পৃষ্ঠা দুটিতে ঘড়ির সময়ের পার্থক্যও রয়েছে। তা দেখে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে বেলা ১০টা ৪৮ মিনিট এবং ১০টা ৫০ মিনিটের মাঝের ২ মিনিটেই কেউ খাবারগুলো চুরি করে খেয়েছে!
কয়েকটি পৃষ্ঠায় খুবই ছোটো অক্ষরে লেখা কিছু তথ্য থেকে সে আরো বের করলো যে কুমির এবং বাঘ চুরি করেনি। কিন্তু হোরেসের বাকি ৮টি বন্ধুর মাঝে খাবার চুরি করলো কে? বড়ছেলেকে বললাম আমরা এই অনুসন্ধানে এবার ইস্তফা দিচ্ছি। রান্না বন্ধ রেখে তুমি এদিকে একবার আসো। সে বললো, আমি বলে দিলে তুমি মজা পাবে না, বরং তোমার বড়নাতির সাহায্য নাও।
অন্য কিছুতে ব্যস্ত থাকা বড়নাতি এসে আমাদের পাশে বসলো। অনেক আগে পড়াছিল বলে রহস্যের অনেক কিছুই সে ভুলে গেছে। তবে নতুন করে চেষ্টা করতে আপত্তি নেই। প্রতিটি পৃষ্ঠায় বহুক্ষণ তাকিয়ে থেকে থেকে একেকটি রহস্য উদ্ঘাটন করতে লাগলো। এক পর্যায়ে উঠে গিয়ে সে কাগজ কলম নিয়ে এলো। আমাদের বললো, এখানে প্রতিটি জন্তুর পাশে তাদের নাম লেখো। তা হয়ে গেলে সে ছোটোনাতির বের করা কুমির ও বাঘের নাম দুটি কেটে দিল, কারণ ওরা আর সন্দেহের তালিকায় নেই।
পৃষ্ঠাসজ্জার মতো একটি পৃষ্ঠার তিন সীমান্ত বরাবর খুব ছোটো অক্ষরে ১, ২, ৩, ৪… সংখ্যাগুলো এলোমেলোভাবে লেখা আছে। ১ কে ইংরেজি এ, ২ কে ইংরেজি বি অক্ষরে স্থাপন করে সে যে বাক্যটি পেলো তাতে স্পষ্ট হলো যে বিড়ালও চুরি করেনি।
এভাবে সঙ্গীত-স্বরলিপির সংকেত দিয়ে লেখা অন্য একটি পৃষ্ঠার সীমান্তসজ্জার রহস্য মীমাংসা করে আরেকটি জন্তুকেও চুরির আভিযোগ হকে রেহাই দিল। একটি পৃষ্ঠার সীমান্ত জুড়ে ছিল বর্তমানে বিলুপ্ত টেলিগ্রাফে ব্যবহৃত ‘মর্স কোড’ সংকেতের একটি বাক্য। মর্স কোড বড়নাতির জ্ঞানের বাইরে। তাই সে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে গুগল মামার সাহায্যে তাও সমাধা করলো। একেকটি সুরাহা করে করে সে বাকিটা আমাদের উপর ছেড়ে দিয়ে নিজের কাজে ফিরে যাচ্ছিল।
এরকম আরো অনেকগুলো ধাঁধাঁ সুরাহার পর আমরা একমাত্র ইঁদুরকেই চোর বলে সাব্যস্ত করলাম। কিন্তু একটি সমস্যা রয়েই গেল। আগের একটি ধাঁধাঁর উত্তর থেকে ইঁদুর কখনও মিথ্যা বলে না আমাদের জানা ছিল। কিছুই বুঝতে না পেরে বড়নাতিকে আবার ডাকলাম। সে গল্পে ইঁদুর সম্পর্কিত পৃষ্ঠাগুলো উল্টাতে উল্টাতে এক স্থানের লেখাটি জোরে জোরে পড়লো-ইঁদুর বলছে ‘আমি খুবই ছোটো। একটি ইদুরের পক্ষে কি এতোগুলো খাবার খেয়ে ফেলা সম্ভব?’
বড়নাতি বলে চললো, লক্ষ করে দেখ সত্যবাদী হলেও ইঁদুর কিন্তু বলেনি যে সে খায়নি, সে বলেছে একটি ইদুরের পক্ষে এতোগুলো খাবার খাওয়া সম্ভব নয়! এর অর্থ কি এই হতে পারে না যে ইঁদুর একা খায়নি কিন্তু অন্য কারো অথবা আরো অনেক ইদুরের সাথে খেয়েছে? যদি তাই হয় তবে আমাদের আরও দুটি প্রমাণ খুঁজতে হবে, (১) ইঁদুর একা চুরি করেনি এবং (২) ওর সাথে আরো অনেক ইঁদুর চুরি করে খেয়েছে।
ছবির ভেতরে আক্ষরিক সংকেতে লুকিয়ে থাকা অতিথি ইদুরের Kiloroy নামটি সে এবার গল্পের শেষে জুড়ে দেয়া চৌকোনা আক্ষরিক ছকে লুকিয়ে থাকা সংকেতের সাথে মিলানোর চেষ্টা করলো। চৌকোণা ছকে ইংরেজি অক্ষরগুলো Ciphertext অনুযায়ী সাজানো। Ciphertext হচ্ছে Encription নামের একটি পদ্ধতি যা দ্বারা কম্পিউটার, ইমেইল, এবং সব ধরণের ডিজিটাল প্রযুক্তিতে যেকোনো লেখাকে অপ্রয়োজনীয় পাঠকের কাছে দুর্বোধ্য করে সংরক্ষণ ও আদানপ্রদান করা হয়।
বড়নাতির চেষ্টায় চৌকোণা ছক থেকে যা বেরিয়ে এলো তা হচ্ছে, ‘অভিনন্দন’! অর্থাৎ, কিলরোয় নামের ইঁদুরটিই যে খাবার চুরি করে খেয়েছে, তোমাদের সেই সিদ্ধান্তই সঠিক!
রহস্য সমাধানের এ পর্যন্ত আসতে বেলা প্রায় সাড়ে চারটা বেজে গেল। মাঝে অবশ্য আমাদের দুপুরের আহারটি শেষ করে নিতে হয়েছিল। চোরের দলে যে আরো অনেক ইঁদুর ছিল তার প্রমাণ বের করতে গেলে আরো অনেক সময় লেগে যাবে তা ভেবে সেদিনের মতো আমরা অনুসন্ধানের মুলতবি দিয়েছিলাম। বড়ছেলে আগ বাড়িয়ে শুধু উত্তরটি বলে দিয়েছিল – একশতেরও বেশি ইঁদুর একত্র হয়ে চুরির কাজটি করেছিল। সেই ইঁদুরগুলো বাড়ির বিভিন্ন ঘরে লুকিয়েছিল, তীক্ষ্ণ অনুসন্ধিৎসু চোখই শুধু ছবিতে তা দেখতে পাবে।
বইটির শেষ কয়েকটি পাতা বৃত্তাকার ও সুন্দর সজ্জাসহ এক টুকরা কাগজ দিয়ে সিলগালা করা আছে। তার ওপরে লেখা ‘দি ইনসাইড স্টোরি।’ ভেতরে ভূমিকারূপে ‘ইনসাইড স্টোরি’তে গল্পের উদ্দেশ্য, ধাঁধার উত্তরের কিছু কিছু সংকেত বা ক্লু, এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিখ্যাত ঐতিহাসিক ভবনের ছাদ বরাবর যে দেয়ালসজ্জা থাকে, লেখক বইতে সেসব ব্যবহার করেছেন তা জানাতেও ভোলেন নি। এই ভূমিকার পর পাঁচ পৃষ্ঠা জুড়ে বইয়ে যে কয়টি ছবি আঁকা হয়েছে, যে যে খেলা হয়েছে, তার বিবরণের পাশাপাশি ধাঁধায় ব্যবহৃত ছবিগুলোর উদ্দেশ্য এবং তা থেকে কীভাবে একেকটি উত্তর পাওয়া যেতে পারে তা লেখা আছে। অর্থাৎ চেষ্টা করেও যারা ধাঁধার উত্তর বের করতে পারে নি, তাদের সহায়তার জন্য এই পাঁচ পৃষ্ঠা যুক্ত করা হয়েছে। শিশুরা এবং পাঠকরা যাতে নিজের প্রচেষ্টায় ধাঁধাগুলো সমাধা করতে পারে তার জন্যেই পৃষ্ঠাগুলো সিলগালা করা হয়েছে।
লেখক ধাঁধার সব উত্তর লিখেই থেমে যান নি। বলছেন, বইটি আয়নার সামনে ধর। ধরলে ছয় লাইনের একটি কবিতা ফুটে উঠবে যাতে গল্পের কেউই মিথ্যা না বললেও প্রত্যেকেই যে পুরো সত্য কথা বলেনি তা ফুটে উঠবে। কিন্তু আয়নায় সামনে ধরলেও মাথা ঘামিয়ে সেই কবিতা উদ্ধার করার ধৈর্য এক্ষণে আমার নেই। তবে হাল ছেড়ে দেইনি। বইটি নিয়ে আবার বসবো। তার আগে, আমার বয়সের উপসর্গ ও অভিশাপ আলযাহাইমার রোগের সম্ভাব্য আক্রমণে সব ভুলে যাওয়ার আগেই বইটি সম্পর্কে লিখে রাখাটা সমীচীন মনে করছি।
উপরোক্ত আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট যে, আপাতদৃষ্টে শিশু সাহিত্য হলেও বইটি শিশু, প্রাপ্ত বয়স্ক এবং বৃদ্ধ – সব বয়সের পাঠকের জন্যই উপযোগী ও উপকারী। শিশুরা ছবিওয়ালা এই বই পড়ে যেমন আনন্দ পাবে, ছোটখাটো ধাঁধা সমাধানের চেষ্টার সাথে সাথে নিজের আত্মশক্তি ও আত্মবিশ্বাসও বাড়িয়ে চলবে। প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকরা জীবনের নানাবিধ সমস্যা সমাধানের একটি অনুশীলন খুঁজে পাবেন। আর বার্ধক্যে উপনীত পাঠকরা মস্তিষ্ককে সচল রাখতে ডাক্তাররা যে পরামর্শ দিয়ে থাকেন, ঔতসুক্যের সাথে এই বই পড়ে উপকৃত হবেন।
বইয়ের লেখকের নাম গ্রিম রোওল্যান্ড বেয়য (Greame Rowland Base)। ১৯৫৮ সালে তাঁর জন্ম যুক্তরাজ্যে হলেও ৮ বছর বয়স থেকে পিতামাতার সাথে গিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক। হাইস্কুলের পর গ্রাফিক্স ডিজাইনে ডিপ্লোমা পাশ করে শিশুদের বইয়ের ছবি বা ইলাস্ট্রেসন আঁকতে আঁকতে নিজেই ছবি-অঙ্কিত বইয়ের লেখক হয়ে ওঠেন। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ৩৩টি বই প্রকাশ করলেও জনপ্রিয়তা ও ব্যবসায়িক বিচারে ‘দ্যা ইলাভেন্থ আওয়ার’ এবং ‘এনিম্যালিয়া’ বই দুটিই সবচেয়ে ওপরে। শেষের বইটি টেলিভিশন সিরিজে রূপান্তরিত হওয়া ছাড়াও তাঁর অন্যান্য বই অপেরা এবং নাট্যরূপে মঞ্চস্থ হয়েছে। উল্লিখিত বই দুটি লেখার আগে বন্য প্রাণীর চরিত্র বুঝতে তিনি কেনিয়া ও তাঞ্জানিয়ার দুটি সাফারি পার্কে ছয় মাসকাল অবস্থান করেছিলেন। তাঁর বিভিন্ন বই ফরাসী, জার্মান, ড্যানিশ, হিব্রু, ম্যান্ডারিন, কোরিয়ান ও জাপানি ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
লেখক ‘দি ইলাভেন্থ আওয়ার’ বইটি লিখেছেন অত্যন্ত পরিশ্রম, নিষ্ঠা ও কয়েকটি উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। বাঙালি লেখকদের মাঝে এধরণের কেউ আছে বলে আমার জানা নেই। আমার শিশুকালের পাঠ্য বইয়ের যে গল্পটির কথা মনে আছে, তা হচ্ছে টোনা ও টুনিপাখি পিঠা খাওয়ানোর মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে কী করে বনের বাঘ, শেয়াল ও অন্যান্য জীবজন্তুকে বোকা বানিয়েছিল সেটি। এই গল্প থেকে শিশুরা যে নৈতিক শিক্ষা পায় তা হচ্ছে, পরিশ্রম না করে ভিক্ষা করা, মিথ্যা বলে এবং বন্ধুদের ফাঁকি দিয়ে নিজে আনন্দ পাওয়া। আমাদের গুণী শিক্ষাবিদরা কি তাঁদের সন্তানকে তেমন করেই গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন? সম্প্রতি প্রতারণার মাধ্যমে পুরো দেশের মানুষকে ধোঁকা দিয়ে দেশকে যে যে এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে, তাকে কি এই ধরণের শিক্ষাপ্রসূত বলা যায় না? এর বিপরীতে ‘দি ইলাভেন্থ আওয়ার’ গল্পে শিশু পাঠককে মিথ্যা না বলা, পারস্পরিক সহযোগিতা করা, অযথা বিতর্কে সময় নষ্ট না করা, স্বাস্থ্যকর খাবারের ধারণা দেয়া, বিপর্যয়ে ধৈর্য ধারণ করা, এবং পরিশ্রম করে ও মেধা খাটিয়ে সমস্য সমাধান করার শিক্ষা দেয়।
বহুদিন বিদেশে থাকি বলে বাংলা ভাষায় শিশুদের বই কেমন প্রকাশিত হচ্ছে তা জানা নেই। তবে পত্রপত্রিকায় দেখতে পাই প্রতি বছর বইমেলায় আকর্ষণীয় ছবিওয়ালা যা বের হয় তা বিদেশি বইয়ের নকল বা অনুবাদ। নকলের বিষয়টি ক্ষেত্রবিশেষে ভিন্ন অর্থ বা যুক্তি বহন করলেও অনুবাদের ক্ষত্রে মেধাস্বত্বকে কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। মূল লেখক ও প্রকাশকের যথাযথ অনুমতি নিয়ে ‘দি ইলাভেন্থ আওয়ার’ বা অনুরূপ কোনো বই সঠিকভাবে অনুবাদ করে যদি আমাদের শিশুদের হাতে ধরিয়ে দেয়া যায়, তবে তা ভালো একটি কাজ হবে বলে মনে করি।


আশরাফ আহমেদ | পটোম্যাক, মেরিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

অবসরপ্রাপ্ত বিজ্ঞানী। পড়শী’র মাধ্যমেই বাংলায় লেখালেখির যাত্রা। বিজ্ঞান, সমাজ, মুক্তিযুদ্ধ ও ভ্রমণ সমন্বয়ে গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধের প্রকাশিত বই ১৬টি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

যে গান রাস্তায় নেমে এলো : বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের বিবর্তন

Next Story

ক্যালিফোর্নিয়ার কর্মসূচি

Latest from বই আলোচনা

‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’: যন্ত্রের থাবায় রক্তাক্ত পুরাণ

আগেকার দিনে কাহাররা লাঠিয়াল ছিল। সে বাবা ঠাকুরের অনেক অলৌকিক গল্প বলে। ... তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর বিখ্যাত উপন্যাস নিয়ে আলেচনা করেছেন রঞ্জনা ভট্টাচার্য্য।

যে কোথাও ফেরে না – পাঠ অনুভব

কবি তৃষ্ণা বসাকের 'যে কোথাও ফেরে না' কবির নিজস্ব স্বর্গের সিঁড়ি। এক একটি ধাপে দাঁড়িয়ে আছে দুঃখ, শোক, প্রেম, অপ্রেম, ... কবিতার বইটি নিয়ে