সবচেয়ে বড় মনোলিথিক গীর্জা

ফাতিমা জাহান | মার্চ ১৯, ২০২৬
April 16, 2026

ভোরবেলায় ঘুম ভেঙে গেল প্রার্থনার সুরে। এই শীতের সকালে এত ভোরে এরা উঠে প্রার্থনা করে! ঘড়িতে দেখি ভোর পাঁচটা বাজে। দিনের আলো এখনো ঠিকমতো ফোটেনি। মাইকে সমানে প্রার্থনা করে যাচ্ছে আর আমার ঘুমের বারোটা বেজেছে। আর এক ঘন্টা পর প্রার্থনা শুরু করলে কি হত? এই শীতের সকালে উঠতেও ইচ্ছে করছেনা। আধ ঘন্টা কানে বালিশ চেপে যখন ঘুমাতে পারলামনা তখন উঠে গেলাম। হাতমুখ ধুয়ে চা বানালাম। আফ্রিকার চা আমার কাছে এক অনন্য সুগন্ধের আধার বলে মনে হয়। ইথিওপিয়ার কফি তো আরও অনন্য। চা খেতে খেতে জানালা দিয়ে এক অপার্থিব দৃশ্য দেখলাম। সামনের কাঁচা সবুজ সোরগাম ক্ষেতের আইল ধরে সারিবেঁধে মাথা থেকে পা অবধি সাদা পোশাকে মুড়ে নারীরা বাড়ি ফিরছে। এখন বাজে সকাল ছ’টা। এরা কত ভোরে উঠে গীর্জায় গিয়েছে কে জানে! আর সাদা পোশাকে তাদের একেকজনকে দেবদূতের মতো লাগছে। এমনিতেই গতকাল থেকে লালিবেলার সবুজ পাহাড়, সোরগাম ক্ষেত আর বিনয়ী মানুষের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে আছি।

এই শোভা দেখতে দেখতে মনে হল নীচে গিয়ে নাশতা সেরে নেই। সকাল আটটায় আমার গাইড আসবে আমাকে নিয়ে পুরনো গীর্জাগুলো ঘুরিয়ে দেখাবে। আগে থেকেই সতর্ক করা হয়েছিল যে, আমি যেন গাইড ছাড়া একা কোথাও না বেরোই। তাই আমার রিসোর্ট থেকে গাইড ঠিক করে দেয়া হয়েছে।

নীচে ডাইনিং হলে গিয়ে দেখি নাশতা তৈরি হতে আরও সময় লাগবে, এরা সব গীর্জায় গিয়েছে প্রার্থনা করতে। আজ কোনো বিশেষ দিন কি? রিসোর্টের ম্যানেজার বিরহান আসলে জিজ্ঞেস করতে হবে। এই ছেলেটাই রিসোর্টে একমাত্র ইংরেজি জানে। আমি আরেক কাপ চা হাতে নিয়ে এদের বাগান ঘুরে ঘুরে দেখি। অনেক ফুল আর পাতাবাহারের বাগান করেছে। একপাশে ছোট একটা কিচেন গার্ডেন আছে। আরেকপাশে কমলা গাছে ফুল ফুটেছে। মিষ্টি একটা গন্ধ আসছে। রিসোর্টের এক কোনায় অনুচ্চ দেয়ালের ওপর সারি সারি মদিরার বোতল রাখা। সেগুলো বেয়ে লতিয়ে উঠেছে জেরেনিয়াম ফুলের ঝাড়, গোলাপি ফুলও ধরেছে। এদের অ্যাস্থেটিক সেন্স তো বেশ। মদিরার বোতলের মাঝে ফুল ফুটিয়ে দিয়েছে। সোমরস পান করলে বোধহয় মনেও ফুল ফোটে।

নিরাপত্তার কারণে ইথিওপিয়ার লালিবেলা গ্রামে আমার একা বাইরে যাওয়া বারণ তাই রিসোর্টের লনে বসে বসে রোদ পোহাচ্ছি। বেশ জমিয়ে ঠান্ডা পড়েছে। এর মাঝে রিসোর্টের কুক চলে এসেছে। অন্যরাও একসাথেই এসেছে। আজ ওদের বিশেষ প্রার্থনা ছিল। আজ সোমবার, ওদের বিশেষ প্রার্থনার দিন। অবশ্য যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই জনপদে প্রার্থনা করা ছাড়া আর কোনো কাজ আছে বলে মনে হয়না। ২/৩ টা রিসোর্ট ছাড়া অন্য কোথাও ওয়াইফাই নেই। মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকেনা, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ।

কুক ছেলেটির নাম আইসা। ঝটপট নাশতা তৈরি করে টেবিল সাজিয়ে দিল। আমি লনের টেবিল ছেড়ে উঠিনি। রোদে বসে নাশতা করতে কার না ভালো লাগে! নাশতার আয়োজন খুবই সাধারণ। আমিই বলেছিলাম যে আমি ব্রেড টোস্ট আর অমলেট খেতে চাই। স্থানীয় খাবার সকাল সকাল খাবার ইচ্ছে নেই। নাশতা শেষ করতেই শুনি রিসিপশনে আমার গাইড এসে গিয়েছে। রুমে গিয়ে ব্যাগ নিয়ে একবারে নীচে নেমে এলাম। লালিবেলায় আমার গাইডের নাম ইন্ডিয়াই। রোগা মতোন একটা ছেলে। উচ্চতা সাধারণ আফ্রিকানদের চেয়ে কম।

ইথিওপিয়াকে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীণ জনপদ হিসেবে গণ্য করা হয়। প্রায় ৪২ লাখ বছর আগে ইথিওপিয়ায় প্রথম মানুষ আকারের শিম্পাঞ্জি জাতীয় প্রাণীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। এখন অবশ্য ইথিওপিয়ায় মানুষের দেখাই মেলে; কঠিন বর্ণবাদের শিকার, অবহেলিত, নিষ্পেষিত মানুষ। তবে মজার বিষয় হল, আফ্রিকার অন্যান্য দেশে বৃটিশ বা ইউরোপীয় কলোনি গড়ে উঠলেও ইথিওপিয়াকে কেউ বশে আনতে পারেনি। ইথিওপিয়া ইউরোপীয় দ্বারা আক্রান্ত হলেও কখনোই নিজের দেশে বিদেশীদের শাসন মেনে নেয়নি। তাই ইথিওপিয়া আফ্রিকার অন্যান্য দেশের চেয়ে স্বতন্ত্র।

ইন্ডিয়াই আর আমি হেঁটে হেঁটে হেরিটেজ সাইটের দিকে চললাম। রিসোর্ট থেকে দশ মিনিটের হাঁটা দূরত্ব। গতকাল এসেছি অথচ এখনো এই জনপদ কঠোর নিরাপত্তার কারণে ঘুরে দেখিনি। বিদেশী ট্যুরিস্টদের একা বাইরে ঘোরা নিষেধ। সরকার থেকে বলে দেয়া আছে, বিচ্ছিন্নতাবাদী বিদ্রোহী গোষ্ঠী ট্যুরিস্টদের কিডন্যাপ করতে পারে। বিনিময়ে চাইবে টাকা পয়সা বা সরকার পতন। আর সন্ধ্যে ছ’টার পর কারফিউ দিয়ে দেয়, বলবৎ থাকে পরদিন ভোর অবধি।
আমরা পাহাড়ের নীচের দিকে নেমে যাচ্ছি।

কবলস্টোন বিছানো পথের দু’পাশে মানুষের ঘরবাড়ি। অবশ্য খুব ঘন ঘন নয়। কেউ কেউ সাদা চাদর মুড়ি দিয়ে বাড়ির দাওয়ায় বসে আছে। নারী-পুরুষ সবাই সাদা সুতি চাদর মুড়ি দিয়ে আছে। এমন অদ্ভুত লোকালয় আগে দেখিনি। দূর থেকে দেখলে নারী পুরুষ আলাদা করা যায়না।

প্রতিটি বাড়ি দোচালা টিন বা খড়ের ছাদ, মাটির দেয়াল। অল্প কয়েকটা বাড়ি পেরিয়ে পথ নেমে গিয়েছে সোজা নীচে পাহাড়ের ঢালে। পেছনে সারি সারি সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের পায়ের কাছে সোরগাম ক্ষেত হলুদ থেকে সবুজ হয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ের রূপ দেখতে দেখতেই দিন পার হয়ে যাবে।

গ্রামের বাজার শুরু হয়েছে এখান থেকে। পথের পাশেই জ্বালানি কাঠ নিয়ে বসেছে কয়েকজন। সামনে প্লাস্টিকের জুতা নিয়ে বসেছে হকার, আরেকটু সামনে পথের পাশে স্তুপ করা সেকেন্ড হ্যান্ড কাপড় নিয়ে হকার বসেছে পথে। আমাদের বেশিদূর যেতে হলোনা। বাঁয়ে বাঁক নিয়ে আমরা হেরিটেজ সাইট মানে ১১ টি উল্লেখযোগ্য গীর্জার মূল গেইটে এসে পড়লাম। এখানে আমাকে টিকেট কাটতে হবে। টিকেটের মূল্য ১০০ ডলার। টিকেট অফিসে পাদ্রীর পোশাক পরে দু’জন বসে আছে। পাদ্রীরা এখানে কোট প্যান্টের উপর পা অবধি লম্বা সাদা চাদর জড়িয়ে থাকে, মাথায় প্যাঁচানো থাকে সাদা পাগড়ি। আর হাতে থাকে ক্রস৷ এভেবেই লালিবেলায় পাদ্রী সাহেবকে চিহ্নিত করা যায়। ইন্ডিয়াই কে জিজ্ঞেস করতেই বলল যে, আসলেই তারা পাদ্রী। এতকাল সাদা বা বাদামী চামড়ার পাদ্রী দেখে এসেছি। কালো মানিক পাদ্রী এই প্রথম দেখলাম।

এদের মাঝে একজন পাদ্রী আমাকে একটা ফর্ম পূরণ করতে বললেন। পরে সেটাই আমার হাতে দিয়ে বললেন যে, এটাই টিকেট। আমি পৃথিবীর নানা হেরিটেজ সাইটে অত্যাধুনিক টিকেট মেশিন থেকে টিকেট কিনেছি। কিন্তু এমন প্রাচীণ পদ্ধতিতে এই প্রথম টিকেট কিনলাম। ইণ্ডিয়াই বলল, ‘প্রথমে আমরা যাব এই প্রাঙ্গণের প্রথম, সর্ববৃহৎ ও উল্লেখযোগ্য গীর্জা বেতে মেধানে আলেম গীর্জায়।’

ত্রয়োদশ শতকে রাজা লালিবেলা এ অঞ্চলে নিজের সৌর্য রক্ষার্থে বেশ কিছু গীর্জা নির্মাণ করেন। বেতে মেধানে আলেম এই প্রাঙ্গণের ১১ টি গীর্জার মধ্যে অন্যতম ও বৃহৎ গীর্জা। প্রত্যেকটি গীর্জা একপ্রস্ত পাথরে নির্মিত। মানে বিশাল, আস্ত পাথরখন্ড কেটে গীর্জা নির্মিত হয়েছে। এই গীর্জা নির্মাণের সময় কোনো মাটি, সিমেন্ট, বালি, সুরকি, লোহা, রড ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। পাথরের পাহাড় কেটে এই বিশাল বিষ্ময় তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
গীর্জাটি পাহাড় থেকে সমতল, সমতল থেকে আরও নীচের দিকের পাথর খোদাই করে নির্মিত হয়েছে বলে পাহাড় থেকে নীচে নামতে হয় সদর দরজা অভিমুখে। পাহাড়ের উপরে এখন সাদা চাদরে, মাথা ঢেকে বেশ কিছু নারী বসে আছেন। তাঁদের প্রার্থনা শেষ। আমি ইন্ডিয়াইকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘প্রার্থনা শেষ হয়ে গেল। এখন আমি কি দেখব?’ ইন্ডিয়াই প্রশ্রয়ের হাসি হেসে বলল, ‘তুমি অবশ্যই উল্লেখযোগ্য কিছু দেখতে পাবে।’

নীচে নেমে গীর্জার বহিরাঙ্গ নীচ থেকে দেখে তাক লেগে গেল। এত উঁচু গীর্জা যে মনে হচ্ছে চার/ পাঁচ তলা সমান। গ্রীক উপাসনালয়ের মতো অনেকগুলো স্তম্ভ সামনের বারান্দায় সারি সারি বসানো। আস্ত পাথরে নির্মিত চৌকোণ এত বড় গীর্জা আমি আগে দেখিনি। দেখার প্রশ্নই আসেনা কারণ এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ একপ্রস্তর নির্মিত গীর্জা। বেতে মেধানে আলেম গীর্জা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একপ্রস্ত পাথর বা আস্ত পাথর কেটে নির্মিত গীর্জা। রাজা লালিবেলা আসলেই এক বিষ্ময় সৃষ্টি করে গিয়েছেন।

গীর্জার সামনে এখন এক এক করে ভক্তরা গড় হয়ে প্রণাম করছেন, কেউ কেউ প্রণাম না করে হাত জোড় করে মাথা নীচু করে সম্মান দেখিয়ে গীর্জায় প্রবেশ করছেন। ইন্ডিয়াইও তাই করল। ইন্ডিয়াই নিজে শার্ট, প্যান্ট, জ্যাকেটের উপর সাদা লম্বা চাদর পরে এসেছে। চাদর ওর পা ছুঁয়ে যাচ্ছে৷ এই চাদর স্থানীয় তাঁতে হাতে তৈরি করা হয়। কারো কারো চাদরে সরু পাড় দেয়া আছে। পাড় দেখতে একদম আমাদের দেশের তাঁতের শাড়ির পাড়ের মতো।
সামনে উঁচু উঁচু সিড়ি বেয়ে বলতে গেলে হামাগুড়ি দিয়ে গীর্জার বারান্দায় গেলাম স্তম্ভগুলো কাছ থেকে দেখার জন্য। চারকোনা মোট ৩৪ টি স্তম্ভ বা কলাম আছে। বারান্দায়ও কিছু ভক্ত প্রণাম করে ভক্তি দেখাচ্ছেন। নারীপুরুষ সবার পরনের পোশাকের উপর পা অবধি লম্বা চাদর জড়ানো। আমি অনেক দেশে পাহাড় কেটে কেটে মন্দির বা প্যাগোডা দেখেছি কিন্তু গীর্জা কোথাও দেখিনি। এই প্রথম প্রাচীণ গীর্জা দেখলাম যা পাহাড় কেটে তৈরি করা হয়েছে।

ভেতরে জুতো খুলে প্রবেশ করতে হয়। আমি আর ইন্ডিয়াই এক জায়গায় জুতো রেখে ভেতরে চললাম। ভেতরে যে এত বড় আনন্দ-যাত্রা চলছে তা জানা ছিলোনা। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। গীর্জার মূল প্রার্থনা কক্ষে দুটো বাতি জ্বালিয়ে না রাখলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যেতাম। ঢুকতে একটা প্যাসেজ মতো জায়গায় দেখি পাদ্রী সাহেব একে একে দাঁড়ানো মানুষের গায়ে তাঁর হাতের নকশাকাটা বড় চাকতি দিয়ে সারা গায়ে বুলিয়ে পরিশুদ্ধ করে দিচ্ছেন। ইন্ডিয়াই কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই এক ফুটের বেশি লম্বা ওভাল শেইপের চাকতি কি কাজে আসে?’ সে বলল, ‘এটা রাজা লালিবেলার চাকতি বা ক্রস। সাধারণত ক্রস হয় চারকোনা কিন্তু রাজার নিজের নামের এই ক্রস ওভাল শেইপের।’ পিতলের এই ক্রসের মাঝে বিভিন্ন নকশা করা।

‘তারমানে রাজা লালিবেলাও নিজেকে সাধু-সন্তের সমান ভাবতেন?’

‘রাজা লালিবেলা আসলে সাধুই ছিলেন।’

ইন্ডিয়াই এর কথায় তেমন ভরসা পেলামনা। ওরা যেভাবেই রাজাকে দেখুক বা সম্মান দেখাক না কেন, সাধু-সন্ত মানুষ কখনো ক্ষমতালোভী হতে পারেনা।

পুরুষরা এই কনকনে ঠান্ডায় গায়ের সাদা চাদর, শার্ট খুলে খালি গা এগিয়ে দিচ্ছে পরিশুদ্ধ হবার জন্য। পরিশুদ্ধ হয়েই আবার কাপড় পরে নিচ্ছে। নারীরা তেমন কিছু খুলছেনা। যেভাবে এসেছে সেভাবেই পরিশুদ্ধ হতে এগিয়ে যাচ্ছে। ইন্ডিয়াইও অতি ভক্তিভরে এগিয়ে গেল আশীর্বাদ নিতে, পরিশুদ্ধ হতে৷ প্রাদ্রী হাতের নকশাকাটা চাকতি বা লালিবেলা ক্রস দিয়ে ইন্ডিয়াই এর দুই হাত, বুক পিঠ, দুই পায়ে বুলিয়ে শেষে মাথা ও মুখে বুলিয়ে দিল। মুখে বুলানোর আগে ইন্ডিয়াই লালিবেলা ক্রসে ভক্তিভরে চুমু দিল। সবাই ক্রসে চুমু দেয়।

আমরা এখনো প্যাসেজেই দাঁড়িয়ে আছি। মূল প্রার্থনা কক্ষ পাশেই। এখানে মূল পাদ্রী এখন অন্যদের শুদ্ধিকরণ করছেন। তাঁর পোশাক পোপের মতো জাঁকজমকপূর্ন। পরনে ক্রিম কালারের সিল্কের লম্বা পোশাক, মাথায় লাল মুকুট। মুকুটটা বোধহয় কাগজের তৈরি। আর পোশাকও আসল সিল্ক বলে মনে হচ্ছেনা। না হলেও দরিদ্র দেশের পাদ্রীর ভাবমূর্তি এতেই বজায় রাখা যাচ্ছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছেন দ্বিতীয় মর্যাদা সম্পন্ন পাদ্রী। তিনিও প্রধান পাদ্রীর মতোই পোশাক পরে আছেন। আমি আর ইন্ডিয়াই মূল প্রার্থনা কক্ষের দিকে এগুলাম। প্যাসেজ পেরিয়ে বাঁ দিকে পড়ে। প্যাসেজ সস্তা পাতলা কার্পেটে আবৃত।

মূল প্রার্থনা কক্ষে এখন নানা মানুষের ভীড়। সবাই পা অবধি সাদা চাদরে আবৃত। পুরুষরা এক খন্ড সাদা কাপড় মাথায় পাগড়ির মতো বেঁধেছে আর নারীরা গায়ের চাদরটি মাথায় তুলে ঘোমটা দিয়েছে। নারীরা একেবারে আমাদের দেশের মতো ঘোমটা তুলে মাথা নীচু করে মুখটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছে। শীতকালে নারীরা যেমন চাদরে গা মাথা ঢেকে, চাদর দিয়ে নাক ঢেকে রাখে সেরকম৷ সব নারী সস্তা কার্পেট পাতা মেঝেতে বসে আছে এক কোনায়। মূল প্রার্থনা কক্ষে সারি সারি পাথরের স্তম্ভ দাঁড়িয়ে আছে। নারীরা সেই বিশালাকৃতির স্তম্ভে হেলান দিয়ে বসেছে। নারীপুরুষ সবার হাতেই লম্বা লাঠি। একেকটা লাঠি লম্বায় ৫ ফুটের মতো হবে। লাঠির মাথায় আমাদের দেশের মতো বাট দেয়া। অনেক্ষন প্রার্থনায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বলে এই লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যায়। লাঠি গীর্জার ভেতরেই থাকে। কেউ কেউ নিজের লাঠি সাথে নিয়ে আসেন।

পুরুষরা একটু দূরত্ব রেখে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তবে সবচেয়ে ভালো লাগল যা দেখে তা হল পুরুষদের সম্মিলিত প্রার্থনা সংগীত। পুরুষরা সারি সারি দাঁড়িয়ে হাতে পারকাশনের মতো পিতলের ছোট বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে একই সুরে একই ধ্বনির প্রতিফলন করছে। শুনতে অনেকটাই বৌদ্ধদের চ্যান্টিং এর মতো। আদতে এই গীর্জাও আমার কাছে গীর্জা বলে মনে হচ্ছেনা। বিভিন্ন দেশের গীর্জা খোলামেলা আলো-বাতাসময় হয়। মাটির নীচে আস্ত পাথরখন্ড কেটে তৈরি গীর্জা এই প্রথম দেখায় একে আমার গুহা বলে মনে হচ্ছে।পুরুষদের মধ্যে দু’জন মাটিতে বসে ঢোল বাজিয়ে সমবেত সংগীতের সাথে তাল দিচ্ছে। এর মাঝে পাদ্রী সাহেব চলে এসেছেন মূল কক্ষে।

একইভাবে তিনি একের পর এক নারীপুরুষকে পরিশুদ্ধ করে চলেছেন। আর তাঁরই সামনে পুরুষেরা ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করে চলেছেন। এক অপার্থিব পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। আধো অন্ধকারে আমার মনে হল আমি ত্রয়োদশ শতকে চলে গিয়েছি। সেই একই বাদ্য, একই সংগীত, একই উপায়ে উপাসনা, একই মানুষের ভক্তি রূপ।

এ গীর্জায় মূল বেদী বলে কিছু নেই। সামনের দেয়ালে যিশুখ্রিষ্টের বিশাল একটি ছবি ফ্রেমে বাঁধাই করে রাখা আছে। লোকে এসে সেই ছবিকে গড় হয়ে প্রণাম করছে, এর সামনে দাঁড়িয়ে বাইবেল পড়ছে। ছবির পাশে কমদামি স্যাটিনের ক্রিম কালারের পর্দা ছাদ অবধি উঠে গিয়েছে। পর্দা ভেদ করে জনসাধারণের ওপাশে যাওয়া নিষেধ। শুধু পাদ্রী যেতে পারেন। পর্দার ওপাশে পাদ্রীদের প্রার্থনার স্থান। পর্দার একপাশে যিশুর ছবি আর অন্যপাশে সারি সারি মোমবাতি জ্বলছে মোমবাতির সামনে যিশুর ক্রুশবিদ্ধ ছবি। অন্যান্য দেশের গীর্জায় মোমবাতি জ্বালিয়ে প্রার্থনা করাকে পূন্য হিসেবে মানা হয়। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। গীর্জার ভেতরের স্তম্ভ গুলোর উপরিভাগে গোলাকার হয়ে একটির সাথে আরেকটি জুড়ে আছে। দেখতে অনেকটাই প্রাসাদের নকশার মতো মনে হচ্ছে।

ইন্ডিয়াই নিজের হাতের টর্চ জ্বেলে সিলিং দেখিয়ে বলল, ‘দুই স্তম্ভের মাঝে খোদাই করা নকশা দেখ।’ আমি দেখলাম গোলাকার ফুলের মতো অতি সাধারণ একটি ছোট নকশা মোটা মোটা করে খোদাই করা। এই নকশা দেখিয়ে ইন্ডিয়াই উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল। বলল, ‘দেখ, কী সমৃদ্ধ খোদাই আমাদের।’ আমি সদ্য মরক্কো থেকে এসেছি আর ভারতে তো হরহামেশাই পাথরের উপর অনন্যসাধারণ সূক্ষ্ম খোদাই দেখি। খোদাই সম্পর্কে কিছু বলতে গিয়েও হজম করে ফেললাম। বেচারার মনে কষ্ট দিয়ে লাভ নেই। ওরা পাথরে খোদাই করা তেমন কিছুই দেখেনি তাই গাবদাগোবদা ছোট একটা খোদাই দেখিয়ে মনে করছে বিশাল কি যেন দেখিয়ে ফেলেছে।

যিশুর ছবির সামনে এখন একজন ভক্ত দাঁড়িয়ে কপটিক বাইবেল পড়ছেন। কপটিক বাইবেল হল আফ্রিকার প্রাচীণ গিয ভাষায় লেখা বাইবেল। ইথিওপিয়ায় এখনো গিয ভাষায় বাইবেল পঠিত হয়। ইন্ডিয়াই কে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমরা তো ইংরেজি বা স্থানীয় আহমারিক মাধ্যমে পড়াশোনা করেছ। তাহলে এত মানুষ গিয ভাষা কিভাবে শিখল?’ ইন্ডিয়াই জবাব দিল, ‘যাদের আগ্রহ আছে তারা সন্তানদের গিয ভাষা শেখাতে পাদ্রীদের কাছে পাঠায়।’

আমি এই গুঞ্জনরত প্রায় অন্ধকার গীর্জায় আরেকবার প্রদক্ষিণ করে বেরিয়ে পড়লাম পরের গীর্জার অনুসন্ধানে।


ফাতিমা জাহান | ব্যাঙ্গালুরু, ভারত

ব্যাঙ্গালুরুতে বেড়ে ওঠা; সিঙ্গাপুরে পড়াশোনা। ভ্রমণপিপাসু, চাকরি ছেড়ে ঘুরেছেন বিশ্বজুড়ে। লেখালেখি সাত বছর, বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। ভ্রমণ বিষয়ক প্রকাশিত গ্রন্থ – ‘মওলানা জালালউদ্দিন রুমির খোঁজে তুরস্কে’, ‘লখনউনামা’, ‘পাহাড় সরোবরের কাযাখস্তান’, ‘তানযানিয়ার হৃদয় হতে’, ‘ফিরোজা রঙের দেশ।’ কাব্যগ্রন্থ – ‘কাউকে নয়।’

Previous Story

ভেড়া

Next Story

পড়শীর আরশি