ছোটকালে পেছন পেছন ঘুরতাম রিনা আপার। আমার খালাতো বোন। মনে হয় উনি ছিলেন আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়। তার সাথে রুমাল খেলা, পুতুল খেলা আর ছি মাছি খেলা। আমার চেয়ে বড়ই হবেন বেশ—তার ভাবটা ছিল বড়দিদির মতো। তিনি আমাকে জোর করে পাটিশাপটা পিঠা খাওয়াতেন—যদিও আমার মাঝখানের ক্ষিড়াটা ভালো লাগতো না। তিনি আমাকে কাঁচা মিঠা আম কাসুন্দি দিয়ে মেখে এনে দিতেন। হিন্দু বাড়িতে আচার খেতে নিয়ে যেতেন, বা কড়া দুপুরে ঠাকুরবাড়ীর জঙ্গলে গাব পেড়ে খাওয়াতেন।
ঢাকায় আসার পর আমি যখন নবম শ্রেণীতে, তখন তার বিয়ে হয়ে যায়। আমি যেতে পারিনি, ফাইনালের জন্য। তিনি দুলাভাইয়ের সাথে ঠাকুরগাঁও চলে যান। তাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করতো। আবার রুমাল দিয়ে তার সাথে খেলতে ইচ্ছে করতো, বা তার সাথে নৌকো দিয়ে শ্রীনগর যেতে ইচ্ছে করতো।
একবার স্কুল থেকে আসার পর মা বললেন, রিনা আপা খুব অসুস্থ— দ্বিতীয় বাচ্চা হওয়ার পরে অসুস্থ হয়ে গেছেন। মনটা কেমন যেন কামড় দিয়ে উঠলো। ঠাকুরগাঁও যাওয়ার জন্য বড় বায়না ধরলাম। তার কিছুদিন পর রিনা আপা চলে গেলেন। ইনফেকশন হয়েছিল সিজারিয়ানের পরে। বড় জিদ হয়েছিল—হাসপাতালে ইনফেকশন কেন হবে সত্তরের দশকে! তার কবরটাও আমার আর দেখা হয়নি।
কত স্বপ্ন ছিল— ধারাভাষ্যকার হবো, অথবা ক্রীড়া লেখক হবো, বা মোহামেডান বা ব্রাদার্স ইউনিয়নের কর্মকর্তা হবো। একদিন রিকশায় উঠে সোজা চলে গেলাম ক্রীড়াজগতের সম্পাদক সালমা রফিকের অফিসে। সালমা আপার অফিসে ঢুকে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বলে বসলাম— ক্রীড়া জগতে লিখতে চাই। উনি বসতে বললেন। বুয়েটে পড়ি বলে একটু হেসে দিলেন। বললেন, বুয়েট থেকে লেখে নকীব ভাইকে চিনি কিনা, আগে লেখার কোনো অভ্যাস আছে কিনা। কিছু না যাচাই করেই আমাকে একটা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দিলেন— মিরপুরে একটা জিম শুরু হয়েছে, এ দেশে এটাই প্রথম, ১৯৮২ সালে। তিন সপ্তাহ পর একটা প্রতিবেদন দিতে হবে।
যখন জমা দিলাম, সালমা আপা খুব খুশি হলেন। লেখা ঠিক করে দিলেন, তারেক ভাইকে ছবি নিয়ে আসতে বললেন, আর সাক্ষাৎকারগুলো গুছিয়ে দিলেন। কভার পেজে এটাই আমার প্রথম লেখা। তারপর কত যে লিখেছি – উদীয়মান ক্রীড়া লেখক! সবই সালমা আপার জন্যে। এরপর যখনই দেশে যেতাম আমেরিকায় আসার পরও, তার ক্রীড়াজগত অফিসে আড্ডা বা লাঞ্চে নিয়ে যাওয়া। হঠাৎ শুনি সালমা আপার ক্যান্সার। আমার বউ আর আমি নিয়মিত ক্যালিফোর্নিয়া থেকে তাকে কল করতাম। অত্যন্ত সাহসী ছিলেন। গড়গড় করে সব গল্প করতেন। তার মেয়ে প্রথমার কথা বলতেন বা ক্রীড়াজগতের আড্ডার কথা বলতেন। এমন করে হাসতেন যেন কিছুই হয়নি।
আমি যখন বলতাম, কত নবীন ক্রীড়া লেখককে তিনি পথ দেখিয়েছেন, তিনি হেসে উড়িয়ে দিতেন। আমাকে বলতেন, শত ব্যস্ততার মাঝেও যেন লেখালেখিটা না ছাড়ি। লেখালেখি ছেড়ে দিয়েছিলাম তিনি চলে যাওয়ার পরে। তার নামে সেরা ক্রীড়া লেখক পুরস্কার দেওয়ার খুব শখ ছিল। শখ পূরণ হয়নি। তার কবরটাও কখনও জেয়ারত করা হয়নি।
ঢাকা কলেজের সাউথ হলে ওঠার পরে হুমায়ুন আজাদ মামার বাসায় প্রায়ই যেতাম। আজিমপুরের বাসায় তার সাথে গড়গড় করে কথা বলতে খুব ভালো লাগতো। হুমায়ুন আজাদ আমার মেজো চাচার সম্মন্ধী। আমার চাচাতো ভাই বাবুও আমার সাথে একই ক্লাসে ঢাকা কলেজে ছিল। ভালো-মন্দ খাওয়ার চেয়ে গল্প করাই ছিল উদ্দেশ্য। কত ধরনের যে কথা হতো— ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, এমনকি এডিনবরায় তার পিএইচডির গল্প। ভাষাতত্ত্বের বইগুলো আমি না বুঝলেও, তিনি নির্দ্বিধায় ভাষা পরিবর্তনের কথা বলতেন আমাদের মতো বিজ্ঞানের ছেলেদের মাঝে। তাই আমার বোন যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা পড়তে যায়, তিনি যে কত খুশি হয়েছিলেন। বলতেন, ইমদাদুল হক মিলনের পরে বিক্রমপুর থেকে আরেকটা কাউকে পাওয়া গেল। তিনি আমাকে লেখালেখির ব্যাপারে উৎসাহ দিতেন—এমনকি খেলাধুলার উপরেও।
এডিনবরা থেকে আনা সাত/আটটি নিষিদ্ধ ম্যাগাজিন দিয়ে আমাকে বলেছিলেন, আমি চাইলে বাংলাদেশে এ ধরনের প্রকাশনাও করতে পারি। আমি অবশ্য থতমত খেয়ে গিয়েছিলাম। যখন বুয়েটে লেকচারার হিসেবে নিয়োগ পাই, প্রথমেই তার বাসায় গিয়েছিলাম দেখা করতে। হুমায়ুন আজাদ মামা বলেছিলেন, এটাই মুখ্য সময় ক্যাম্পাসে কোনো অঘটন ঘটানো। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কেমন ধরনের? উনি বললেন, যেমন ধর— সিভিল বিল্ডিংয়ের বড় সিঁড়ি দিয়ে কতগুলো ছাত্রী নামছে। তুই নবীন লেকচারার, উপরে উঠছিস। হঠাৎ করে একজন ছাত্রীকে জড়িয়ে ধরবি। এটা হবে লেকচারারের বড় অঘটন। আমি বললাম, তা কী করে হয়! তিনি একটা উদাহরণ দিলেন। যখন তিনি জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন চিটাগং ইউনিভার্সিটি থেকে, তার এক লেকচারার সহকারী এক বয়স্ক প্রফেসরের বউকে ফুসলিয়ে নিজের বাসায় নিয়ে আসে। তার কিছুদিন পরে সেই প্রফেসর তার বউকে ফেরত নিয়ে যায়। তখন তারা হাসতেন— অঘটন ঘটেও হলো না! সেই লেকচারার আবার সেই বউকে ফেরত নিয়ে এসেছিল— এমন একটা অঘটন ঘটাতে।
তিনি যখন ‘দেশবন্ধু’-তে নিয়মিত লিখতেন, আমি তার লেখা আনতে যেতাম। যেদিন তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামকে প্রতিক্রিয়াশীল বলেছিলেন, সেদিনই তার বাসায় গিয়ে খুব ঝগড়া করেছিলাম। তিনি সেদিন আমাকেও প্রতিক্রিয়াশীল বলেছিলেন। যে দিন তিনি কবি আল মাহমুদের মাকে ‘গোলামের গর্ভধারিণী’ বলেছিলেন— সেদিনও তার বাসায় গিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। আর ১৯৮৬ সালে তিনি যখন প্রফেসর হন, তখনও তার বাসায় গিয়েছিলাম। তারপর আমেরিকা আসার পরে খুব একটা যোগাযোগ হয়নি। দু-একবার কথা হয়েছিল। বিভীষিকাময় ঘটনাটি ঘটেছিল ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলার বাইরে বাংলা একাডেমির পাশে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়। দুর্বৃত্তকারীরা বা প্রতিক্রিয়াশীলরা তাকে চাপাতি দিয়ে মেরে ঘাড়, মুখ, হাত ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশে তিনি সিএমএইচ থেকে থাইল্যান্ডে যাওয়াতে প্রাণে বেঁচে যান। ইসলামিক জঙ্গীবাদী দল JMB এই হামলার কথা স্বীকার করে।
তিনি ঢাকায় ফেরত আসার পর তাকে নিয়মিত কল করে খোঁজখবর নিতাম। তিনি চিৎকার করে মামিকে বলতেন, ‘দেখো, কে সাম্রাজ্যবাদ আমেরিকা থেকে কল করেছে’! সে বছরই তিনি জার্মানিতে যান— জার্মান কবি হেনরিকের এর উপর গবেষণা করতে। তার সাথে আর যোগাযোগ হয়নি। মনে হয়, মনের দুঃখে তিনি জার্মানিতে গিয়েছিলেন। জিজ্ঞেস করতে পারলে ভালো হতো। নিজের কাজ আর পরিবার নিয়ে এতটা ব্যস্ত ছিলাম যে জানতামও না— হুমায়ুন মামা জার্মানিতে গিয়েছেন। জানলাম— তার মরদেহ জার্মানির মিউনিখে তার অ্যাপার্টমেন্টে যখন পাওয়া গেল। জানা হলো না— কেউ মেরেছে কিনা, ইসলামিক জঙ্গীরা, নাকি ফেব্রুয়ারিতে ক্ষতবিক্ষত দেহ কখনো পুরোপুরি সারেনি, নাকি এমনিতেই মাত্র ৫৭ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।
মাঝে মাঝে মনে হয়— ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ লেখাটি না লিখলেই পারতেন। কী দরকার ছিল এত সংগ্রাম করার, এত বিদ্বেষ থাকার, বা নিজের অভিমত প্রকাশ করার! বাংলা তো তার সন্তানকে হারালো, বাংলা সাহিত্য এক প্রতিভাকে হারালো, আর বিশ্ববিদ্যালয় এক অভাবনীয় শিক্ষককে হারালো। অনেক ইচ্ছে ছিল— বিক্রমপুর রাটিখালে তার কবর দেখতে যাব। যাওয়া হয়নি। করা হয়নি কিছুই। সেই কবি, সেই ভাষা-সাহিত্যিক, সেই বিদ্বেষী, সেই যুগান্তকারী লেখক এবং সেই ভালোবাসার ধ্বজাধারী কঠিন মাটির তলে আটকে গেলেন।
যখন ক্যান্টনমেন্ট স্কুলে পড়ি, শহীদ রমিজউদ্দিনে— আমাদের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন আর্মির ডেপুটি চিফ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। আমি তখন সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। আমাদের স্কুলটি আর্মির অধীনে ছিল। আমি সেবার দৌড়ে কয়েকটি মেডেল পেয়েছিলাম— প্রথম হতে পারিনি। সেবার প্রথম খালেদা জিয়াকে সামনে থেকে দেখে অবাক হয়েছিলাম— ভীষণ সুন্দরী আর অমায়িক। আমার দ্বিতীয় স্থানের মেডেল তিনি নিজ হাতে আমাকে পরিয়ে দিয়েছিলেন। আর জিয়াউর রহমান দিয়েছিলেন প্রথম স্থানের পদকটি।
১৯৭৪ সালে প্রথম আমার দেখা খালেদা জিয়ার সাথে। তারপর আবার দেখা হয়েছিল সেনাবাহিনীর সাঁতার প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে। জিয়া আসতে পারেননি বলে খালেদা জিয়া পুরস্কার বিতরণী ও বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তারপর থেকে প্রতিবছর দেখা হতো সেনা কল্যাণ সংস্থার অনুষ্ঠানে। আমি প্রতিবছর ১২০০ টাকা বৃত্তি পেতাম— খালেদা জিয়া তা আমার হাতে তুলে দিতেন। তিনি প্রতিবারই মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। কী যে ভালো লাগতো!
১৯৮১ সালে যখন জিয়া মারা যান, দৌড়ে ঢাকা বিমানবন্দরে গিয়েছিলাম লাশ দেখতে। ১৯৮৭-৮৮ সালে খালেদা জিয়ার আপোষহীন সংগ্রামের কথা মনে আছে। মনে আছে—একটি যৌথ সংগ্রামে খালেদা জিয়া শত বাধার মধ্যেও ছিলেন জনতার সাথে, শেখ হাসিনা আসি আসি করেও আর আসেননি। এরশাদ যখন ক্ষমতায় আসে, খালেদা জিয়া কোথাও নড়েননি। গত ১৬ বছরে প্রচুর নির্যাতিত আর সুচিকিৎসা না পেলেও আপোষ করেননি। নিজের বাড়ি হারালেও দলের হাল ছাড়েননি। স্বামী-ছেলে হারালেও আশা ছাড়েননি। শেষ অবধি দেখেছেন আলো— দেখেছেন আরেকটি সুষ্ঠু নির্বাচন। যে অর্থনৈতিক, শিক্ষা ব্যবস্থার ও নারী কর্মসংস্থান শুরু করেছিলেন তিনি ১৯৯১ সালে, তা আবারও দেশের আকাশ ভরিয়ে দেবে হয়তো। কিন্তু চলে গেলেন তিনি।
স্কুলে থাকতে প্রতি বছর যেমন তিনি আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন, তখন ১২০০ টাকাটাই আমার বড় মনে হতো। বাসায় গিয়ে আব্বার হাতে পুরো টাকাটাই দিয়ে দিতাম— খালেদা জিয়ার মাথায় হাত বুলানোর কথা বলতাম না। এখনও হাতের সেই পরশ পড়ে আছে— কিন্তু তিনি আর নেই। তার কবরেও এখনও যাওয়া হয়নি। কারও আদরে বড় হয়েছি, কারও দিকনির্দেশনায় লিখতে শিখেছি, কারও কথোপকথনে মুগ্ধ হয়েছি, বা কারও পরশে মোহিত হয়েছি। তারা কেউই থাকে না— তাদের কবরেও যাওয়া হয় না। আর খালি মনে হয়— ‘আস্তে আস্তে ঘুরে দেখ দেখি কঠিন মাটির তলে, দিন দুনিয়ার বেহেস্ত আমার ঘুমায় কিসের ছলে’।

পদ্মলোচন | স্যান হোজে, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র
পড়শীর আদি প্রকাশনায় নিয়মিত লেখক ‘পদ্মলোচন’ বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রিকায় লিখতেন।
