ভাষা মূলত যা প্রাণীর প্রাণের “অনুভূতি” ব্যক্ত করে। তবে সব ভাষায় অনুভূতির ব্যঞ্জনা বা অনুভূতির ধ্বনি একভাবে ব্যক্ত হয় না। যেমন বোবার অনুভূতির ধ্বনিতে আওয়াজ না থাকলেও ভাষা আছে। সেটাকে বলি নীরব ভাষা। আবার মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীর অনুভূতির ধ্বনিও এক না। মানুষের অনুভূতির ধ্বনির সাথে অন্যান্য প্রাণীর অনুভূতির ধ্বনির পার্থক্য অনেক। যেমন পাখির ভাষার ধ্বনি। বাঘ, সিংহ, কুকুর, বিড়ালের ভাষার ধ্বনি ভিন্ন। সব প্রাণ ও প্রাণীর ভাষার ধ্বনি ভিন্ন হয়। গণতান্ত্রিক নেতার ভাষার ধ্বনির চাইতে স্বৈরশাসকের ভাষা ও তাঁর ধ্বনি কিন্তু (Sound) অভিন্ন না।
আমরা আমাদের যেকোনো অনুভূতি ব্যক্ত করতে গেলে সাধারণত হয় তা লিখে করি, বা কথা বলে। লেখাতে আমাদের ভাষা নীরব থাকে, কথাতে আওয়াজ হয়। সাধারণত, আমরা নীরব থাকার চাইতে আওয়াজ করতেই বেশি ভালোবাসি। আওয়াজের “প্রান” ভিন্ন। গান যেমন নিরবে গাওয়া যায় না কথাও তেমন নীরবে বলা কঠিন। তবে ইদানিং আমরা অনেকে চারপাশের নানান যান্ত্রিক শব্দ দূষণের সাথে কথার শব্দ দূষণ খুঁজে পাই। সেটা ব্যক্তিগত পর্যায়ে থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায় পর্যন্ত। ব্যক্তিগত পর্যায়ে কোন কিছুতে হতাশ হলে কিংবা মনের ভিতর কোনো নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জমা হতে হতে অনেক সময় তা নিরব হয়ে যায়।
সমাজে সাংবাদিক, লেখক, কবি, গবেষক এদের ভাষা সাধারণত নীরব। কারণ, তাঁরা কথা বলেন কালি ও কলমে। রাজপথে প্রতিবাদে বা আনন্দ উল্লাসের সৈনিক সবাই হতেও পারি না। সেই সৈনিক হবার একটা নির্দিষ্ট বয়স থাকে, চিন্তা ও স্পিরিট থাকে। জীবনের নির্দিষ্ট সময় কেটে গেলে তারপর যা থাকে তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরব। সেটাও আনন্দ, দুঃখ বা ক্ষোভ প্রকাশের আরেক ভাষা। কালি ও কলমের ভাষা, চোখের ভাষা, হৃদয়ের ভাষা। কখনো কখনো সেটাও থাকে না, জমা থাকে মনের গভীরে, প্রকাশ পায় না। সেটাকে বলি গভীর নীরব ভাষা বা গহীনের ভাষা। এই নীরব ভাষা প্রতিবাদ ও ঘৃণায় যেমন তেমনি এর বিপরীতেও থাকে।
অনেক সময় মনের কোন সুগভীর ইতিবাচক অনুভূতির দর্শন থেকেও মুখের ভাষার ধ্বনি নিরব হতে পারে। ইদানিং ব্যক্তিগতভাবেও এমন একটা “অসুখে” ভুগছি। আগের মত কথা বলতে ইচ্ছা করেনা। তর্ক-বিতর্ক বা কুতর্ক। কেন জানিনা কোনোটাতেই আগ্রহ নাই তেমন, আগে যেমন ছিলো। আসলে সময় তো পাল্টায়, আমাদের মন, চিন্তা, দর্শন এই সব কিছুও তার সাথে পাল্টে যায়। মানুষের বাহ্যিক অনেক কিছু একরকম দেখতে লাগলেও ভেতরটা পাল্টে যায় সময়ের সাথে অভিজ্ঞতার মই (লেডার) বেয়ে, বেয়ে। বাইরে থেকে যা দেখা যায় কম।
যেকোন কিছু দেখা এবং চিন্তার গভীরতার পাশাপাশি অনেক বিষয় পড়াশোনার অভ্যাস ও চর্চা থাকলে মনে হয়, এই জগতের ৯৯ ভাগই তো জানিনা। সামান্য এক ভাগ জানা বা সেই জ্ঞান নিয়ে কত কথাই না বলি। কতো গর্ব,অহংকার চেঁচামেচি। আধুনিকতার একটা বৈশিষ্ট্য, এতে একক ভাবে অনেক সময় “ব্যক্তিকে” একটা বিষয় নিয়ে এত বেশি প্রাধান্য দিই, সেখানে প্রত্যেকে নিজেকে ছোট বড় একটা “পণ্ডিত” বলে মনে হয়। ব্যক্তি “প্রতিষ্ঠানে” রূপান্তরিত হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিছু অস্বীকার করা বা তার সাথে ভিন্নমত পোষণ করা হলে মনে করি এটাই সভ্যতা। এটা উন্নতি। এটা প্রগতি।
মানুষ হলে কথাতো বলতেই হয় ও হবে। তাও ঠিক। কিন্তু সেটা কি কথা! এগুলি কি শুধু কিছুকে “অস্বীকার” করা এবং “চ্যালেঞ্জ” করার কথা! না-কি কিছু বিনয়ের সাথে চিন্তা করা ও”মেনে নেয়া”। পাশাপাশি নিজের অজ্ঞতার কথা স্বীকার করা। কোরানে সূরা কাহফ, ১৮ নাম্বার সূরা, এর একটা কথা। এখানে বলা হয়েছে, (লাইন-৬৮) “যে বিষয় তোমার জ্ঞানের আওতায় নয়, সে বিষয়ে তুমি ধৈর্য ধারণ করবে কেমন করে”! কিন্তু আমরা অনেকে কথা বলার সময় যা যা অস্বীকার করি বা সন্দেহ করি। সেইসব বিষয়ে কিন্তু আমাদের অনেকের কোন জ্ঞানই নাই ও থাকে না। তবু কথা বলি। ঝগড়া করি। তর্ক করি, কুতর্ক করি। এটা আমার মতো অধিকাংশ সাধারণ মানুষের স্বভাব। জ্ঞানী লোকদের তর্ক করতে দেখেছি ও দেখি খুবই কম। কোরআনের কথা সঠিক, আমাদের সব রকম কোন্দল এবং নেতিবাচক মতভেদের একটা বড় কারণ, আমাদের ধৈর্য কম। ধৈর্য কম কারণ, আমাদের জ্ঞান কম। কোরআনও সেই কথা বলে।
ইদানিং আমরা “মেনে” নিতে চাই না অনেক কিছু। মন কেবল খাঁচা থেকে বের হয়ে দিগন্তে উড়তে চায়। উড়তে, উড়তে “দিগন্ত” ধরে ফেলছি বলে মনে করি। অনেকে এও মনে করি যে, এই দিগন্তকে নিরবে কেন মেনে নিব, এর শেষ দেখতেই হবে। তাই আমরা কেবল চোখে দেখা যায় যেটুকু তাকেই না শুধু, যে “দিগন্ত”, “অনন্ত” চোখের দৃষ্টিতে ধরতেও পারি না, তাও অস্বীকার করি। কেউ চ্যালেঞ্জ করি। কেউ অবিশ্বাস করি। এইসব করে প্রত্যেকেই নিজেকে মহাজ্ঞানী ভাবি। যে যত বেশি নিজেকে “বড়” মনে করি, সে ততো বেশি চেঁচামেচি করি, কথা বলি। ঝগড়া করি। তর্ক করি। পাণ্ডিত্য দর্শনে উত্তেজিত হই। বর্তমান সময়ে এর সাথে যোগ হয়েছে সামাজিক আরেক যান্ত্রিক মাধ্যম। ঘরে, ঘরে মুঠোয়, মুঠোয় সেই যন্ত্রে নিজেকে যে যেভাবে পারি আত্ম প্রচারে ব্যস্ত ও বিমুগ্ধ।
এখন অধিকাংশ সময় নিজে বলতে যতটা আগ্রহী, শুনতে বা পড়তে ততটা না। আমার ওঠাবসা, চালচলন এবং ভাবভঙ্গি এমন যে, আমি একক এক ব্যক্তি বেশি জানি। আর সবাই যা জানে তা আমার চেয়ে কম। এই দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শন আমার সাথে অন্যের সম্পর্কে একটা অদৃশ্য কাঁচের দেয়াল তৈরি করে। ইদানিং এই দেয়ালের আস্তরণ গাঢ় হচ্ছে। ফলে আমরা একে অন্যকে সহজে মেনে নিতে চাইনা ও পারিওনা। আমাদের ভেতর সহনশীলতার দর্শন সীমিত। কেবল একা একা ভালো থাকতে চাই। একাই সবকিছু চাই। হতে চাই। পেতে চাই যতটা, দিতে চাইনা ততটা। “দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ”। এই একতাবোধ এবং পরমত সহবাস চিন্তা, সমাজ এবং রাষ্ট্র থেকে প্রায় ধ্বংসের মুখে এখন।
এই পৃথিবীতে ব্যক্তিগত যে খুব অল্প একটা সময় গেছে, তাও না। তাই পৃথিবীর অনেক কিছু না দেখলেও বর্তমান সময়ের আধুনিক যান্ত্রিক ও প্রকৌশল উন্নতির কারণে পৃথিবীকে আগের তুলনায় অনেক বেশি দ্রুত জানা যায়, দেখাও যায়। উপলব্ধি করা যায়। সেখানে দাঁড়িয়েও বলা যায়, কিছুতো দেখছি, অনেক কিছুও দেখে ফেলেছি। হয়তোবা আরো কিছু দেখব। পড়াশোনা বেশি না তবে দেখার অভিজ্ঞতার জ্ঞান একটু বেশি তার চাইতে।
বিশেষ করে ব্যক্তিগত আমার কিছু পড়াশোনা জানা বন্ধুদের সান্নিধ্যে থাকার কারণেও অনেক গভীর ও জটিল কিছু বিষয় আন্তরিকভাবে দেখা ও শেখার সৌভাগ্য হয়। আমার তেমন বন্ধুদের মধ্যে কিছু বন্ধুরা আছে যাদের গবেষণা, পড়াশোনা এবং দেখার সীমানা আমার চাইতেও অনেক ব্যাপক। যেমন আমার নিকট কয়েকজন বন্ধু, প্রফেসর ডক্টর আলী রীয়াজ, প্রফেসর ডক্টর সলিমুল্লাহ খান, ডক্টর এম এ মোমেন। প্রফেসর ডক্টর মাহবুবুর রহমান , প্রফেসর ডঃ ওমর ফারুক। কথাসাহিত্যিক বন্ধু মইনুল আহসান সাবের। ডক্টর সিনহা এম এ সাঈদ। এমনি আরো কয়েকজন বন্ধু। এই তালিকায় কয়েকজন অগ্রজ আছেন তাঁরাও সমাজে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় এবং জ্ঞানী বলে সুপরিচিত। যেমন, ডক্টর সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ, সিনিয়র সচিব মোকাম্মেল হক। সমাজবিজ্ঞানী ডক্টর আশরাফ উদ্দিন আহমেদ। সমাজবিজ্ঞানী, লেখক ও শিক্ষক দেওয়ান শামসুল আরেফীন। অগ্রজ ডক্টর আবেদিন কাদের। প্রমূখ বন্ধুরা। সমাজ ও রাজনীতি বিশ্লেষক, হাসান ফেরদৌস। বিজ্ঞানী, গবেষক এবং চিন্তা নায়ক প্রফেসর ডক্টর আতাউল করিম উল্লেখযোগ্য।
এঁদের অনেকের সাথে বন্ধুত্ব সেই তরুণ বয়সের। কয়েকজন আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক ব্যাচের ছাত্র ছিলাম বিভিন্ন বিষয়ে। আমাদের প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের মতামত ও দৃষ্টিভঙ্গিও যে এক, তা না। কিন্তু আমরা একে অন্যকে পড়তে পারি, বুঝতে পারি, ও বোঝাতেও পারি। আমাদের বড় ঐক্যটা কোথায়! সেটা সহনশীলতা। বিনয় বোধ, সবকিছু “ডিনাই” করা না। আমাদের প্রত্যেকের সমাজ ও রাষ্ট্র দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হলেও আমরা মনে করি, কোন কিছুকে অস্বীকার না করে তাকে স্বীকার করা যদি সেটা মানুষের প্রয়োজনে লাগে তাকে গ্রহণ করা। কুতর্ক না করা। টক্কাটক্কি বা কথার লেজে কথা লাগিয়ে, অথবা পায়ে, পায়ে তর্ক, বড় বিভাজনের পক্ষে। আমরা বন্ধুরা নিরবে এর বিপক্ষে।
একতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত হলেও মানুষের কল্যাণে যদি সেটা ইতিবাচক হয় তাহলে তার প্রতি বিনয় প্রকাশ । বিনয়বোধের ব্যাপারটা আমাদের অনেক চিন্তাশীল মানুষ ও কথিত কিছু বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও খুব একটা বেশি দেখা যায় না এখন। একজন বিখ্যাত নাট্য শিল্পীকে বলতে শুনলাম, বলছেন, তিনি রাজনীতি খুবই ভালো বোঝেন। আমার দেশকে যারা ভালোবাসবে তিনি তাকেই ভালোবাসবেন অথবা আমরা তো তাকেই ভালোবাসবো! আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, দর্শন আমাদের পতাকা, যারা ভালবাসবে আমি শুধু তাকেই ভালোবাসবো। বিনয়ের সাথে নিজেকেই প্রশ্ন করি, আসলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে আমরা যে দলীয় ক্যাপসুল খাওয়াচ্ছি বিগত পঞ্চাশ বছর ধরে দেশের সাধারণ মানুষ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে। এই ক্যাপসুলে যে যে উপাদান আছে, তার কতটা স্বাধীনতা উত্তর সময় থেকে এখন পর্যন্ত কয়জন বুঝি, কয়জন জানি বা মানছি তা বিগত বহু যুগ ধরে!! এই জিজ্ঞাসাটা কি খুবই অবান্তর! আমাদের সমাজে একবার কেউ একটা “দলীয়” মাত্রায় চলে গেলেই ধরে নিই, সে আমাদের আদর্শ পুরুষ, নারী, নেতা বা শিল্পী!
একটা কবিতা আছে, আণবিক বোমা বোঝো, মানুষ বোঝনা! আমরা এখন অনেকেই অল্পস্বল্প কিছু জেনে অনেক কিছু বোঝাতে চাই, কিন্তু মানুষ কাকে বলে!! মানুষ কোথা থেকে এলো। এইসব অনেক প্রশ্নে আমরা কুতর্কে মেতে যাই। আমরা কেবল জাগতিক মানুষের জাগতিক জীবন যাপন ও বস্তু সংস্কৃতিতে এত বেশি ভক্ত ও ব্যস্ত যে আমরা এই জীবন, যা এই আছে, এই নাই। এতোই ক্ষুদ্র আমাদের এই “জীবন” পরিসর। এর পরে কি! কিছু আছে, নাকি নাই। সেটাও জানি না! এই না জানার কোন কিছু নিয়ে আমাদের অনেক সচেতন মানুষদের মধ্যে কোন নড়াচড়া নাই। আমরা তাদেরকেও বলি বুদ্ধিজীবী! পন্ডিত, প্রগতিশীল!! আধুনিকতা আমাদের যতটা জ্ঞানে আধুনিক করেছে চিন্তায় ততটা করে নাই। অনেকেই চিন্তায় রয়ে গেছি প্রাগৈতিহাসিক, জীর্ণ, রক্ষণশীল ও সংকীর্ণ। আমাদের মধ্যে দ্বিতীয় একজন কবি ইকবাল, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জসীমউদ্দীন দেখিনা আর। শিল্প সাহিত্যেও একজন শেক্সপিয়ার খুঁজে পাওয়া যায় না। সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তায় দার্শনিক রাসেল, ইমানুয়েল কান্ট বা বর্তমান সময়ের প্রফেসর চমস্কি। এঁদের মতো পন্ডিত বিশ্ব সমাজে বিলীন হয়ে গেছে। তাঁদের কোন বিকল্প তৈরি হয় নাই। কোথাও কোথাও কপি তৈরি হয়েছে, অনেকটা “চাইনিজ” মেইড!
এও ভাবি যে গতির কোন নিশ্চয়তায়ই নাই, সেই গতির বেগ যতই দ্রুত হোক, যতই সম্মুখে চলুক সেটা, এর সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা সবটাই প্রগতির হতে পারে কিনা! অর্থাৎ প্রগতি কথার অর্থ যদি হয় শুধু সম্মুখ দিকে ভাবা, সম্মুখে চলা। এই সম্মুখের শেষ যখন প্রতি ঘন্টায়, প্রতি মুহূর্তে দৃষ্টির মধ্যে দেখি অনিশ্চিত। তখন জাগতিক এই “সম্মুখের” সংজ্ঞা ও তো পাল্টে যায়, চূড়ান্ত না। অনেক কিছুকে আমাদের কাছে গতিময় মনে হয় আবার একেক সময় অনেক কিছুকে গতিহীন বলেও মনে করি। কিন্তু এই “গতি” এবং “গতিহীন” কল্পনায় যা আমাদের আসে। আমরা কি করে বলি, এটাই গতি বা এটা গতিহীন! মহাকাশে যে লক্ষ লক্ষ তারা গতিময় থাকে, ঐ গতি কি আমরা দেখতে পারি পৃথিবীর মাটিতে বসে!
সূর্যকে ঘিরে পৃথিবীর গতি কিভাবে বুঝি! শুধু রাত ও দিনের মধ্যেই কি!
ইদানিং লক্ষ্য করা যায়, আমাদের কথা এবং তর্ক করার কোন শেষ নাই যেনো। সবাই কথা বলি সব বিষয়ে। কথা শুনি কম। পড়িও কম। গবেষণা তো করি ই না। তবু নিজেকে জ্ঞানী মনে করি। আমরা অনেকে একেক সময় একেক ভাবে একেকটা বিষয় বা চিন্তাকে উপস্থাপন করি নিজেদের একক বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে যা হাস্যকর। কারণ, এমন অনেক বিষয়ের কোন যুক্তি নাই, গবেষণা নাই। জ্ঞান নাই। কি আছে! আছে, অল্প কিছু বিদ্যার বড় ভয়ংকর রূপ। আধুনিক সভ্যতা বহু ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান ভেঙ্গে ব্যক্তিকেই প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিনির্মাণ করে। যার ফলে অনেকেই আমরা জীবন ও জগতের অনেক মৌলিক প্রজ্ঞা, মানবতা, শিক্ষা, ধৈর্য, সহনশীলতা। । এইসব থেকেও দূরে সরে যাচ্ছি এবং গেছিও।
এখন ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে, পরিবারে, সমাজ ও রাষ্ট্রে। পাশাপাশি বিশ্বে। যে অনিয়মের চিত্র প্রতিদিন দেখা যায়, শোনা যায় এবং ধ্বনিত হয়। সেইসব দেখে শুনে এখন আর আগের মতো কোথাও কিছু বলতে ইচ্ছা করেনা। কিছু বলা ও প্রতিবাদের অনেক ভাষা এখন মুখ থুবরে পড়ে আছে।
কে শুনবে কার কথা! অনেক বড় গুণের মানুষ অনেকেই এমন অনেক কথা বলে গেছেন আমাদের আগে। সেই কয়টা কথা আমরা শুনেছি! কাউকে শুনলেই মনে করি, এই হেরে গেলাম বুঝি “আমি”। আমরা সবাই যে জিততে ও বিজয়ী হতে চাই। ব্যক্তিতন্ত্রতো কেবল রাজনীতিতেই না; সমাজ-সংস্কৃতির মূল্যবোধেও ঢুকে গেছে সব শ্রেণীর ভেতরে।
বাংলাদেশে ভারতের বর্ডার থেকে শুরু করে ইরানের মাটিতে পরাশক্তি এবং আধিপত্যবাদীদের যে জয় ও হুংকার এখন চারদিকে শুনি তাতে মনে হয়, এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদে যে ঐক্য আমাদের দরকার। সেই ঐক্য আমাদের এখনো অনেক দুর্বল নানা কারণে। চারিদিকে মিথ্যাচার, নানান ধরনের কথার প্যাচ ও কূটনীতির চাতুরী। সব সততা, একতা ও ভ্রাতৃত্বকে রাজনীতির বেরঙ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্ন ভাবে তুলে ধরছি। নতুন করে আসছে ১৪০/১৬০ কোটি যোগ ২০ কোটির গণতান্ত্রিক স্বপ্ন, এবং সব উন্নতিও নাকি এক সুতোয় গাঁথা। আমাদের একাত্তরের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও যুদ্ধ কি ছিল ভবিষ্যতেৎ বৃহত্তর ভারতের অংশ হতে?
আমরা বাংলাদেশীরা সবসময় একটু আবেগপ্রবণ, কবিতা প্রিয়। তাই কবিতা দিয়ে বলা হয় একই আকাশ, একই বাতাস একই সংস্কৃতির কথা। তাই এই আমরা এক হয়ে থাকতে পারলে আমাদের শক্তি বাড়বে, শান্তি বাড়বে! আমাদের মধ্যে যারা প্রতিদিন দেশপ্রেমের সৈনিক হিসেবে নিজেদেরকে দাঁড় করাই স্বাধীনতার চেতনা বলে নিজেদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের কথা বলি। তারাও এক হয়ে প্রতিবাদ করিনা বা করতে পারি নাই যে ১৬০ কোটি আর ২০ কোটি এখানে এক না। আমাদের বিশ কোটির স্বপ্ন আলাদা।
উল্লেখিত বিষয়গুলিতে নানার কথার গুঞ্জনের প্রতিবাদ করি নিরবে এই লেখার মাধ্যমে। এই প্রতিবাদের ভাষা নিরব। আজকের পৃথিবীতে নানান জাতীয় অপঘটনার প্রেক্ষাপট এত গভীর যে ভাষা সেখানে নিরব হয়ে যায়। ফুলেরও জলসায় নিরব কেন কবি! কবি নিরব হলেও তাঁর চোখের ভাষায় পড়তে পারি সে কেন নিরব!
নীরবতারাও একটা ভাষা আছে, উচচ ধ্বনি নাই থাক। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলি, ‘আমি কান পেতে রই, ও আমার আপন হৃদয়গহন
দ্বারে দ্বারে বারে বারে….” অনেক অদেখা এবং অজানা অনেক সত্তা এবং বস্তুর উপস্থিতিও অনুভব করি নীরবে। আজকের অনেক সমাজের অব্যবস্থাপনা ও সংস্কৃতিও বদলে যাবে এক সময় প্রকৃতির নিরব নিয়মে। প্রকৃতিতে বাতাসের নিরব ভাষা, গাছে পাতার রঙয়ের নীরব পরিবর্তন। প্রকৃতির ঋতু বদলায়। এই নীরবাতারও ভাষা আছে।
১৯ জুন, ২০২৬


1 Comment
I just read your story—it was absolutely beautiful and truly touched my heart. We may have become mothers, but we also need to understand the generation gap, and you have highlighted it so thoughtfully. Please keep writing like this. It’s truly well appreciated. Wishing you all the very best—keep going!