বাংলা বইমেলা

৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ও কিছু কথা

রানু ফেরদৌস
June 15, 2026
9 views
19 mins read

মাত্র সমাপ্ত হল নিউ ইয়র্কের ৩৫তম আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার মহাযজ্ঞ। মুক্তধারা বইয়ের দোকানের কর্নধার বিশ্বজিৎ সাহার আয়োজনে একসময় এই মেলা হত এক দিনের আয়োজন। কিছুদিন পরে দু’ দিনের আয়োজন, তারপর ক্রমেই তিন দিনের আয়োজন চলেছে অনেক বছর। সবশেষে বেশ কয়েক বছর যাবত এই বইমেলা চারদিনব্যাপী আয়োজিত হচ্ছে। তবে কয়েক বছর যাবত শেষের দিনটিকে নতুন প্রজন্মের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। সারাদিন নতুন প্রজন্মের জন্য নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় । পাশাপাশি বই বিক্রিও চলতে থাকে, শেষ দিনে অনেকে পছন্দের বইটি সংগ্রহ করে নেন। সব সময়ই বইমেলার আয়োজনে সহযোগিতা করেন কবি সাহিত্যিকগন ও তাদেরকে সাপোর্ট করেন এমন একদল মানুষ।

বাংলা বইমেলা

বইমেলা একটা সময়ে শুধু লেখক, প্রকাশক, বই সংক্রানত ব্যাপারে সীমাবদ্ধ ছিল। পরবর্তীতে বাংলা বইমেলা ও উৎসব নাম দেয়া হয় এবং শাড়ী চুড়ির দোকানও অন্তরভূক্ত করা হয়। এসব নিয়ে অনেক অসন্তোষের সৃষ্টি হয় লেখককুলের মধ্যে। উৎসব নাম জুডে দেবার ফলে সাংস্কৃতিক ব্যাপারও ওতপ্রোতভাবে জডিয়ে যায়। বইমেলা অনেক জাঁকজমক সহকারে চলতে থাকে, বিখ্যাত লেখকদের পাশাপাশি বিখ্যাত সংগীত শিল্পীদেরও আগমন ঘটে বইমেলা উপলক্ষে। নিউ ইয়র্কের সাংস্কৃতিক অংগনও বইমেলার অপরিহার্য অংগ হয়ে দাঁড়ায়। পুরোপুরি বাংলা বইমেলা এক আনন্দযজ্ঞে পরিনত হয়। নতুন পুরাতন বইয়ের সমাহার, লেখক, প্রকাশক, কবি সাবিত্যিকদের মিলন মেলায় পরিনত হয় এই মেলা। বাংলাদেশ, ভারত ও অন্যান্য দেশ থেকে অসংখ্য কবি সাহিত্যিক এসে জড় হয় নিউ ইয়র্ক শহরে কয়েকদিনের জন্য। বাংলা ভাষা ও নতুন প্রজন্মের মেলবন্ধন দিনে দিনে আরো বিকশিত হচ্ছে বইমেলার আয়োজনে।

পরবর্তীতে মুক্তধারা ফাউন্ডেশন গঠন করা হয় বই প্রেমী একদল লেখক ও সহযোগীদের নিয়ে। এই ফাউন্ডেশনে চেয়ারম্যান, উপদেষ্টা, হিসাবরক্ষক, সেক্রেটারি ও অন্যান্য পদসহ ৩১ সদস্যের একটি কমিটি রয়েছে। বর্তমান চেয়ারম্যান ডা: জিয়াউদদীন আহমেদ। ফাউন্ডেশনের সিইিও বিশ্বজিৎ সাহা।

তবে প্রতিবছর বইমেলার কয়েকমাস পূর্বে একজন বিশিষ্টজনকে আহবায়ক করে এবং অনেককে নিয়ে একটি কার্যক্রম কমিটি গঠন করা হয়। প্ল্যান করা হয় বইমেলার কার্যক্রমের এবং প্রতি সপ্তাহে মিটিং চলতেই থাকে। কোভিড পূর্ব সময়ে এসব মিটিং হত জ্যাকসন হাইটসে। কিন্তু কোভিড চলাকালীন সময় থেকে মিটিং হয় জুম-এর মাধ্যমে। এখনও জুম-এর মাধ্যমেই প্রাথমিক প্রস্তুতিপর্ব চলতে থাকে। এবারে মেলার আহবায়ক ছিলেন ড. নজরুল ইসলাম।

এবারের মেলা শুরু হয় মে মাসের ২২ তারিখে এবং শেষ হয় ২৫ তারিখে। ২২ তারিখ শুক্রবার মেলার উদ্বোধন করা হয় বেশ জাঁকজমক সহকারে। প্রথমেই গান এবং নাচের মাধ্যমে উৎসবের আমেজ তৈরী করা হয়। এবারে তিনজন প্রয়াত লেখকের শতবর্ষ উপলক্ষ করে তাদেরকে বিষেশ সম্মাননা প্রদান করা হয় মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করে। তারা হলেন মহাশ্বেতা দেবী, শামসুদ্দিন আবুল কালাম ও তপন রায় চৌধুরী । এসময় তাদের জীবনী ও সংক্ষিপ্ত কার্য বিবরণী পড়ে শোনানো হয়। এসময় মোমবাতি তর্পণ করেন ইমদাদুল হক মিলন, জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও ফরিদুর রেজা সাগর।

এর পরেই ফিতা কেটে মেলা উদ্বোধন করেন কথা সাহিত্যিক সাংবাদিক ইমদাদুল হক মিলন। এসময় উপস্থিত ছিলেন কবি সুবোধ সরকার, নবীন সাহিত্যক সাদাত হোসেন, শিশু সাহিত্যক ও চ্যানেল আইএর পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর। এছাডা ড. নজরুল ইসলামসহ আরো অনেক লেখক ও প্রকাশকগন এ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। এই পর্বটি হলের বাইরে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয়। ফিতা কাটা পর্ব শেষে তারা বইয়ের স্টল পরিদর্শন করেন। এসময় মেলা প্রাঙ্গণ ছিল লোকে লোকারণ্য।

এর পরপরই হলের মূল মঞ্চে প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও উত্তরীয় পড়িয়ে ৩৫ জন লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের বরন করে নেয়া হয়। এ পর্বে আহবায়ক, চেয়ারম্যান ও উদ্বোধক সহ বেশ কয়েকজন সুভেচছা বক্তব্য প্রদান করেন ।

শুক্রবার একটি বিশেষ অনুষ্ঠান সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এদিন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক ডক্টর রেহমান সোবহানকে আজীবন সম্মাননা জানানো হয় এবং একটি প্লাক প্রদান করা হয়। এসময় তার সহধর্মিণী ডক্টর রওনক জাহানও সঙ্গে ছিলেন।

চারদিনের বইমেলা ঠাসা অনুষ্ঠান সূচীতে থাকে পরিপূর্ন। আমন্ত্রিত বিশিস্ট লেখকদের সংগে আলোচনা অনুষ্ঠান, প্রকাশকগের সংগে আলোচনা পর্ব, স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর, আবৃত্তি, নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, নতুন বইয়ের পরিচিতি পর্ব, একের পর এক অনুষ্ঠান চলতেই থাকে শনিবার ও রবিবার। এরই মাঝে মাঝে দলীয় এবং একক নাচ, গান, নাটক ইত্যাদিও পরিবেশিত হয়। বিশেষ বক্তৃতা প্রদান করেন মাননীয় উদ্বোধক ও বিশেষ অতিথিগণ।

এবারের বইমেলায় দুইটি নাচের স্কুল অংশগ্রহণ করে। তারা চমতকার নৃত্য পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করে দেয়। এছাডা অনেক শিশু কিশোর একক নাচ ও গান পরিবেশন করে।

রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নাটকের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে রক্তকরবী নাটকটি পরিবেশিত হয় শিরীন বকুলের পরিচালনায়।

জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় কথা, গান ও আবৃত্তির মাধ্যমে। এটি পরিচালনা করেন কবির কিরন।

বেশ কয়েক বছর যাবত মুকতধারা সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয় একজন লেখককে যেটা জি এফ বি পুরস্কার নামে পরিচিত। নিউ জার্সির বিশিস্ট বাংলাদেশী ব্যবসায়ী ফারুক ভূইয়ার নামে এই পুরস্কারটি প্রবর্তন করা হয় এবং এর মূল্যমান ৩,০০০ ডলার। এবারে জিএফবি পুরস্কার অর্জন করেন ড. আবদুন নূর ।

এছাডা মুক্তধারা চিত্তরঞ্জন সাহার নামে একটি পুরস্কার প্রদান করেন, যেটা প্রকাশনা সংক্রানত। বইমেলায় আগত প্রকাশকদের মধ্যে সবচেয়ে সুন্দর ও সমৃদ্ধ প্রকাশনা সংস্থার মালিককে পুরস্কার প্রদান করা হয় যেটার মূল্যমান ১০০০ ডলার। এই পুরস্কারটি অর্জন করে বাতিঘর প্রকাশনা সংস্থা।

এই পুরস্কারগুলো প্রদানের জন্য কমিটি গঠন করা হয় এবং তাদের বিচারের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয় কে বিজয়ী হবে।

এবছর প্রধান শিল্পী ছিলেন রবীন্দ্র সংগীত শিল্পী অদিতি মহসিন। এছাডা ছিলেন শাহ মাহবুব, পাপী মনা ও তার দল। মহিতোষ তালুকদারের তত্বাবধানে দলীয় গান পরিবেশিত হয় উদ্বোধনপূর্ব উৎসবে, উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে। এবারে তবলায় ছিলেন পিনাক পানি গোস্বামী ও পিনু সেন দাশ। মন্দিরায় ছিলেন শহীদউদ্দিন।

প্রতিবারের মত এবারও বের হয়েছে একটি বইমেলা জার্নাল, তাতে রয়েছে স্মৃতিচারনমূলকঅসংখ্য লেখা। এই লেখাগুলো পাঠ করলে বইমেলার চমতকার সব পূর্ব আলেখ্য জানারএকটা সুযোগ ঘটে।

এই মেলায় ভাষা কর্নার ও মুক্তিযুদ্ধ কর্নার তৈরী করা হয়, থাকে অসংখ্য বইয়ের সমাহার।

প্রতি বছর মুকতধারা ফাউন্ডেশনের আপ্রান চেষ্টা থাকে সুন্দর ও সার্থক একটি বইমেলা উপহার দেবার। অনেক সময় হয়তো সেটা সম্ভব হয় না নানান কারনে। যেমন এবার বৃষ্টির কবলে পড়ে দুটি দিন খানিকটা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে দর্শক সমাগমও কিংছুটা কমে যায়, ফলশ্রুতিতে বই বিক্রিও কম হয় বলে আমার ধারনা। সাত সমুদ্দুর তের নদীর পারে এসেও আমরা বাংগালিরা আমাদের নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি রক্ষার জন্য ও নতুন প্রজন্মের হাতে আমাদের নিজস্ব ঐতিহ্য তুলে দেবার জন্য আপ্রান চেষ্টা করে যাচিছ। মুক্তধারা আয়োজিত বইমেলাও তার ব্যতিক্রম নয়, প্রবাসে নিজস্ব আবাস গড়ে তোলার জন্য, একখন্ড বাংলাদেশে পরিনত হয় এই বইমেলা। যত বাধা বিপত্তি আসুক না কেন প্রতিবছর নিউ ইয়র্ক মেতে উঠে বইমেলাকে কেন্দ্র করে, উৎসবের মাঝে কয়েকটি দিন অতিবাহিত হয়। আমরা অপেক্ষায় থাকি পরবর্তী বছরের জন্য।


রানু ফেরদৌস | নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, সমাজকর্মী ও সংগঠক।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

ছিন্ন জিহ্বার
Previous Story

ছিন্ন জিহ্বার পদাবলী

ফিফা বিশ্বকাপ
Next Story

প্রাপ্তির খোঁজে কানাডা

Latest from উত্তর আমেরিকা

উত্তর আমেরিকা পঞ্জিকা

জুন ২০২৬-এ উত্তর আমেরিকায় প্রবাসী বাঙালিদের বৈশাখী মেলা, পিকনিক, নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিস্তারিত পঞ্জিকা।
বাংলা নাট্যদল

পোর্টল্যান্ড বাংলা নাট্যদলের সফল প্রযোজনা “দর্পণ”

পোর্টল্যান্ড শহরে শেক্সপিয়ারের হ্যামলেট অবলম্বনে ‘দর্পণ’ নাটকের সফল মঞ্চায়ন! প্রবাসের মাটিতে এই অনবদ্য সাংস্কৃতিক সাফল্যের কথা তুলে ধরেছেন শুভ্র পাল।

ওরেগনের খবর

শনিবার (১৮ এপ্রিল) সৃজন পাঠশালা এবং পিডিএক্স বাংলার আয়োজনে, অরেগনের পোর্টল্যান্ড শহরে, ... লিখেছেন তৌফিক হাসান।

সিলকন ভ্যালী থেকে

জাঁকজমক মেলার মধ‍্য দিয়ে (Spaandhan B) স্পন্দন বি নববর্ষকে বরণ করে নিলো এপ্রিলের ১৮ তারিখে। ... লিখেছেন আজিজ চৌধুরী।