নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা

নজরুল: যে প্লেলিস্টে এখনো নতুন

মুন ইরা মীম
June 15, 2026
7 views
9 mins read

রাত সাড়ে বারোটা। এক বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ হেডফোন কানে দিয়ে ফোনের প্লেলিস্ট স্ক্রল করছে। চারপাশে অস্থির সময়— সোশ্যাল মিডিয়ার তর্ক, যুদ্ধের খবর, সম্পর্কের ভাঙাগড়া, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ। হঠাৎ তার প্লেলিস্ট থেকে বেজে ওঠে একটি পুরোনো গান— “কারার ঐ লৌহকপাট”। শত বছরেরও বেশি পুরোনো একটি সুর। কিন্তু অদ্ভুতভাবে গানটি যেন তার আজকের দিনকেই বলছে।এখানেই কাজী নজরুল ইসলামকে নতুন করে আবিষ্কার করার শুরু।

আমরা প্রায়ই নজরুলকে বিদ্রোহের কবি, জাতীয় কবি, বা অসংখ্য গানের স্রষ্টা হিসেবে স্মরণ করি। কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় সম্ভবত অন্য কোথাও— তিনি এমন এক শিল্পী, যিনি সময়ের গায়ে লেখা মানুষের চিরন্তন গল্পগুলো ধরতে পেরেছিলেন। তাই তিনি শুধু অতীত নন, বর্তমানও। আজকের পৃথিবীতে মানুষ স্বাধীনতার কথা বলে, বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলে, ধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলে। নজরুল এসব কথা বলেছিলেন তখন, যখন সেগুলো উচ্চারণ করাও ছিল সাহসের ব্যাপার। তাঁর গান ও কবিতায় প্রতিবাদ আছে, আবার প্রেমও আছে; আধ্যাত্মিকতা আছে, আবার মানবতার ডাকও আছে। তিনি একই সঙ্গে লিখেছেন ইসলামী সংগীত, শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি ও প্রেমের গান। বিভক্ত পৃথিবীতে এই বহুত্ববাদ তাঁকে আরও প্রাসঙ্গিক করে তোলে।

গানের জগতে নজরুলের গুরুত্ব আরও বিস্ময়কর। বাংলা গানের ইতিহাসে এমন শিল্পী খুব কম আছেন, যিনি একসঙ্গে এত ধরনের সুর ও সংগীতধারাকে আত্মস্থ করেছেন। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত, বাংলা লোকসংগীত, পারস্যের সুর, আরবি সংগীতের ধ্বনি— সবকিছুকে তিনি নিজের সৃষ্টিতে মিশিয়েছেন। আজ আমরা যে ‘ফিউশন’ সংগীতের কথা বলি, তার বীজ অনেক আগেই নজরুল তাঁর সৃষ্টিতে বপন করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি শুধু গান লেখেননি, বাংলা গানের সম্ভাবনাকেও বিস্তৃত করেছেন। নজরুল আসলে এমন একজন শিল্পী, যিনি মানুষের সবচেয়ে মৌলিক অনুভূতিগুলোকে ভাষা দিয়েছিলেন। তাই ১৯২০-এর দশকের নজরুল আজ ২০২৬ সালেও প্রাসঙ্গিক।

ধরা যাক, সেই বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া ছেলেটি আবার প্লেলিস্টে ফিরে যায়। এবার সে শোনে প্রেমের গান। তারপর ভক্তিগীতি। তারপর বিদ্রোহের গান। সে হয়তো খেয়ালই করে না, একেকটি গানের মধ্যে একেকটি পৃথিবী খুলে যাচ্ছে। কিন্তু নজরুলকে বুঝতে এটাই যথেষ্ট। কারণ তিনি মানুষের একটিমাত্র পরিচয়ে বিশ্বাস করতেন না। মানুষ তাঁর কাছে ছিল বহুরঙা, বহুস্বরের এক সত্তা। নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা আসলে এখানেই। তিনি আমাদের শেখান— প্রতিবাদ করতে, ভালোবাসতে, ভিন্নতাকে গ্রহণ করতে এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে। তাঁর গান শুধু গাওয়া হয় না; অনেক সময় তা মানুষের ভেতরে নিজেকে আবিষ্কার করারও এক ঘটনা ঘটায়।

তাই আজকের ডিজিটাল যুগে, অ্যালগরিদমের ভিড়ে, অসংখ্য নতুন কণ্ঠের ভিড়ে, দ্রুত বদলে যাওয়া রুচির পৃথিবীতেও নজরুল হারিয়ে যান না। বরং মনে হয়, তিনি নীরবে অপেক্ষা করেন— কোনো এক তরুণ শ্রোতার প্লেলিস্টের শেষে, কোনো এক নিঃসঙ্গ রাতের মধ্যে, কিংবা কোনো মানুষের সাহস খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তে। আর তখনই বোঝা যায়, নজরুল শুধু অতীতের একজন কবি নন। ইতিহাসের পাতা থেকে নয় বরং একেবারে বর্তমানের হৃদস্পন্দন হয়ে নজরুল আমাদের কাছে সেই নাম, যিনি এখনো নতুনভাবে বাজেন। নজরুল সেই নাম, সময়ও যাঁকে অস্বীকার ক’রে অতীত বলতে পারে না। নজরুল তো আমাদের সেই সহযাত্রী, যাঁকে অনুসরণ করে আজও প্রতিধ্বনিতে এগিয়ে যাই সামনে—

“কে আছো জোয়ান, হও আগুয়ান, হাঁকিছে ভবিষ্যত!”


মুন ইরা মীম | আইডাহো, যুক্তরাষ্ট্র

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

যুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
Previous Story

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে পালটে দিচ্ছে যুদ্ধ ও মানবাধিকারের সংজ্ঞা

আধুনিক বাংলা গান
Next Story

বিপন্ন বাংলা আধুনিক গান

Latest from সুর লহরী

আধুনিক বাংলা গান

বিপন্ন বাংলা আধুনিক গান

স্বর্ণযুগের মেলোডি বনাম ডিজিটালের কৃত্রিমতা—আধুনিক বাংলা গান কি সত্যিই বিপন্ন? সুরের নেপথ্য সংকট নিয়ে সৌম্য দাশগুপ্ত-এর এক অকপট ভাবনা।

সংগীতশিল্পী বাবনা করিমের সাথে পড়শীর একান্ত সাক্ষাৎকার

"এলোমেলো বাতাসে গীটার হাতে নিস্তব্ধতা চৌচির উম্মাদ ঝংকারে কাঁদি”... ব্যান্ডশিল্পী বাবনা করিমের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন নাসিমুল গনি/ মুন ইরা মীম

যে গান রাস্তায় নেমে এলো : বাংলা ব্যান্ড সঙ্গীতের বিবর্তন

কালো লম্বা এলোমেলো চুলের অদ্ভুত একটা ছেলে রাস্তায় হাঁটা শুরু করলো, যার হাতে বুঝি অ্যাকুয়েস্টিক আর পকেটে হারমোনিকা আছে। - লিখেছেন মুন ইরা মীম।