মানুষের জীবনে সত্য, সৃষ্টিশীল চিন্তা, আত্মসংযম ও মানবিক কর্তব্য—এই চারটি মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। এই মূল্যবোধগুলো থেকে উৎসারিত নীতিমালার প্রয়োগে সমাজ ও রাষ্ট্র এগিয়ে যায় বহু দূর। আজকের পৃথিবীতে যখন বিভাজন, ক্ষমতার লোভ ও নৈতিক অবক্ষয় আমাদের চার পাশকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছে, এবং যার ফলে সংঘটিত হচ্ছে যুদ্ধ, পরাশক্তির আগ্রাসন, নির্মমতা ও বর্বরতা তখন ইতিহাসের সেই মানুষ গুলোর দিকে ফিরে তাকানো জরুরি, যারা নীতির জন্য জীবন বাজি রেখে ছিলেন। এমন অসংখ্য উদাহরণ আছে, কিন্তু আমি বেছে নিয়েছি আলেকজান্ডার সলঝেনিৎসিন ও তাজউদ্দীন আহমদকে—কারণ তাঁরা দু’জনই আমার সময়ের মানুষ, দুজনেই জন্মেছেন একই যুগে, এবং তাঁদের সতর্কবাণী ও নৈতিক দৃঢ়তা আজও গভীরভাবে প্রাসঙ্গিক। একজন সাহিত্যিক, অন্যজন রাষ্ট্রনায়ক—কিন্তু দু’জনেরই জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সত্য, ন্যায় ও মানবিক দায়বদ্ধতা।
সলঝেনিৎসিন: নৈতিক সাহসের সাহিত্যিক প্রতিমূর্তি
১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস, আমি তখন স্কুলের ছাত্রী। সে সময় প্রেসে ছাপা পত্রিকা ছিল বিশ্বের খবরা-খবর জানবার প্রধান মাধ্যম। সেই পত্রিকার জানালা দিয়ে এক চিলতে আলোর মত একটি নাম উদ্ভাসিত হল। আলেকাজান্ডার সলঝেনিৎসিন। খবরে প্রকাশিত হয়েছিল যে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন সরকার সলঝেনিৎসিনের সত্যনিষ্ঠ সাহসী লেখার কারণে তাকে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে তাঁর নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে এবং দেশত্যাগে বাধ্য করেছে। তিনি তার লেখায় অকুতভয়ে উন্মোচন করেছিলেন সোভিয়েত গুলাগ কারাগারের নির্মমতা।
গুলাগের বন্দীদের এক বড় অংশের একমাত্র অপরাধ ছিল সরকারের সমালোচনা করা। সোভিয়েত সরকারের মনঃপুত নয় এমন স্বাধীন মতামত প্রকাশ এবং সরকার প্রধান স্তালিনের সমালোচনার জন্যে সলঝেনিৎসিন নিজেও আট বছর গুলাগ কারাগারে সশ্রম-কারাদণ্ড ভোগ করে ছিলেন। কারাগার থেকে মুক্তি লাভের পরেও তাকে নিজ দেশেই নির্বাসিত ও নজর-বন্দী করে রাখা হয় বহু বছর। কিন্তু মত আর চিন্তাকে তো বন্দী করে রাখা যায় না!
১৯৭০ সালে তিনি নোবেল পুরস্কার পান তাঁর সাহিত্যকর্মের নৈতিক শক্তি ও সত্যনিষ্ঠতার জন্য—কোনো একক বইয়ের জন্য নয়, বরং তাঁর সমগ্র সাহিত্যিক সংগ্রামের জন্য। কিন্তু সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি সেই পুরস্কার গ্রহণের জন্য দেশের বাইরে যেতে পারেন নি। পরে, ১৯৭৩ সালে ফ্রান্সে প্রকাশিত শ্রম কারাগারের অকপট বিবরণ সমন্বিত The Gulag Archipelago বইটির কারণে শেষ পর্যন্ত তাকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়।
নিজ রাষ্ট্র তাকে দেশদ্রোহী সাব্যস্ত করলেও, সোভিয়েত ইউনিয়নের আদর্শিক প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সমগ্র পশ্চিমা বিশ্বের কাছে হয়ে ওঠেন মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের এক সাহসী নায়ক। সুইজারল্যান্ডে দুই বছর বসবাসের পর নিরাপত্তার কারণে নির্বাসিত জীবনের বাকি আঠারো বছর কাটিয়ে দেন যুক্তরাষ্ট্রে। ভারমন্ট স্টেটের ঘন অরণ্য পরিবেষ্টিত এক গ্রাম্য এলাকায় নিভৃতে সৃষ্টি করেন আরো কিছু কালজয়ী লেখনী। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হলে সলঝেনিৎসিন তার জন্মভূমি রাশিয়াতে ফিরে যান এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
নির্বাসনে থাকাকালীন সময়ে তিনি তাকে আশ্রয়দানকারী মুক্ত বিশ্বের প্রতিনিধিত্বকারী যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য রাষ্ট্র ব্যবস্থার স্তুতিগান গাননি বা তার অন্ধ সমর্থক হয়ে ওঠেন নি। বরং নির্বাসনে গিয়ে তিনি আরও স্পষ্টভাবে বললেন—স্বাধীনতা যদি দায়িত্বহীন হয়, তবে তা আত্মবিনাশ ডেকে আনে। ভোগবাদ, ব্যক্তিস্বাধীনতার নামে স্বার্থপরতা, এবং সুখের অন্ধ অনুসন্ধান—মানুষকে নৈতিকভাবে শূন্য করে দেয়। তিনি সত্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত নৈতিকবোধকে উচ্চতর এবং চিরন্তন জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত করে ছিলেন, যার বিকাশ আইন দিয়ে নয় বরং আত্মিক পরিশুদ্ধির সংগ্রাম দিয়েই সম্ভব। তিনি বিশ্বাস করতেন যে নৈতিকতাবোধ শুধু ব্যক্তিকেই রক্ষা করে না বরং সমাজকেও রক্ষা করে অমানবিকতার হাত থেকে। তিনি বলেছিলেন যে কমিউনিস্ট রাষ্ট্রে মানুষের স্বাধীনচিন্তা ও বাক স্বাধীনতাকে জেল-জুলুমের মাধ্যমে নিষ্পেষণ করা হয়। আর যুক্তরাষ্ট্রে অপ্রিয় সত্য ও চিন্তাকে দমন করা হয় সূক্ষ্মভাবে, তাকে মূলধারায় প্রকাশ হতে না দিয়ে। বড় বড় সংবাদ মাধ্যমগুলো একই মতাদর্শের সংবাদ প্রকাশ করে থাকে। সেইসব সংবাদে বর্তমান শতাব্দীর গুরতর চ্যালেঞ্জ নৈতিকতার স্খলনের ব্যাপার খুব কম আলোচিত হয়। নৈতিকতাবিহীন রাজনীতি সমাজের পতন নিয়ে আসে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত বক্তৃতায় তিনি সতর্ক করেন—সভ্যতা ভেঙে পড়বে যদি মানুষ সত্য, ন্যায় ও মানবিক কর্তব্য ভুলে যায়। একবিংশ শতাব্দীতে তার সতর্ক বাণী অনেকটা ভবিষ্যৎ বাণীর মতই ফলে যায়।
সলঝেনিৎসিনের এই দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সতর্কতা ও নৈতিক দৃঢ়তা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল। আর সেই স্পর্শই আমাকে নিয়ে যায় বাংলাদেশের ইতিহাসের আরেক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নৈতিক মহীরুহের কাছে—তাজউদ্দীন আহমদের কাছে।
তাজউদ্দীন আহমদ: নৈতিকতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রনায়কত্ব
বাংলাদেশের ক্রান্তিলগ্নে, যখন স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগারে বন্দী, তখন মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার গুরু দায়িত্ব এসে পড়ে তাজউদ্দীন আহমদের কাঁধে। ১৯৭১ সালে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর মরন হামলার মুখে তিনি ও ব্যারিস্টার আমীর-উল-ইসলাম ছুটে চলেছিলেন অজানার পথে। সেই যাত্রাপথেই ৩০ মার্চ, ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তটি তিনি নেন।
তিনি বলেন, ‘পালিয়ে যাবার পথে এ দেশের মানুষের স্বাধীনতা লাভের যে চেতনার উন্মেষ দেখে গিয়েছিলাম সেটাই আমাকে আমার ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে অনিবার্য সুযোগ দিয়েছিল। জীবন নগরের কাছে সীমান্তবর্তী টুঙ্গি নামক স্থানে একটি সেতুর নীচে ক্লান্তদেহ এলিয়ে আমি সেদিন সাড়ে সাতকোটি বাঙালির স্বার্থে যে সিদ্ধান্তটি নিয়েছিলাম তা হলো, একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালনার জন্যে কাজ শুরু করা।” (দৈনিক পূর্বদেশ, ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭২)।
মুক্তিকামী জনগণের স্বার্থে নেয়া সরকার গঠনের এই সিদ্ধান্তই মুক্তিযুদ্ধকে আন্তর্জাতিক বৈধতা দেয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সংঘটিত গণহত্যার পথ রুদ্ধ এবং লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম রক্ষা করে বিজয়ের পথ সুগম করে। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে পরিচালিত প্রথম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাতটি ঐতিহাসিক অবদানের মধ্যে আমরা দেখি সেই নৈতিক দৃঢ়তা যার ভিত্তিতে স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশ বিজয় লাভ করে।
১. ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিলের ঘোষণাপত্র:
বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে আইনানুগ সরকার প্রতিষ্ঠা এবং সার্বভৌম রাষ্ট্রের ঘোষণা—যা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অপঃপ্রচারণাকে ভেঙে দেয় এবং আন্তর্জাতিক সমর্থনের পথ খুলে দেয়।
২. সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা: ১৯৭১ সালের ৩ এপ্রিল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে প্রথম সাক্ষাতেই তাজউদ্দীন আহমদ পরিষ্কারভাবে জানান, ‘এটা আমাদের যুদ্ধ। আমরা চাই ভারত এতে জড়াবে না। আমরা চাই না ভারত তার সৈন্য দিয়ে, অস্ত্র দিয়ে আমাদের স্বাধীন করে দিক। এই স্বাধীনতার লড়াই আমাদের নিজের এবং আমরা এটা নিজেরাই করতে চাই’। (ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি, কাগজ প্রকাশনা)। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানমন্ত্রী রূপে তাঁর ১০ এপ্রিলের প্রথম বেতার ভাষণে উল্লেখ করেন, ‘বিদেশী বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের কাছে যে অস্ত্র সাহায্য আমরা চাইছি, তা আমরা চাইছি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে, একটি স্বাধীন দেশের মানুষ আর একটি স্বাধীন মানুষের কাছে… এই সাহায্য আমরা চাই শর্তহীনভাবে এবং আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি তাদের শুভেচ্ছা ও সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে, হানাদারদের রুখে দাড়াবার এবং আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে — স্বাধীনতার জন্যে আমরা যে মূল্য দিয়েছি তা কোন বিদেশী রাষ্ট্রের উপ-রাষ্ট্র হবার জন্যে নয়।’ (তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসের পাতা থেকে। সম্পাদনা সিমিন হোসেন রিমি। প্রতিভাস প্রকাশনা)। একজন নৈতিকতাবোধসম্পন্ন আত্মমর্যাদাশীল মানুষই পারে চরম দুঃসময়েও মাথা নত না করে এমন উক্তি করতে।
৩. বাংলাদেশ নীতি সেল গঠন। এর কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে বাংলাদেশের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা, ভারত–সোভিয়েত আস্থা অর্জন, এবং যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান অক্ষকে দুর্বল করা।
৪. জাতীয় উপদেষ্টা কমিটি গঠন। শত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তাজউদ্দীন আহমদের উদ্যেগে এবং মওলানা ভাসানীকে সভাপতি করে মুক্তিযুদ্ধের অপর মাইলফলক এই কমিটি স্বাধীনতার স্বপক্ষের বিরোধী দলগুলোকে সাথে নিয়ে জাতীয় ঐক্য গঠনের সূচনা করে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অধিকাংশ দলের নৈতিক সমর্থন রয়েছে এই বিষয়টি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন লাভকে জোরালো করে।
৫. ষড়যন্ত্র প্রতিহত
খন্দকার মোশতাকের পাকিস্তানের পক্ষে ষড়যন্ত্র প্রতিহত; বাংলাদেশ সরকারের অজান্তে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র-এর পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত এবং বঙ্গবন্ধুর ভাগীনা শেখ ফজলুল হক মনি পরিচালিত মুজিববাহীনির মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড, সরকারবিরোধী অপতৎপরতা ও তাজউদ্দীন আহমদকে হত্যার উদ্যোগকে নস্যাৎ করে মুক্তিযুদ্ধের ঐক্য রক্ষা করে। (মঈদুল হাসান। মূলধারা ৭১। দ্যা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড)।
৬. যৌথ কমান্ড চুক্তি
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তিনটি শর্ত—
- ভারত প্রথমে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেবে
- স্বীকৃতি দেবার পরেই মিত্র বাহিনী বাংলাদেশে প্রবেশ করবে মুক্তি বাহিনীর সহযোগী হিসেবে এবং যৌথ কমান্ডে
- বাংলাদেশ সরকার যেদিন ভারতীয় সেনা বাহিনীকে প্রত্যাহার করতে বলবে, সেদিন তারা সৈন্য উঠিয়ে নেবে।
ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম এই চুক্তিকে ইতিহাসের “মহৎ চুক্তি” হিসাবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন… ‘এরচেয়ে ভাল এবং মহৎ এবং এত সুন্দর চুক্তি আমি তো পৃথিবীর ইতিহাসে খুব কমই দেখি। যখন অ্যালাইড ফোর্স ফ্রান্সে ঢুকেছিল তখন তো এই রকম চুক্তি করে তারা ঢোকেনি। এমনকি সাম্প্রতিক অতীতে বন্যা, জলোচ্ছ্বাসের সময় যে আমেরিকান টাস্কফোর্স বাংলাদেশে ঢুকল, তারা তো কোন চুক্তি ছাড়াই ঢুকেছিল। এখানে আমাদের বুঝতে হবে তাজউদ্দীন সাহেব কত দূরদর্শী, কত সজাগ, কত সতর্ক ছিলেন। এই চুক্তির বলেই স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধীকে ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নেবার অনুরোধ জানান।’ (ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামের সাক্ষাৎকার। তাজউদ্দীন আহমদ আলোকের অনন্ত ধারা। সম্পাদনা সিমিন হোসেন রিমি। প্রথম খণ্ড। প্রতিভাস প্রকাশনা, ২০০৬)।
ইন্দিরা গান্ধীর পররাষ্ট্র সচিব জে এন দীক্ষিত যিনি বাংলাদেশ-ভারতের ঐ আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন, উল্লেখ করেছিলেন যে “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মর্যাদার ব্যাপারে তারা [প্রথম বাংলাদেশ সরকার] ছিলেন খুবই সজাগ। প্রাথমিক আলোচনায় আমাদের সেনা সদস্যরা একক [ভারতীয়] নেতৃত্বের অধীনে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ বললেন, ‘না, সেনা অভিযান হবে যৌথ কমান্ডে’।” (জে এন দীক্ষিতঃ লিবারেশন অ্যান্ড বিয়ন্ডঃ ইন্দো-বাংলাদেশ রিলেশন্স, কনারক পাবলিশার্স এবং জে এন দীক্ষিতের সাক্ষাৎকারঃ ইতিহাসের সত্য সন্ধানে, প্রথমা পাবলিকেশন্স)।
৭. বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি
আন্তর্জাতিক ও কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রেখে জাতির জনককে পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত করা এবং স্বাধীন স্বদেশে ফিরিয়ে আনার বড় কৃতিত্ব বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর।
তাজউদ্দীন আহমদের নৈতিক নেতৃত্বের ব্যক্তিগত মূল্য
মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর একমাত্র শিশুপুত্র যখন মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে, তিনিই এই নৈতিক অবস্থান নিয়েছিলেন যে – যা হবে লাখো বাংলাদেশের বিপন্ন শিশুর, তাই হবে তাঁর সন্তানের। গোলোক মজুমদার এ প্রসঙ্গে বললেন, “একবার তাকে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তার স্ত্রী-সন্তানদের কোন হদিস যদি তিনি দিতে পারেন, তা হলে তাদের আনবার চেষ্টা করা যেতে পারে।“ সঙ্গে সঙ্গে তিনি উত্তর দেন— ‘বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ পরিবারের যে ভাগ্য, তার পরিবার সেই ভাগ্যেরই অংশীদার হবে, তাদের জন্যে কোন বিশেষ ব্যবস্থা হবে না।’
তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে বাংলাদেশ প্রকৃত স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি গৃহস্থ জীবন পরিহার করবেন। শেষপর্যন্ত তার প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন… তাঁর পরিবার একসময় কলকাতায় পৌঁছেছে। তাঁর একমাত্র শিশুপুত্র অত্যন্ত অসুস্থ, বাঁচার আশা খুব কম। ডাক্তার পরামর্শ দিলেন বাবাকে আনতে। প্রতিজ্ঞায় অটল তাজউদ্দীন সাহেব যেতে অস্বীকার করলেন। শেষপর্যন্ত আমাকেই ডেকে পাঠানো হলো। অনেক বুঝিয়ে বলার পর তিনি যেতে রাজী হলেন। পুত্রের কাছে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে নীরব প্রার্থনার পর নিঃশব্দে ফিরে এলেন। বিধাতার অসীম করুণা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভার ন্যাস্ত হয়েছিল এমন একজন নিঃসঙ্কোচ ও নিঃস্বার্থ বীরের হাতে। (১৯৭১ সালের ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ইন্সপেক্টর জেনারেল, ইস্টার্ন কমান্ড ও ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল গোলোক মজুমদারের সাক্ষাৎকার, আলোকের অনন্তধারা, প্রথম খণ্ড)।
তাজউদ্দীন আহমদ স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন যে— দেশ স্বাধীন না হওয়া পর্যন্ত তিনি পারিবারিক জীবন যাপন করবেন না। মুক্তিযোদ্ধারা তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছিলেন, আর তাদের নেতা হিসেবেও তাকেও একই দৃষ্টান্ত রাখতে হবে। কলকাতার ৮ থিয়েটার রোডের ভবন, যা ছিল প্রথম বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী কার্যালয়, তার অফিস সংলগ্ন ছোট্ট ঘর, অল্প খাবার, স্বল্প ঘুম, সীমাহীন কাজ—এই ছিল তাঁর বাস্তবতা।
বিজয়ের পরে ২২ ডিসেম্বর তিনি মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। তাঁর ধানমণ্ডির বাসগৃহ পাকিস্তান বাহিনীর হামলায় বিধ্বস্ত। তখনো আনাচে-কানাচে যুদ্ধ চলছিল। নিরাপত্তার কারণে তাঁকে সরকারি ভবনে থাকতে হবে। তিনি বললেন, ‘গণহত্যাকারী পাকিস্তানীদের বিছানায় ঘুমাবেন না।’
গভীর রাতে পিয়ন মকফুর রহমানকে পাঠালেন পুরাতন ঢাকার নবাবপুরের কাছাকাছি এক দোকানে। বাকী সব দোকান বন্ধ। এই দোকান সারাদিন-সারারাতই খোলা থাকে। মৃত মানুষের শেষকৃতর সরঞ্জামাদি বিক্রয় হয় এখানে। বিজয়ী বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী এই দোকান থেকে কেনা লাশ ধোয়ানোর চৌকির উপর কাফনের সাদা কাপড় বিছিয়ে ঘুমালেন। (মকফুর রহমানের সাক্ষাৎকার, তাজউদ্দীন আহমদঃ আলোকের অনন্তধারা, দ্বিতীয় খণ্ড, দ্যু প্রকাশন, ২০২৬)।
তাজউদ্দীন আহমদের জন্মভূমি কাপাসিয়া থানা অন্তর্গত দরদরিয়া গ্রামের বাড়ীটি পাকিস্তান হানাদার বাহিনী পুড়িয়ে ভষ্ম করে দেয়। তিনি কেন নতুন করে বাড়ী তুলছেন না এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন যে দেশের আতিথেয়তার নিয়ম হোল অতিথিকে আপ্যায়নের পর যা খাবার অবশিষ্ট তা থেকে খাওয়া। যুদ্ধ বিধস্ত দেশের অর্থ মন্ত্রী তিনি। গৃহহীন সবার বাড়ি না হওয়া পর্যন্ত তিনি তো নিজের বাড়ি তুলতে পারেন না। যে কথা সেই কাজ। তিনি কোনদিনও আর বাড়ী নির্মাণ করেন নি। (শারমিন আহমদ। তাজুদ্দিন আহমদ নেতা ও পিতা। ঐতিহ্য ২০১৪)।
১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন। তাঁর কাছে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ দেশের অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন।
স্বাধীনতার পর তাঁর রাষ্ট্রগঠন দর্শন
ক. কৃষি ও শিক্ষায় সর্বোচ্চ বাজেট
তিনি জানতেন— খাদ্য নিরাপত্তা ও শিক্ষা —এই দুই ভিত্তি ছাড়া কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না।
তাই স্বাধীন দেশের ইতিহাসের উষা লগ্নে তিনিই যিনি সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ করেন কৃষি ও শিক্ষায়।
খ. দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় নৈতিক অর্থনীতি
অর্থমন্ত্রী হিসেবে তিনি দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় নৈতিক ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া চালু করেন— যেখানে দুর্নীতি, মজুতদারি ও রাজনৈতিক সুবিধাভোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। যদিও তাঁর এই অবস্থানের কারণে নিজ দলের উচ্চপর্যায় থেকেই তিনি প্রচণ্ড বাধার সম্মুখীন হন। অর্থনীতিবিদ প্রফেসর নূরুল ইসলাম, যিনি তাজউদ্দীন আহমদের সাথে পরিকল্পনা কমিশনে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছিলেন, তাঁর অভিজ্ঞতায় তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনৈতিক উন্নয়নে এবং ভিন্ন রাষ্ট্রের সাথে অর্থনৈতিক লেনদেনে ন্যায্যতা ও দেশের স্বার্থকে সবার উপরে রেখেছিলেন। (প্রফেসর নূরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার, আলোকের অনন্তধারা, প্রথম খণ্ড)।
গ. ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সূচনা
তিনি বাংলাদেশকে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সদস্যভুক্ত করেন, যেখানে ঝুঁকি ভাগাভাগি হবে, সুদের নামে শোষণ নয়। এটি ছিল ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতির প্রতি তাঁর অঙ্গীকার। তিনি বলেন, “শুধু মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যের দ্বারাই ইসলামী ব্যাংক পরিচালিত হবে না… অন্যান্য উন্নয়ন ব্যাংকের সাথে ইসলামিক ব্যাংকের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। এই বৈশিষ্ট্যগুলিতে ইসলামের মহান নীতিই প্রতিফলিত হয়েছে।” (দৈনিক বাংলা, ২২ আগস্ট, ১৯৭৪)।
ঘ. সমাজতান্ত্রিক নীতি হবে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুসারে
অর্থনৈতিক সুষম বণ্টন এবং কৃষক, শ্রমিক, মেহনতী ও বঞ্চিত মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য সমাজতান্ত্রিক নীতির প্রয়োগ হবে বাংলাদেশের স্বার্থ ও বাস্তবতা মাথায় রেখে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করব যা সোভিয়েত রাশিয়া বা চীনের ধরনের হবে না, বরং তা হবে আমাদের নিজেদের মত। আমরা গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মধ্যে সুষম সমন্বয় ঘটাব যা বিশ্বে একটি অসাধারণ ব্যাপার হবে।” (দৈনিক পূর্বদেশ, ৮ এপ্রিল, ১৯৭৩)। তাজউদ্দীন আহমদ প্রয়োগবাদী ছিলেন। একই সাথে যে দর্শন ভিন্ন দেশে কার্যকরী হয়েছে, সে যত উন্নত দেশই হোক না কেন, তার হুবহু প্রয়োগ নিজ দেশের স্বার্থের অনুকূল নাও হতে পারে—এই বিষয়টি সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। এখানেই তিনি বাস্তবতার সাথে নৈতিকতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছিলেন।
গণতন্ত্রের ভিত্তি সুশাসন
একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান: গণতন্ত্র ধ্বংস হলে দেশ ধ্বংস হবে— এই বিশ্বাসে তিনি আপসহীন ছিলেন। স্বাধীনতার পর তিনি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর পাশে ঘিরে রয়েছে খন্দকার মোশ্তাক ও তাহেরউদ্দীন ঠাকুরের মত স্বাধীনতাবিরোধী ও পাকিস্তান-সিআইএ’র আস্থাভাজন ষড়যন্ত্রকারীরা। ওনারা দুজনেই মন্ত্রীর পদে অধিষ্ঠিত।
আরেক পাশে রয়েছে শেখ ফজলুল হক মনি, যিনি পুরো যুদ্ধের সময়ই মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণে এবং বাংলাদেশ সরকারের বিরোধিতায় তার মুজিব বাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে এসেছিলেন। পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর বঙ্গবন্ধুর কাছে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র সমর্পণ করলেও মুজিব বাহিনীর কাছে রয়ে যায় অধিকাংশ অস্ত্র। মুজিব বাহিনী স্বাধীন বাংলাদেশে পুনর্গঠিত হয়ে রক্ষীবাহিনী রূপে আত্মপ্রকাশ করে, যার কার্যক্রম ছিল জনস্বার্থবিরোধী—স্বৈরাচারী। এ ধরনের মানুষ, যাদের ভেতর গণতান্ত্রিক নীতিবোধের আকাল, তাদেরকে দিয়ে তো আর যাই হোক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের পথে এগোচ্ছিলেন, তাজউদ্দীন আহমদ সেই সিদ্ধান্তের প্রচণ্ড বিরোধিতা করেন সাহসিকতার সঙ্গে এবং যুক্তি শাণিত রেখে। তিনি সতর্ক করেছিলেন— এই ব্যবস্থা দেশের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনবে; এটি বঙ্গবন্ধুকে বিপদের মুখে ঠেলে দেবে; তাঁকে হত্যা করা হবে এবং এর ফলে তাজউদ্দীন আহমদের মতো মানুষও মারা যাবে; সবশেষে দেশ চলে যাবে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির হাতে। তিনি বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন— “আপনার হাতেই তো সমস্ত ক্ষমতা আছে, কাজেই একদলীয় ব্যবস্থার পক্ষে আপনি যা বলছেন আমার কাছে এর কোন যৌক্তিকতা নেই… আমি আর আপনি বাংলাদেশ স্বাধীন হবার আগে ২৪-২৫টা বছর একসাথে বাংলাদেশের এমন কোন মাঠ-ময়দান নেই যেখানে যাইনি। আমরা বক্তৃতায় সবসময় বলেছি সুখী-সমৃদ্ধশালী দেশের কথা, যার ভিত্তি হবে গণতন্ত্র। যে গণতন্ত্রের গুণগান করেছি আমরা সবসময়, আজকে আপনি একটি কলমের খোঁচায় সেই গণতন্ত্রকে শেষ করে দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা কায়েম করতে যাচ্ছেন। আপনার এই সিদ্ধান্তে আমি অত্যন্ত জোরের সাথে দ্বিমত পোষণ করছি… ভবিষ্যতে আপনাকে কেউ সরাতে চাইলে সেই সরাবার জন্যে গণতান্ত্রিক কোন পথ আপনি খোলা রাখছেন না। তখন একটাই পথ থাকবে আপনাকে সরাবার—আর সেটা হচ্ছে বন্দুক… কিন্তু মুজিব ভাই, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা কি ঘটবে জানেন, আপনাকে এত নিষেধের পরেও আপনার সাথে ঐ বন্দুকের গুলীতে আমরাও মারা যাব… দেশটার ভয়ানক ক্ষতি হয়ে যাবে।” (তাজউদ্দীন আহমদের ব্যক্তিগত সচিব ও সরকারি কর্মকর্তা আবু সাঈদ চৌধুরীর সাক্ষাৎকার, আলোকের অনন্তধারা, প্রথম খণ্ড)। সত্যকে ধারণ করার পরিণাম হলো— তাজউদ্দীন আহমদ ২৬ অক্টোবর, ১৯৭৪ এ বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দেন।
কিন্তু তাঁর ঐ সতর্ক বাণী যা ছিল ভবিষ্যদ্বাণীর মত তা নিষ্ঠুর বাস্তবে পরিণতি লাভ করে। কিন্তু সত্য বলার পরেও তিনি কখনোই নীতিহীন আপস করেননি। তিনি কখনোই সেই ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে যোগ দেননি যারা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ জানতেন— সত্যের পথে দাঁড়ালে মৃত্যু আসতে পারে, কিন্তু নীতিহীন জীবন ছিল তাঁর কাছে মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। তিনি বেছে নিয়েছিলেন নৈতিকতার পথ—এবং সেই পথই তাঁকে নিয়ে গিয়েছিল মৃত্যুর মুখোমুখি, কিন্তু তাঁর আদর্শকে দান করেছিল অমরত্ব। মৃত্যু-সন্নিকটে থেকেও তাজউদ্দীন আশার বীজ বুনতে পেরেছিলেন জীবনের শ্রেষ্ঠতম আদর্শ সত্যের পতাকা উন্নত রেখে। সলঝেনিৎসিন বলেছিলেন স্বৈরাচার, রাষ্ট্রের চাপিয়ে দেয়া মতাদর্শ, প্রোপাগান্ডা, অন্যায় ও নিষ্পেষণের বিরুদ্ধে সত্যনিষ্ঠতার ওজন সারা বিশ্বের চাইতেও ভারী। মানুষের অমরত্ব নিহিত থাকে সত্যের সাধনায়।
১ নভেম্বর ১৯৭৫— স্ত্রী জোহরা তাজউদ্দীনের সঙ্গে শেষ সাক্ষাতে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছিলেন, “ওরা আমাদের বাঁচতে দেবে না”। মৃত্যু আসন্ন জেনেও পরদিন তিনি সারাদিন ধরে কারাগার প্রাঙ্গণে ফুল লাগালেন। তিনটি রক্তজবার ফুলগাছ ও বাকী নানা রঙের মৌসুমী ফুল দিয়ে নিজ হাতে গড়া বাগানটিকে মনমত সাজালেন। অড্রে হেপবার্নের কথাটি যেন ছিল তাঁর জীবনের প্রতিচ্ছবি— “To plant a flower is to believe in tomorrow.” ৩ নভেম্বর ভোররাতে তাঁকে ও তাঁর তিন সহকর্মী সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম. মনসুর আলী ও এ. এইচ কামরুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাঁকে হত্যার আগের দিন তিনি তাঁর ডায়রির শেষ পাতা সমাপ্ত করেন। ওতে লেখা ছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ভবিষ্যতে চলার রোডম্যাপ। ডায়রিটি আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।
সচ্ছল মধ্যবিত্ত ভূস্বামী পরিবারের সন্তান ও স্কুল-কলেজে স্ট্যান্ড করা মেধাবী ছাত্র তাজউদ্দীন বেছে নিতে পারতেন নিরাপদ জীবন এবং উচ্চ আয়ের কোন পেশা কিন্তু শোষিত মানুষের মুক্তির জন্যে এবং কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি বেছে নিয়েছিলেন রাজনীতির অনিশ্চিত জীবন, কারাবাস ও অবশেষে মৃত্যু। তাজউদ্দীন আহমদের জীবনকর্ম বাংলাদেশের জন্য নৈতিক রোডম্যাপ প্রণয়নের পথকেই দীপ্ত করে।
তাজউদ্দীন আহমদ শিখিয়েছেন— রাষ্ট্রনায়কত্ব মানে ক্ষমতা নয়, নৈতিকতা। স্বাধীনতা মানে শুধু পতাকা নয়, দায়িত্ব। উন্নয়ন মানে শুধু অবকাঠামো নয়, মানুষের মর্যাদা। বাংলাদেশ যদি সত্যিই উন্নত হতে চায়, তবে তাঁর মডেলই পথ দেখায়—
- সত্যনিষ্ঠ নেতৃত্ব
- ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি
- খাদ্য ও শিক্ষার নিরাপত্তা
- দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ
সত্যের জন্য দাঁড়ালে মৃত্যু হয় ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আদর্শ হয় চিরন্তন। তাজউদ্দীন আহমদ সেই চিরন্তন আদর্শের প্রতীক।

শারমিন আহমদ | সিলভার স্প্রিং, ম্যারিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র
লেখক, শিক্ষাবিদ ও শান্তি শিক্ষার প্রসারে নিবেদিত; The One Light Institute-এর প্রতিষ্ঠাতা।
