জাপান: হৃদয়ের শিক্ষায় ভরা এক যাত্রা

শারমিন আহমদ
May 17, 2026
12 views
48 mins read

জাপান দেশটি নিয়ে আমার আগ্রহের সূচনা শৈশবকাল হতেই। বড় হয়ে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তে প্রথম জাপান ভ্রমণ, বিচিত্র মানুষ, ভাষা ও সংস্কৃতিকে জানার যে আকর্ষণ— তার অনেকখানিই আমার শৈশবের অভিজ্ঞতার আলোকে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, একজন শিশু শৈশবে— বিশেষত জন্মের প্রথম পাঁচ বছরে— যে অভিজ্ঞতা লাভ করে, সেটাই তার ভবিষ্যতের চিন্তা, ভাবনা, কার্যক্রম, মানসিক–দৈহিক স্বাস্থ্য ও বিকাশকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। বর্তমানের ভাললাগা বা আগ্রহের বীজও সেই শৈশবের অভিজ্ঞতায় প্রথিত। আজ আমরা যা খুঁজছি, তার সন্ধান হয়তো পাওয়া যাবে সেই দূর অতীতে— আধো জাগ্রত, স্বপ্নিল শৈশবের কোন এক স্বর্ণালী সন্ধ্যায়।

প্রফেসর জন ডিউই আমার প্রিয় দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী ও মনস্তত্ত্ববিদদের একজন। তিনি বলেছিলেন, আমরা অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা লাভ করি না; বরং শিক্ষা লাভ করি অভিজ্ঞতার প্রতিফলনের মাধ্যমে। অপ্রতিফলিত অভিজ্ঞতা মূল্যহীন— প্রাণহীন। যদি ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমরা নির্মোহভাবে চিন্তা করি, তাহলে নিজেকে জানা ও আত্মসমালোচনার মাধ্যমে পরিশুদ্ধির সংগ্রাম যেমন অগ্রসর হয়, তেমনি প্রতিফলিত অভিজ্ঞতার আলোকে সমুখের পথ চলাও গতি পায়। অভিজ্ঞতার প্রতিফলন থেকে শিক্ষা নেওয়া আজীবনের সংগ্রাম।

এই প্রতিফলনের পথ ধরেই মনে পড়ে— জাপান নামে যে একটি দেশ আছে, সে সম্বন্ধে আমার প্রথম জানা হয় আমার বাবার জাপানি ইয়াশিকা ক্যামেরার মাধ্যমে। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের মাইলফলক যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে সরকারি দল মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক ফকির আব্দুল মান্নানকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে যুক্তফ্রন্টের মনোনীত প্রার্থী, ২৮ বছরের তরুণ তাজউদ্দীন আহমদ সংসদের কনিষ্ঠতম সদস্যরূপে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য সফর করেন ১৯৫৮ সালে। সেই সফরের সময় তিনি এই জাপানি ইয়াশিকা ক্যামেরাটি কেনেন।

কিন্তু রাজনৈতিক ব্যস্ততার কারণে ক্যামেরাটি তিনি খুব ব্যবহার করেননি। নিজের, পরিবার–পরিজন বা বন্ধু–বান্ধব নিয়ে ছবি তোলার প্রতিও তার তেমন কোন আগ্রহ ছিল না। ১৯৫৯ সালে আব্বু ও আম্মা সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনের বিয়ের পরে ক্যামেরাটি প্রাণ পায় নবপরিণীতা আম্মার হাতে। আগেকার দিনের ক্যামেরার ব্যবহার বর্তমান যুগের ডিজিটাল বা মোবাইল ক্যামেরার মতো সহজ ছিল না। কিন্তু আম্মা অল্প সময়েই লেন্স ঘুরিয়ে ফোকাস স্পষ্ট করে ইয়াশিকা ক্যামেরা ব্যবহারে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

১৯৬০ সালে আমার জন্মের পরে এই ইয়াশিকা ক্যামেরায় আম্মা আমার অগুনিত ছবি ধারণ করেন। নবজাত শিশু কন্যার জন্য আব্বু একটি সাদা দোলনা তার সাইকেলে বেঁধে বাসায় নিয়ে এসেছিলেন। সেই দোলনায় দোল খেতে খেতে আমার নানা পোজের ছবি ক্যামেরায় সংরক্ষিত হতে থাকে, আর বছরও গড়াতে থাকে।

এরই মধ্যে ১৯৬৪ সালে আমাদের ধানমণ্ডির পাশের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হয়ে এল এক জাপানি দম্পতি। তাদের দুই কন্যা শিওমি ও নিশিও— আমার ও ছোট বোন রিমির সমবয়সী। দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গেল আমাদের দুই পরিবারের মধ্যে। আমার শিশু মনে তখনই এই ধারণা জন্ম নিল— এরা আমাদের ইয়াশিকা ক্যামেরার দেশের মানুষ। এনারা জাপানি।

শিওমি ও নিশিওর ঘরে রঙচঙে জাপানি রূপকথা ও কমিক বই। আমরা তো তখনো শিশু— অক্ষরজ্ঞান হয়নি, আর জাপানি ভাষাও বুঝি না। আমাদের মামাতো বোন রুমা, যে আমাদের চেয়ে কিছু বড় ছিল এবং তখন আমাদের সাথেই থাকত, সে ঐ বইগুলির ছবি আর জাপানি লেখা যেন বুঝতে পারছে এমন ভঙ্গিতে বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলত। আমরা বিমুগ্ধ হয়ে শুনতাম।

শিওমি ও নিশিওর মা আমাদের জন্য আঠালো গরম ভাত রোল করে, সামুদ্রিক শৈবাল আর মাছ দিয়ে সুশি বানিয়ে আপ্যায়ন করতেন। কাঠি দিয়ে খাবারের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা— অনভিজ্ঞ হাত থেকে কাঠি বারবার পড়ে যায়, আমরা হেসে কুটিকুটি।

আম্মা খুব ভালো রান্না করতেন। তিনি জাপানি প্রতিবেশীদের জন্য কম ঝালে মুরগির রোস্ট, মাছের কালিয়া, কাবাব, পোলাও ইত্যাদি বানিয়ে নতুন দেশে স্বাগত জানালেন। মজার কথা— খুব শিগগিরই ওরা আম্মার হাতের রান্না এবং আমাদের বাঙালি ডাল–ভাত–ভর্তা–ভাজিরও ভক্ত হয়ে পড়ল। পুরো পরিবার অল্প অল্প করে বাংলা বলা শুরু করল। আমরাও কিছু জাপানি শব্দ শিখে বড়দের তাক লাগালাম।

আমাদের নিত্যদিনের খেলার সাথীরা জাপানে ফিরে গেল— মনে হয় ১৯৬৫ সালের শেষে বা ৬৬ সালের শুরুতে, ছোট বোন মিমির জন্মের পরেই। বিদায়ের আগে নানা উপহারের মধ্যে তারা আমাদের দুই বোনের জন্য সেই জাপানি রূপকথার বইগুলো রেখে গেল। ওদের কুকুর, যার জাপানি নামকরণ তারা করেছিল ‘পিপি’, সেও আমাদের বাড়িতে আশ্রয় পেল।

আম্মা নিজ হাতে শিওমি ও নিশিওর জন্য দুটি ফ্রক বানালেন; রঙিন সুতায় সেই ফ্রকের উপর গোলাপ ফুল ও লতাপাতার এমব্রয়ডারি করে ওদের হাতে তুলে দিলেন। বন্ধুদের হারিয়ে আমার মন বিমর্ষ।

এদিকে ১৯৬৬ সালের মে মাসে— ছয় দফার অন্যতম রূপকার ও আওয়ামি লীগের সদ্য নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আব্বু, সভাপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দকে পাকিস্তান সামরিক সরকার কারাগারে প্রেরণ করল। গভীর রাতে আম্মা আমাকে ও রিমিকে জাগালেন আব্বুকে বিদায় দিতে। বাড়ি ঘেরা বন্দুকধারী পুলিশের মাঝ দিয়ে আব্বু হাসিমুখে পুলিশের জিপে উঠলেন। আমরা আব্বুকে হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছি। আর পিপি একটানা ডেকে চলল— অনেকটা করুন আর্তনাদের মতো— যেন বুঝতে পারছিল আব্বু অনেক বছরের জন্য দূরে চলে যাচ্ছেন।

জেলে যাবার আগে যখুনি সময় পেতেন, আব্বু নিজ হাতে বাগান করতেন, আমাদের গল্প শোনাতেন আর কন্যাদের নিয়ে পিপির সাথে খেলাধুলা করতেন। আমরা বল ছুড়ে দিতাম, পিপি ক্ষিপ্র গতিতে বলের পেছনে ছুটত। সেই উচ্ছল, আনন্দভরা জীবনে ছেদ পড়ল। আব্বুর এবারের চলে যাওয়াও আমার জন্য ছিল ভিন্ন। আমার জন্মের আগে এবং আরো শিশু কালে আব্বু অনেকবার জেলে গিয়েছেন। কিন্তু এবার আমি অনেকটা বুঝতে পারছি। আর এমন বুঝতে পারার বেদনা সাগরসমান।

বন্ধুরা চলে গেল অজানা দেশে— সুদূর জাপানে। আর আমাদের খেলার সাথী আব্বুও কিছুদিন পরে চলে গেলেন কারাগারে। হঠাৎ বড় পরিবর্তন ও প্রিয়জনকে হারানোর শূন্যতা বোধের সেই প্রথম অভিজ্ঞতা।

আম্মা বোঝালেন— যারা দেশকে ভালোবাসে ও তার মঙ্গলের জন্য সংগ্রাম করে, তাদেরকে পাকিস্তান সরকার জেলে ভরে রাখে। আম্মার কথাগুলো ভালো করে বোঝার বয়স হয়নি। কিন্তু অবচেতন শিশু মনে প্রকৃত দেশপ্রেমের সংজ্ঞা প্রথিত হয়ে গেল আজীবনের জন্য। দেশকে ভালোবাসা মানে দেশের মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা, প্রকৃতি ও সকল প্রাণীর সাথে হৃদয়ের সংযোগ ঘটানো।

সময়ের স্রোত বয়ে যায়, আর সেই স্রোতের অনেক পরে আসে আমার প্রথম জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতা— ১৯৯৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। সেসময় চীনের রাজধানী বেইজিং-এ অনুষ্ঠিত চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলনে যোগদান শেষে জাপান এয়ারে চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরছিলাম। মাঝে টোকিওতে এক রাতের বিরতি।

টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছে আমি তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিলাম— জাপান দেখব। আমার শৈশবের বন্ধু শিওমি ও নিশিওর দেশ। মমতারো, উরাশিমা তারো, ইসসুন বসসি ও রাজকন্যা সাকুরাহিমের রূপকথার জাপান। কী দেখব, কোথায় যাব, কোথায় থাকব— কিছুই জানি না।

ঐ যে প্রাচীন যুগের দার্শনিকরা বলতেন, “A true traveler never arrives”— সত্যিকারের পরিব্রাজক কখনো নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছান না; পথ চলাটাই বড় কথা। অনেকটা তেমনি আমার মনের অবস্থা।

ইনফরমেশন ডেস্কে গিয়ে বললাম— আমি যদি জাপানে কয়েকদিন থাকতে চাই, তাহলে টিকিট বদলানো কি সম্ভব হবে? ইনফরমেশন ডেস্কের মহিলা জানালেন— পাঁচদিন পরে পরবর্তী ফ্লাইট ওয়াশিংটন ডিসিতে যাবে এবং টিকিট বদলানোর জন্য অতিরিক্ত কোন খরচ নেই। আমার সীমিত বাজেট জেনে তিনি বললেন, টোকিও শহর থেকে এক ঘণ্টা দূরে আসাকুসা শহরে আমার জন্য একটি সাধারণ ছোট হোটেলের ব্যবস্থা তিনি করতে পারেন।

এয়ারপোর্টের ভেতরেই ট্রেন স্টেশন। ট্রেনে করে যেতে ঘণ্টাখানিক সময় লাগবে। তখন রাত প্রায় দশটা। ওয়াশিংটনের মেট্রো কর্মদিবসে এত রাতে শুনশান হয়ে পড়ে। কিন্তু জাপানের ট্রেন ও মেট্রো এত রাতেও অফিস ও কর্মস্থল থেকে ফেরত গৃহগামী যাত্রী দিয়ে ভরপুর।

আমার বগিতে আমিই একমাত্র অজাপানি। লক্ষ্য করলাম— সকলের হাতের ব্যাগ তাদের কোলে রাখা। যুক্তরাষ্ট্রের বাস–ট্রেন বা মেট্রোর বহু যাত্রীকে দেখেছি হাতের ব্যাগ নিচের ফ্লোরে রেখে দেয়। কিন্তু জাপানিরা অনেক বেশি পরিচ্ছন্নতা সচেতন।

আমার পাশের দুই তরুণ–তরুণী কিছু ইংরেজি বলতে পারেন। তারা ভাঙা ইংরেজিতে আগ্রহভরে আলাপ জমালেন। “কোথায় দেশ?” “বাংলাদেশ। বসবাস করছি যুক্তরাষ্ট্রে।” “কোথায় যাচ্ছ?” “আসাকুসাতে।” “কোথায় ঘোরার পরিকল্পনা করেছ?” “এখনো জানি না।”

আমি ওদের সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করলাম। ওরা দুজনেই শিক্ষার্থী— চাকরি করে এবং একই সাথে কলেজে পড়ে। রাতের ক্লাস সেরে বাড়িতে যাচ্ছে।

ওদের সাথে কথা বলতে বলতে আমার বদলি স্টেশন এসে পড়ল, আমি দ্রুত নেমে পড়লাম। এই স্টেশন থেকেই আমাকে গিনজা লাইনের আরেক ট্রেন ধরে আসাকুসায় পৌঁছতে হবে।

আমার পেছনে পেছনে দুই শিক্ষার্থীও নেমে পড়ল। ভাবলাম— ওরাও ট্রেন বদল করবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে ওরা বলল— আমি ভুল স্টেশনে নেমেছি, এবং সেটা বলার জন্যই ওরাও নেমেছে, যদিও এটা তাদের স্টেশন নয়।

আমি ওদের দায়িত্ববোধ দেখে মুগ্ধ। নিমিষেই আগন্তুক থেকে তারা হয়ে গেল বন্ধু। এরপর আমরা তিনজন একসাথে পূর্বের লাইনের ট্রেন ধরলাম। এবারে সঠিক স্টেশনে নামলাম। শিক্ষার্থী বন্ধুরা “সায়োনারা” বলে বিদায় জানালো। আমি উত্তরে বললাম, “আরিগাতো গোযাইমাস্তা”— অনেক ধন্যবাদ।

গিনজা লাইনের দ্বিতীয় ট্রেনে পরিচয় হলো এক বর্ষীয়ান ভদ্রলোকের সাথে। তিনি অন্যান্যদের মতোই এত রাতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছেন। ওনার এক মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। সেই সুবাদে তিনি কয়েকবার যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছেন। ইংরেজিও ভালো বলেন।

আমরা একই স্টেশনে নামব। স্টেশন থেকে হাঁটাপথে হোটেল কত দূর— জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, খুব বেশি নয়, তবে ডান–বাম করে অলিগলি পার হতে হবে। তখন তো গুগল প্রযুক্তির জমানা শুরু হয়নি যে নিমিষেই ম্যাপ বলে দেবে কিভাবে গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হবে। ইন্টারনেটের ব্যবহার তখনো সীমিত। ভরসা— এয়ারপোর্টের ইনফরমেশন ডেস্ক থেকে পাওয়া কাগজের ম্যাপ এবং আশেপাশের মানুষজনকে জিজ্ঞেস করা।

ভদ্রলোক বিনয়ের সাথে প্রস্তাব দিলেন— তিনি আমাকে হোটেল পর্যন্ত পৌঁছে দেবেন। আমি মানা করা সত্ত্বেও তিনি অনড় রইলেন। বললেন— “তুমি নতুন এসেছ আমার দেশে। তুমি যাতে ঠিক জায়গায় পৌঁছ, সেটা নিশ্চিত করা আমার কর্তব্য।”

হোটেলের সামনে আমাকে পৌঁছে দিয়ে তিনি উল্টো পথে হেঁটে চলে গেলেন। আবারো মুগ্ধ হলাম জাপানিদের এমন অযাচিত কর্তব্যপরায়ণতা দেখে। একটি দেশের নাগরিকদের চিন্তা ও আচরণ দেখে বোঝা যায়— সেই দেশ সত্যিই সভ্য কিনা।

আমার সাধারণ এই হোটেলের দরজার ঠিক সামনে এক বিশাল ফুলদানীতে রাখা তাজা ফুলের অপূর্ব সমারোহ দেখে মনে হলো— আমি অসাধারণ স্থানে পৌঁছেছি।

হোটেলের রুমটি খুবই ছোট, কিন্তু যা যা প্রয়োজন সবই রয়েছে। উল্টো দিকের রুমটি জাপানি স্টাইলের— ছিমছাম। আসবাবপত্র নেই বললেই চলে। মাটিতে বিছানো তাতামি ম্যাট বা খড়ের মাদুরে শোবার ব্যবস্থা। রুমের জানালা ঢাকা মোটা কাগজের পর্দা দিয়ে।

ভাবলাম— আব্বু বেঁচে থাকলে জাপানের ঐতিহ্যবাহী এই রুমই বেছে নিতেন। আব্বুর বিয়ের কয়েকদিন পর পুরাতন ঢাকার ১৭ কারকুন বাড়ি লেনের ভাড়া বাড়ির উপরতলার বাসিন্দারা নিচতলায় এসে আম্মার কাছ থেকে খাট আর তোষক ফেরত নিয়ে যায়। তারা বলেন— বিয়ের জন্য আব্বু তাদের কাছ থেকে খাট–তোষক ধার করেছিলেন। আম্মা অবাক হয়ে বলেন, “তাহলে উনি ঘুমাতেন কোথায়?” উত্তর এল—“খেজুর পাতার মাদুরে।”

পরদিন ম্যাপ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম জাপান শহর দেখতে। মেট্রো রেলে আমার পাশে বসা এক বর্ষীয়ান মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম— রাজবাড়ির বাগানের (Imperial Palace East National Garden) মেট্রো স্টপ কোনটি? যদিও ম্যাপে তা লেখা রয়েছে, তারপরেও নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞেস করা।

উনি নাম বললেন। এরপর আমরা আলাপ শুরু করলাম। ওনার নাম তামায়ে কাতো। তামায়ে নামের অর্থ— ফুল, আর কাতো— পদবী, আবার একই সাথে ফুল। মহিলার কথাবার্তাতেও যেন ফুলের সুরভি মাখা।

তামায়ে ও তার স্বামী অবসরপ্রাপ্ত। তারা বিভিন্ন দেশের ইতিহাস, সমাজ ও জীবনব্যবস্থা জানতে বহুবার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। জিজ্ঞেস করলেন— আমি কোথায় উঠেছি। হোটেল ও জায়গার নাম বলতেই উনি বললেন— ওনার বাড়ি হোটেলের কাছেই। আমাকে ওনার বাড়িতে জাপানি কায়দায় চা পানের (Japanese Tea Ceremony) ঘরোয়া অনুষ্ঠানে পরদিন সন্ধ্যায় নিমন্ত্রণ করলেন।

আমি বললাম— সন্ধ্যায় একাকি চলাফেরা কি নিরাপদ? উনি হেসে বললেন, “জাপান খুবই নিরাপদ এবং তোমাদের ওয়াশিংটন ডিসি, শিকাগো বা নিউইয়র্কের চাইতে বহু গুণে নিরাপদ। তবে আমাদের নিরাপত্তা মূলত বিঘ্নিত হয় টাইফুন ও ভূমিকম্পে।” তারপরেও আমাকে একাকি ওনার বাসায় যেতে হবে না—উনি আমাকে নিয়ে যাবেন, এই আশ্বাস দিলেন।

পরদিন তামায়ে ঘড়ির কাটায় ঠিক ছটা বাজতেই হোটেলে চলে এলেন। সাথে দুটি ছাতা। হেমন্তের মেঘলা আকাশ ও টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে মাথার উপর ছাতা ধরে আমরা হেঁটে চললাম। হোটেল থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের হাঁটা পথ।

ওনার ফ্ল্যাটের সামনেই জুতার র‍্যাক। সেখানে জুতা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। ওনার স্বামী সাদরে আমাকে অভ্যর্থনা জানালেন। টি সেরিমনির জন্য সাদা মোজা পরতে দিলেন। জাপান শহরের মতোই পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন ওনাদের ফ্ল্যাট বাড়িটি।

তামায়ে বললেন যে জাপানি টি সেরিমনি সম্পন্ন করতে চার–পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়, কিন্তু আমার যাতে হোটেলে ফিরতে দেরি না হয় সে জন্যে সংক্ষেপে করবেন। তাতামি মাদুরের উপর কাঠের পিঁড়িতে রাখা একই ডিজাইনের কাঁচের বাটিতে জাপানি মিষ্টান্ন ও মাচা চা সাজানো। তামায়ে মাদুরের উপর হাঁটু গেড়ে সেই গুঁড়া করা মাচা চা গরম পানিতে ফেটে চা প্রস্তুত করলেন। বললেন— জাপানি টি সেরিমনি ধ্যান, শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা, সরলতা ও বিনয়ের অংশ। অতিথি দুহাতে চায়ের ছোট বাটি ধরে ধীর–স্থিরভাবে তিন চুমুকে চা পান করবেন। তারপর যিনি নিমন্ত্রণ করেছেন তাকে ধন্যবাদ জানাবেন।

আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তামায়ের কথা শুনতে থাকি আর একাত্ম হয়ে যাই এই জাপানি ঐতিহ্যের সাথে। সেদিনের টি সেরিমনির পরে অসংখ্য ধন্যবাদ জানিয়ে ফিরে আসি হোটেলে।

এরপরের দিনগুলিতে নানা জায়গায় বেড়াতে যাই। ট্রেনে করে কামাকুরায় দাইবুতসু বা গৌতম বুদ্ধের বিশালকায় ভাস্কর্য, নতুন ফসল ঘরে তোলা উপলক্ষে প্রাচীন শিন্তো উৎসবের মহড়া, জাপান জাতীয় জাদুঘর— সবই দেখে আবারো আমন্ত্রিত হই তামায়ের বাড়িতে। এবার তিনি নানা পদের সুশি ও সাশিমি বানিয়ে নৈশভোজে আমাকে আপ্যায়ন করলেন।

ভাত দিয়ে তৈরি সুশি খাবার প্রথম অভিজ্ঞতা হয়েছিল শিওমি ও নিশিওর বাড়িতে। এবার সাশিমি খাবার অভিজ্ঞতা হলো। সাশিমি হলো কাঁটা–বিহীন, খুব পাতলা করে কাটা কাঁচা মাছের টুকরা— কিন্তু তাতে কাঁচা মাছের কোন গন্ধ নেই। তামায়ে স্যামন, গলদা চিংড়ি ও টুনা মাছের সাশিমি বানিয়েছিলেন। সাথে মূলা, ওয়াসাবি ও সয়াসস।

নৈশভোজের পরে তিনি আমাকে যা উপহার দিলেন তাতে আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম। স্বর্ণের আস্তরণে মোড়া তাঁর নিজস্ব চায়ের বাটি, কাঁটা–চামচ ও সুশি পরিবেশনের পাত্র— সুন্দর কাগজে মোড়া বক্সে ভরে তিনি আমার হাতে তুলে দিলেন।

তামায়ে বহু বছর হলো ইহজগত ছেড়ে চলে গিয়েছেন। কিন্তু সম্পূর্ণ এক অজানা, অচেনা ভিনদেশী তরুণীর প্রতি তাঁর নিঃস্বার্থ ভালোবাসা দিয়ে আমার মনের মনিকোঠায় স্থান করে নিলেন চিরকালের জন্য।

সেই বিমুগ্ধ সন্ধ্যার এত আপ্যায়নের পরেও তামায়ের আঁশ মিটল না। ওয়াশিংটনে ফিরে যাবার আগের রাতে আমাকে নিয়ে গেলেন আসাকুসা শহরের মেয়রদের ক্লাবে। তামায়ের বাবা ছিলেন এই শহরের মেয়র এবং বর্তমান মেয়র তামায়ের পারিবারিক বন্ধু। মেয়র আমার সম্মানে কারাওকে গান ও চা–নাশতার আয়োজন করেছিলেন। ওখানে সকলের সাথে কারাওকে গান গাইবার মজার অভিজ্ঞতা হলো।

ফিরে যাবার আগে মেয়র আমার হাতে তুলে দিলেন জাপানের ঐতিহ্যবাহী কিমোনো পোশাক।

ওয়াশিংটনের পথে পরদিন প্লেন যখন উড়াল দিল, আমি আকাশপথে নিমগ্ন হয়ে গেলাম আমার জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতার কথা ভেবে।

জাপান ভ্রমণের কোন অভিজ্ঞতায় আমি সবচাইতে সমৃদ্ধ হয়েছি? ইকোহামা ল্যান্ডমার্ক টাওয়ারের দ্রুততম এলিভেটরে চড়ে উনসত্তুরতম তলায় পৌঁছে যাওয়া? বিশাল রাজপ্রাসাদ, অনিন্দ্য সুন্দর বাগান বা মিউজিয়াম দেখা? নাকি অচেনা দেশের অজানা মানুষের অযাচিত মমত্ব ও নিখাদ ভালোবাসা কেমন হতে পারে তাকে অনুধাবন করা?

টলস্টয় তাঁর কালজয়ী গল্প মানুষ বাঁচে কিসে‑তে লিখেছিলেন—মানুষ আসলে বেঁচে থাকে ভালোবাসায়।

সময়ের স্রোত আবারো আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় বহু বছর পরে, ২০১০ সালে। হিরোশিমা পিস বিল্ডিং সেন্টারের ডিরেক্টর প্রফেসর ইউজির আমন্ত্রণে শান্তি শিক্ষা ট্রেনিং কনফারেন্সে আমার স্বামী ড. আমর আবদাল্লার সাথে জাপানের হিরোশিমা শহরে যাই। ড. ইউজি ও আমর জর্জ মেসন ইউনিভার্সিটি থেকে একই সাথে পিএইচডি করেছেন— সহপাঠী হিসেবে তাদের পরিচয় বহু আগে থেকেই।

ইউজির সাথে আলাপকালে আমার প্রথম জাপান ভ্রমণ ও তামায়ে কাতোর মমতাভরা সান্নিধ্যে আসার অনন্য অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। ইউজি বললেন— “আমি জাপানি হিসেবে বলতে পারি যে আমরা বিনয়, দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধকে খুবই মূল্য দিয়ে থাকি। কিন্তু তুমি মেয়র–কন্যা তামায়ে কাতোর কাছ থেকে যে ধরনের ভালোবাসা পেয়েছ, সেই সৌভাগ্য সচরাচর সবার ভাগ্যে জোটে না।”

এই কথাগুলো শুনে মনে হলো— মানুষের হৃদয়ের গভীরতম সৌন্দর্য কখনো কখনো এক মুহূর্তেই ধরা দেয়, আর সেই মুহূর্তই হয়ে ওঠে আজীবনের আলো।

জাপান আমাকে শিখিয়েছে— একটি দেশের প্রকৃত পরিচয় তার স্থাপত্যে নয়, তার মানুষের হৃদয়ে। আর সেই হৃদয়ের স্পর্শই ভ্রমণকে স্মৃতি নয়, আত্মার সম্পদে রূপান্তরিত করে।


শারমিন আহমদ | সিলভার স্প্রিং, ম্যারিল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক, শিক্ষাবিদ ও শান্তি শিক্ষার প্রসারে নিবেদিত; The One Light Institute-এর প্রতিষ্ঠাতা।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

Previous Story

মা; এক অনন্ত কবিতা

Next Story

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনা

Latest from নিয়মিত কলাম

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনা

রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রেমের কবি। তার সেই প্রেম ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে স্বদেশ, স্বদেশ থেকে বিশ্ব এবং... লিখেছেন আনিস আহমেদ।

সলঝেনিৎসিন, তাজউদ্দীন এবং নৈতিক রাষ্ট্রনায়কত্বের পথরেখা

মানুষের জীবনে সত্য, সৃষ্টিশীল চিন্তা, আত্মসংযম ও মানবিক কর্তব্য—এই চারটি মূল্যবোধই আমাদের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে তোলে। - লিখেছেন শারমিন আহমদ।