পশ্চিমের দেশগুলোতে ইমিগ্রেশন সুবিধা থাকার ফলে, আমরা সবাই নিজেদের অবস্থান গড়ার পড় নিজেদের পরিবারের সদস্যদের নিয়ে আসি তাদেরকে ভাল সুযোগ সুবিধা দেয়া যাবে সেই ভাবনা থেকে। আমার বাবা-মা বয়সকালে আমার কাছাকাছি থাকবেন, তাদের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আমরা ভাল চিকিৎসা দিতে পারব, খাবারের সংকট থাকবে না, এমনকি তাদের দেখভাল করার জন্য আমাদের কাছে রাখতে চাই আমরা। এই প্রতিটি বিষয়ই বেশ ভাল। কিন্তু বাস্তবিক অর্থে প্রবাসে এসে আমাদের বাবা-মা কতটা ভাল থাকেন! ভাল চিকিৎসা সুবিধা কিংবা ভাল খাবার দেয়ার মানেই কি ভাল আছেন ভাবা যায়?
ঘটনা এক, পেনসিলভেনিয়াতে বাস করা এক নারী, গ্রামে বসবাস করা তার বাবা-মা কে নিয়ে এসেছেন ইমিগ্রেশন করে। শুরুতে আমেরিকা আসবে এই সমাচার বাংলাদেশে সামাজিকভাবে বেশ আলোড়িত করে তাই অনেক আনন্দ নিয়েই এসেছেন তারা। এখানে আসার পর, দিনের পর দিন ঘর বন্দী থাকা ছাড়া কিছুই করার নেই। মা যেহেতু দেশেও বাড়ীর বাইরে যাবার সুযোগ কম ছিল, তাই মেয়ের সংগ পেয়ে কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। গ্রামের হাটে ঘাটে চড়ে বেড়ানো বাবা যেন জেলখানায় বন্দী। যে নাতিদের দুষ্টুমিতে মেতে উঠার কথা ছিল তার, দু’মাস যেতে না যেতেই তাদের দুষ্টুমিতে বিষিয়ে উঠেছেন তিনি। মেয়েকে বললেন তাদের দেশে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। আসার কেবল দুই মাস হয়েছে, এত টাকা খরচ করে এনেছে তাদেরকে ভাল রাখার জন্য, মেয়ে তাই পাঠানের আবদারে সায় দেননি। ক’দিন পর বাবা মেয়েকে হুমকি দিয়েছেন, যদি না পাঠায় তাহলে বাড়িতে আগুন লাগাবেন। মেয়ে তাতেও কান দেয়নি। তারও কিছুদিন পর বাড়ির আঙ্গিনায় লাগানো সব সব্জির বাগান কেটে স্তুপ করে ফেলেছেন, বাইরে থেকে মেয়ে এসে এই সব দেখার পর জানতে চাইলেন কে করেছে এইসব। বাবা জবাব দিলেন, তোমাকে বলেছিলম আমাদের দেশে না পাঠালে বাড়িতে আগুন লাগাব, তুমি বিশ্বাস কর নাই, তাই সেম্পল দেখালাম। এতেও মন গলেনি মেয়ের, কারন, মেয়ে তো তাদের ভালর জন্যই এখানে এনেছেন। উন্নত চিকিৎসা মিলছে এখানে। ভাল ভাল খেতে পারছেন। তার কিছুদিন পর ঘরবন্দী বাবা অস্থির হয়ে বাড়ী থেকে বেড় হয়ে গেছেন। ঠিকানা ঠিকভাবে জানেন না, ভুল করে অন্য বাড়ীতে ঢুকে পড়ায় বাবাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। থানা থেকে বাবাকে উদ্ধার করে বাধ্য হয়ে বাবা-মাকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
ঘটনা দুই, ক্যালিফোর্নিয়ার লস এঞ্জেলেসে দীর্ঘদিন ধরে বাস করেন এমন একজন নারী স্পন্সর করে নিয়ে এসেছেন ৮০ পেরিয়ে যাওয়া বাবা এবং ৭০ পেরিয়ে যাওয়া বয়স্ক মাকে। বাবার বয়স ৮০ পেরুলেও মনের দিক থেকে তিনি যেন এক টগবগে তরুন। আমেরিকায় আসার আনন্দ অনেক তার। ইংরেজীও বলতে পারেন ভাল। রাস্তাঘাট চিনে যাওয়া, লাইব্রেরীতে গিয়ে সময়া কাটানো, এই সব এর পাশাপাশী স্থানীয় একটি বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে কাজও পেয়ে গেছেন। আমেরিকা আসা যেন তার স্বপ্ন পূরনের অংশ হয়ে দাড়িয়েছে। ভিন্ন চিত্র হলো ওই নারীর মায়ের। তারা ঘরের সবাই যখন বাড়ি থেকে কাজের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে যান, জানালা দিয়ে রাস্তায় তাকিয়ে থাকা ছাড়া তার আর কিছুই করার নেই। সময় যত গড়াচ্ছে তিনি বুঝতে পারছেন না কতটা ভালো আছেন তিনি। ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবার পর সব টেস্ট রিপোর্টই ভাল আসে, কিন্তু তিনি এতটা ডিপ্রেশনে কেন আছেন তার কারন খুজে পায় না কেউ। বয়স্ক মা তো দেশেও ঘরেই থাকতেন, এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোর স্বভাবও তো তার ছিল না। তাহলে এখানে এসে তিনি কেন এত ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছেন। তার কারন খুজে পাননি। দেশে পাঠিয়েছেন কয়েক বার, দেশে গেলে তিনি ভাল থাকেন, কিন্তু এখানে আসার পর সব সুবিধা থাকা স্বত্ত্বেও তার অবস্থার কোনও পরিবর্তন না পেয়ে স্থায়ীভাবে দেশে পাঠাতে বাধ্য হলেন এক সময়।
এই রকম হাজারও ঘটনা আমাদের কমিউনিটিতে খোজ নিলেই পাওয়া যাবে। কেউ হয়তো সেই ঘটনাগুলোর কারন খোজার চেষ্টা করেন এবং সমাধান করারও চেষ্টা করেন। আর কেউ হয়তো বাবা-মাকে নিজের কাছে নিয়ে এসেছেন, উনাদের ভাল খাবার দিচ্ছেন, ভাল চিকিৎসা পাচ্ছে এই ভাবনার মাঝেই মনে করেন বাবা-মা এই প্রবাসে বেশ ভাল আছেন। আসলে তারা কতটা ভাল আছেন, সেই নিরিক্ষন করার সময়ও হয়তো অনেকে পান না।
ভাল থাকা বা ভাল রাখার সংগা একেকজনের কাছে একেক রকম। তাই আমরা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে আমি যা ভাল মনে করি, সেটাই করার চেষ্টা করি। বিশেষ করে বয়স্ক বাবা-মায়ের ক্ষেত্রে। আমাদের সমাজও অবশ্য এর জন্য অনেক বেশী দায়ী। বাবা-মা মানসিকভাবে কতটা ভাল আছেন, সেটি সমাজের কাছে মূখ্য নয়, সমাজ কেবল বাহ্যিক আবরনটুকু দেখতে চায়। তাই এমনও অনেকে আছেন, সামাজিক চাপ এড়ানোর জন্য বাবা-মাকে ঘরবন্দী করে রাখতে হলেও নিয়ে আসছেন কিংবা আনার পর রেখ দিচ্ছেন বছরের পর বছর।
বয়স হলে আসলে কোথায় থাকা উচিত? এমন প্রশ্ন অনেকের মনেই কাজ করে। কেউ কেউ মনে করেন, সন্তানদের কাছে থাকাই ভালো, এতে বয়সকালে চিকিৎসা সেবা সহ তাদের দেখভাল ভাল পাওয়া যাবে। চিকিৎসা সেবার বিষয়টি অবশ্য অনেকের কাছেই প্রায়োরিটি পায়। ফলে, উন্নত দেশে থাকা অনেকে মনে করেন মালয়শিয়া কিংবা অন্য কোনও দেশ যেখানে কম খরচে ভাল চিকিৎসা সেবা পাওয়া যাবে, সেখানে থাকা ভাল হবে। ব্যাক্তিগতভাবে আমি মনে করি, আমরা দীর্ঘকাল ধরে যেখানে জীবেনর একটা বড় সময় কাটিয়ে দেয় কর্ম ব্যস্ততায়, আমাদের জীবন ধীরে ধীরে সেই সমাজের সাথে মিশে যায়। শরীরও অনেকটা সেই আবহাওয়া কিংবা পরিবেশের সাথে মিলিয়ে নেই। ফলে ওই সমাজটাই আমাদের মন ও শরীর দুইয়ের জন্যই উত্তম। বয়সকালে বাবা-মাকে কাছে আনার ইচ্ছে কম-বেশী সবাই পোষন করেন। তবে যে বাবা-মা গ্রামের মাটির গন্ধের সাথে তার সারা জীবন কাটিয়েছন, বিদেশে এসে ছেলে-মেয়ের মন রক্ষার্থে থেকে গেলেও, তারা আসলে বুঝতে পারেন না আসলে তারা কতটা ভাল আছেন। মনের ভেতরে দুটানা কাজ করে। ছেলে মেয়েকে কাছে পাবার আনন্দের পাশাপাশী নিজের সারা জীবন যে মাটির সাথে মিশে ছিলেন, সেই মাটির স্পর্শ না পাবার বেদনা, এই দুইয়ের মাঝে নিজেরাই বুঝতে পারেন না, আসলে কতটা ভাল আছেন তারা!
৮ জুন, ২০২৬

মো: মোস্তাফিজুর রহমান (পারভেজ) | জার্মানটাউন, ম্যারীল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
সফটওয়্যার অটোমেশন আর্কিটেক্ট, সমাজকর্মী ও সংগঠক। প্রেসিডেন্ট, আগামী।
