পড়শী সাহিত্য ও শিল্প শেষ ট্রেনের সওয়ারি

শেষ ট্রেনের সওয়ারি

Post Views: 116

রাত পৌনে দশটার সোদপুর স্টেশন চত্বর। দিনের চড়া আলো আর চেনা ব্যস্ততা ধুয়েমুছে গিয়ে এখন সেখানে একটা ক্লান্ত, কালচে আলো-ছায়ার খেলা। চারদিকের চায়ের দোকানগুলো ঝাঁপ ফেলার তোড়জোড় করছে, দু-একটা চপ-কাটলেটের দোকানে কড়ায়ের তলায় ধিকিধিকি জ্বলছে কয়লার আগুন। বিটি রোডের দিক থেকে আসা শেষদিকের কিছু অটো আর রিকশর হর্ন বাতাসে ভেসে আসছে। শিয়ালদহগামী আপ লোকালটা সবেমাত্র তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে চলে গেল, একঝাঁক ক্লান্ত যাত্রী যে যাঁর বাড়ির উদ্দেশ্যে দ্রুত পায়ে হেঁটে বেরিয়ে যাচ্ছেন স্টেশন চত্বর থেকে।

এই চেনা ভিড়ের উল্টোদিকে, চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির মুখে আলোর খুঁটিটার নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন অবিনাশবাবু। পরনে একটা মলিন, কয়েক জায়গায় তালি দেওয়া সুতির ফতুয়া আর খাটো ধুতি। কাঁধ থেকে ঝুলছে একটা মলিন চটের ব্যাগ। ডানহাতে একটা প্লাস্টিকের ছোট গামলা, তাতে গোটা চারেক খোপ কাটা। একটায় নুন-লঙ্কা মাখানো ছোলা ভাজা, একটায় চিনেবাদাম, একটায় সেদ্ধ সবুজ মটর আর অন্যটায় কয়েকটা ঠোঙা।

বাতাসে উথালপাথাল করা একঘেয়ে আওয়াজকে ছাপিয়ে ওনার গলা থেকে একটা ভাঙা, খসখসে আওয়াজ বেরোনোর চেষ্টা করছিল, “যা নেবে… সবকটা পাঁচ টাকা। বেশি দাম বললে তো কেউ নেবে না…”

কথাটা শেষ করতে গিয়ে ওনার শুকনো ঠোঁটদুটো কেঁপে উঠল। আজ বিকেল থেকে ডান হাঁটুটা ছিঁড়ে যাচ্ছে যন্ত্রণায়। দু-বছর আগের স্ট্রোকের পর থেকে ডানদিকের শরীরটা ঠিক নিজের বশে থাকে না। সোজা হয়ে দাঁড়াতে গেলে কোমর থেকে পা পর্যন্ত একটা কাঁপুনি চড়চড় করে ওপরের দিকে উঠে আসে। তাও শক্ত কাঠের মতো দাঁড়িয়ে থাকার চেষ্টা করছিলেন অবিনাশবাবু। আজ খড়দহ স্টেশন থেকে শুরু করেছিলেন, তারপর রহড়া বাজার হয়ে সোদপুরে এসেছেন। কিন্তু ব্যাগ এখনও বেশ ভারী। আর আধ সেরটাক বাদাম আর ছোলা পড়ে রয়েছে। এগুলো বিক্রি না হলে কাল সকালের উনুনটা জ্বলবে না। ঘরে সত্তর ছুঁইছুঁই অসুস্থ স্ত্রী রাধারাণী পথ চেয়ে বসে আছেন। ওনার সুগারের ওষুধটাও শেষ।

“এই দাদু, একটু সরে দাঁড়াও না! রাস্তার মাঝখানে এভাবে জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে মানুষ যাবে কোন দিক দিয়ে?”—একটা বাইক আরোহী হর্ন বাজাতে বাজাতে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় বিরক্তি উগরে দিল।

ধাক্কাটা সামলাতে গিয়ে অবিনাশবাবুর হাতের গামলাটা সামান্য কাত হয়ে গেল, কয়েকটা বাদাম ছিটকে পড়ল নোংরা পিচের রাস্তায়। উনি অপরাধীর মতো একটু পিছিয়ে এসে স্টেশনের লোহার রেলিংটা ধরলেন। চোখ দুটো ঝাপসা হয়ে আসছিল ওনার। পঁচাত্তর বছর বয়সে এসে এই শরীর নিয়ে রাত দশটায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকাটা কোনো শখ নয়। কিন্তু নিয়তি যখন কোনো বিকল্প রাখে না, তখন লড়াইটাই একমাত্র ধর্ম হয়ে দাঁড়ায়। উনি ভিক্ষা করতে পারবেন না, কোনোদিন করেননি। একসময় ডানলপের একটা ছোট কারখানায় কাজ করতেন। কারখানা লক-আউট হওয়ার পর জমানো পুঁজি শেষ হতে সময় লাগেনি। একমাত্র ছেলেও আজ বহু বছর হলো সংসর্গের সীমানা ছাড়িয়ে দূর শহরে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছে, বুড়ো মা-বাবার খবর নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি।

অবিনাশবাবু গামলাটা আবার বাঁহাতে শক্ত করে ধরলেন। গলাটা ঝেড়ে নিয়ে বুকভরে বাতাস টেনে আবার বললেন, “যা নেবে বাবু, পাঁচ টাকা… সব পাঁচ টাকা…”

ঠিক সেই সময়ই স্টেশন রোড ধরে হেঁটে আসছিল অনির্বাণ। বয়স ছাব্বিশ-সাতাশ, আইটি সেক্টরের চাকরি। ল্যাপটপের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলছে, চোখে-মুখে সারা সপ্তাহের খাটুনির পর শুক্রবার রাতের ক্লান্তি। সোদপুর ট্রাফিক মোড় থেকে একটা অটো ধরে নিজের ফ্ল্যাটে ফেরার তাড়া ছিল তার। কিন্তু সিঁড়ির মুখের ওই ভাঙা, খসখসে গলার আওয়াজটা তার কান এড়াতে পারল না।

অনির্বাণ থমকে দাঁড়াল। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে সে লক্ষ্য করল প্রবীণ ভদ্রলোককে। ল্যাম্পপোস্টের হলুদ আলোয় ওনার কাঁপতে থাকা পা দুটো আর ফতুয়ার আস্তিনে মুছে নেওয়া কপালের ঘাম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। অনির্বাণের বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। এই বয়সে যখন মানুষের ঘরে নাতি-নাতনি নিয়ে শান্তিতে গল্প করার কথা, তখন এই মানুষটি এক মুঠো ছোলার জন্য শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করছেন!
সে পকেটে হাত দিল। মানিব্যাগ থেকে একটা একশো টাকার নোট বের করে সে অবিনাশবাবুর সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“দাদু, আমাকে দুটো বাদাম আর দুটো ছোলা ভাজার ঠোঙা দাও তো।” অনির্বাণ মৃদু গলায় বলল।

অবিনাশবাবু চমকে তাকালেন। চোখে এক মুহূর্তের জন্য যেন বিশ্বাসের আলো খেলে গেল। কাঁপা কাঁপা হাতে একটা ঠোঙায় বাদাম আর অন্যটায় ছোলা তুলতে তুলতে বললেন, “এই নাও বাবা। সব পাঁচ টাকা করে… কুড়ি টাকা হলো।”

অনির্বাণ একশো টাকার নোটটা ওনার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “রাখো দাদু, খুচরো ফেরত দিতে হবে না। তুমি এবার বাড়ি যাও, অনেক রাত হয়েছে।”

অবিনাশবাবু নোটটার দিকে তাকালেন, তারপর অনির্বাণের মুখের দিকে। ওনার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল, কিন্তু পরক্ষণেই ওনার চোয়ালটা শক্ত হয়ে গেল। মাথাটা সামান্য নেড়ে অনির্বাণকে নোটটা ফিরিয়ে দিয়ে বললেন, “না বাবা, এ আমি নিতে পারব না। পাঁচ টাকা দাম, চারটে ঠোঙায় কুড়ি টাকাই নেব। বেশি নিলে ওটা তো দান নেওয়া হবে। আমি তো ভিখিরি নই বাবা, খদ্দেরের কাছে সওদা বিক্রি করছি।”

কথা কটি বলতে গিয়ে ওনার গলাটা বুজে এলো, কিন্তু আত্মসম্মানের সেই দৃঢ়তা অনির্বাণের বুকে গিয়ে সজোরে আঘাত করল। অনির্বাণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে নিজের ভুলটা বুঝতে পারল। এই মানুষটি করুণা চান না, উনি ওনার শ্রমের মর্যাদা চান।

অনির্বাণ পকেট হাতড়ে একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে ওনার হাতে দিল। অবিনাশবাবু পরম শান্তিতে নোটটা নিলেন এবং ঠোঙাগুলো অনির্বাণের হাতে তুলে দিলেন। তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার সোদপুর মোড়ের দিকে পা বাড়ালেন। ওনার কাঁপতে থাকা শরীরটা অন্ধকারের মধ্যে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছিল।

বাড়ি ফিরে অনির্বাণ ফ্রেশ হয়ে বসল ঠিকই, কিন্তু ওনার ওই কথাটা—”আমি তো ভিখিরি নই বাবা…”—তার মাথায় হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। সে ল্যাপটপটা খুলল। অনির্বাণ একজন শৌখিন লেখক, সোশ্যাল মিডিয়ায় মাঝে মাঝে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে লেখে। আজ রাতের এই অভিজ্ঞতাটা সে আর নিজের মধ্যে চেপে রাখতে পারল না।

সে কিবোর্ডে আঙুল চালাল। সোদপুর, খড়দহ আর রহড়া অঞ্চলের এই লড়াকু বৃদ্ধের কথা, ওনার ওই পাঁচ টাকার সওদার কথা এবং সর্বোপরি ওনার সেই আকাশছোঁয়া আত্মসম্মানের গল্পটা সে শব্দে শব্দে বুনে দিল। লেখার শেষে সে একটি আন্তরিক অনুরোধ জুড়ল:

“যাঁরা এই রুটে যাতায়াত করেন, এই প্রবীণ মানুষটিকে দেখলে দয়া করে ওনার থেকে কিছু কিনে নেবেন। ওনাকে কোনো দয়া বা ভিক্ষা দেবেন না, শুধু পাঁচ টাকার একটা ঠোঙা কিনে ওনার লড়াইটাকে কুর্নিশ জানাবেন। আমাদের সামান্য কয়েকটা টাকা হয়তো ওনাকে একটু তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দেবে।”

পোস্টটি শেয়ার করে অনির্বাণ যখন ঘুমোতে গেল, তখন রাত বারোটা। সে জানত না, ইন্টারনেটের দুনিয়া কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাবে।

পরদিন শনিবার। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই অনির্বাণের মোবাইলের নোটিফিকেশন টোনটা যেন পাগল হয়ে গেল। ফেসবুক খুলে সে তাজ্জব! ওনার সেই পোস্টটা কয়েক হাজার মানুষ শেয়ার করেছেন। কমেন্ট সেকশনে উপচে পড়ছে মানুষের আবেগ। সোদপুর, খড়দহ, পানিহাটি, ব্যারাকপুরের শয়ে শয়ে মানুষ লিখেছেন—”আজই ওনাকে খুঁজতে বেরোব”, “অফিস থেকে ফেরার পথে আমি রোজ ওনার থেকে বাদাম কিনব।” বারুদ যেমন একটা স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষায় থাকে, ঠিক তেমনি মানুষের ভেতরের সুপ্ত মানবিকতাটাও যেন এই একটা পোস্টের মাধ্যমে জেগে উঠেছে।

অনির্বাণ আর ঘরে বসে থাকতে পারল না। ঘড়িতে তখন সন্ধে সাতটা। সে একটা বাইক নিয়ে সোজা চলে এলো সোদপুর স্টেশনে।

আজকের স্টেশন চত্বরের পরিবেশটা যেন একটু অন্যরকম। প্রতিদিন যেখানে মানুষ শুধু ট্রেনের দিকে ছোটেন, আজ সেখানে অনেককে দেখা যাচ্ছে প্ল্যাটফর্মের সিঁড়ির আশেপাশে কাউকে যেন খুঁজে বেড়াচ্ছেন। অনির্বাণ একটু এগিয়ে যেতেই দেখল, চার নম্বর প্ল্যাটফর্মের সেই চেনা আলোর খুঁটিটার নিচে আজ এক অভূতপূর্ব দৃশ্য!

অবিনাশবাবু রোজকার মতোই ওনার চটের ব্যাগ আর গামলা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু আজ উনি একা নন। ওনাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে জনা পনেরো তরুণ-তরুণী আর অফিসফেরত মধ্যবয়সী মানুষ।

“দাদু, আমাকে তিনটে মটর সেদ্ধ দিন!” এক কলেজপড়ুয়া মেয়ে হাসিমুখে বলল।

“আমাকে দুটো বাদাম আর দুটো ছোলা দেবেন, বাড়িতে ছেলেমেয়েরা খাবে,” এক ভদ্রলোক মানিব্যাগ বের করতে করতে বললেন।

অবিনাশবাবু আজ চরম বিস্ময়ে থতমত খেয়ে গেছেন। ওনার কাঁপা কাঁপা হাত দুটো আজ যেন আনন্দের আতিশয্যে আরও বেশি কাঁপছে। উনি ঠোঙা তৈরি করতে পারছেন না এত তাড়াতাড়ি। ওনার চার খোপের গামলাটা আধ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় খালি হয়ে এসেছে।

“আজ কী কাণ্ড বাবা! সবাই এসে আমার নাম ধরে ডাকছে। কেউ কেউ তো আমার সাথে ছবিও তুলছে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না,” অবিনাশবাবু ওনার ভাঙা গলায় পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক যুবককে বলছিলেন, ওনার চোখে তখন আনন্দের জল।

ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো সোদপুর স্টেশনেরই এক স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির কর্মকর্তা। তিনি অবিনাশবাবুর সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার হাতে একটা নতুন, মজবুত প্লাস্টিকের ফোল্ডিং চেয়ার আর একটা বড় ফ্লাস্ক।

“অবিনাশবাবু, আপনি আমাদের এই এলাকার গর্ব। এই বয়সে আপনার এই লড়াই আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে। আমাদের সমিতির তরফ থেকে এই চেয়ারটা আপনাকে দিলাম। আপনি আর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কষ্ট করবেন না, এবার থেকে এখানে চেয়ার পেতে বসে বিক্রি করবেন। আর এই ফ্লাস্কে গরম চা রইল ওনার জন্য,” ভদ্রলোক পরম শ্রদ্ধায় অবিনাশবাবুর কাঁধে হাত রাখলেন।

চারপাশের মানুষ হাততালি দিয়ে উঠল। স্টেশন চত্বরের কোলাহল ছাপিয়ে সেই হাততালির আওয়াজ যেন এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে এলো।

ভিড়ের একটু দূরে দাঁড়িয়ে অনির্বাণ পুরো দৃশ্যটা দেখছিল। তার চোখের কোণটা ভিজে উঠেছিল আবেগে। সে এগিয়ে গেল না, নিজের পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন সে বোধ করেনি। মানুষের এই যৌথ ভালোলাগা আর সহানুভূতির জয় দেখে তার বুকটা গর্বে ভরে উঠল।

রাত ঠিক সাড়ে আটটা। অন্যদিন যেখানে রাত এগারোটাতেও অবিনাশবাবুর সওদা শেষ হতো না, আজ সাড়ে আটটার মধ্যেই ওনার চটের ব্যাগ একেবারে খালি। একটা দানাও আর অবশিষ্ট নেই।

অবিনাশবাবু ওনার নতুন চেয়ারটা ভাজ করে দেওয়ালে ঠেঁস দিয়ে রাখলেন। ওনার ফতুয়ার পকেটে আজ বেশ কিছু কড়কড়ে নোট আর খুচরো পয়সা। আজ উনি রাধারাণীর সুগারের ওষুধটা শুধু কিনবেন না, সাথে হয়তো আধ কেজি মিষ্টিও নিয়ে যেতে পারবেন।

বাড়ি ফেরার জন্য উনি যখন তৈরি হচ্ছেন, তখন ওনার চোখ পড়ল দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অনির্বাণের ওপর। অবিনাশবাবু অনির্বাণকে চিনতে পারলেন। কাল রাতের সেই যুবকটি, যে ওনার আত্মসম্মানকে আঘাত না করে কুড়ি টাকা দিয়ে গিয়েছিল।

বৃদ্ধ লাঠিটায় ভর দিয়ে ধীর পায়ে অনির্বাণের সামনে এসে দাঁড়ালেন। ওনার মুখের বলিরেখাগুলো আজ আর ক্লান্তির কথা বলছে না, সেখানে আজ এক অনাবিল শান্তির হাসি।

“বাবা…” অবিনাশবাবু ওনার কাঁপতে থাকা হাতটা অনির্বাণের মাথায় রাখলেন। “আমি জানি না আজ কী জাদু হয়েছে। কিন্তু আমার মন বলছে, এই সবকিছুর পেছনে তোমার মতো কোনো ভালো মানুষের হাত আছে। ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন বাবা।”

অনির্বাণ নিচু হয়ে অবিনাশবাবুর পা ছুঁয়ে প্রণাম করল। বলল, “আমি কিচ্ছু করিনি দাদু। এটা আপনার সততা আর লড়াইয়ের পাওনা। আপনি রোজ আসবেন তো?”

অবিনাশবাবু সোজা হয়ে দাঁড়ালেন। ওনার চোখ দুটো ল্যাম্পপোস্টের আলোয় চকচক করে উঠল। উনি হেসে বললেন, “যতদিন এই শরীরে প্রাণ আছে বাবা, আসব। এখন তো আমার কত নাতি-নাতনি তৈরি হয়ে গেছে এই স্টেশনে! তারা আমার পথ চেয়ে বসে থাকবে না?”

অবিনাশবাবু চেয়ারটা কাঁধে তুলে নিয়ে স্টেশনের বাইরের রাস্তার দিকে পা বাড়ালেন। আজ ওনার পা দুটো আর তেমন কাঁপছিল না, ওনার হাঁটার মধ্যে আজ ছিল এক অদ্ভুত তৃপ্তি আর জোর।

আকাশে তখন একফালি চাঁদ উঠেছে। সোদপুর স্টেশনের ওপর দিয়ে একটা ডাউন ট্রেন তীব্র হুইসেল বাজিয়ে চলে গেল। অনির্বাণ সেই ট্রেনের আলোর দিকে তাকিয়ে হাসল। জীবন সত্যিই সুন্দর, আর সেই সৌন্দর্য বেঁচে থাকে মানুষের ভেতরের এই অবিনশ্বর ভালোবাসায়।

১৫ জুন, ২০২৬


দক্ষিণ কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত

চলচ্চিত্র কাহিনীকার। স্ক্রিন রাইটার। শেষ অঙ্ক, মন্দবাসার গল্প, অংশুমান MBA, নির্বাণধামে জোড়া খুন, বাসস্টপ, সরলাক্ষ হোমস।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।