বাবা আমার মাথার ছাতা

বাবা আমার মাথার ছাতা

শিহাব শাহরিয়ার
June 16, 2026
10 views
38 mins read

একজন বাবা যখন গাজীপুরের একটি প্রবীণ আশ্রমে শুয়ে শুয়ে, আড়ালে বসে বসে, নীরবে বৃক্ষতলায় পায়চারি বা হেঁটে হেঁটে বুকফাটা করুণ বেদনা ঝরান, নিঃসীম অশ্রুজলে চোখ ভিজান প্রিয় সন্তানের জন্য সেখানে আমি আপনি তৃতীয় নয়নেও জল ঝরানো ছাড়া কিইবা করার আছে? যে সন্তানের জন্য পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন কিংবা ষাট-পঁয়ষট্টি বছর মায়ার জাল ফেলে আদরে-ভালবাসায় ভরিয়ে রেখেছিল, সেই সন্তান এখন যোজন যোজন দূরের মানুষ। সে হয়ত আছে নিজ সন্তান-স্ত্রী নিয়ে অথবা নিজেকে নিয়ে নিজেই আছে সুখ নামক নিজের ভুবনে। বাবা নামক মায়ার পৃথিবী তাকে আর টানে না। বৃক্ষ-শোভিত মধুময় যে গ্রামে বা যে মফস্বলের স্নিগ্ধ ছায়ায় যে সন্তানটিকে জন্ম দিয়ে বড় করতে করতে নিজেই তুলে দিয়েছেন আকাশ পথে, সেই মায়াবী মুখ অশ্রু ফেলতে ফেলতে বিমানের জানালা দিয়ে সাদা মেঘের ভিতর হারিয়ে গিয়ে সাত-সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছে গেছে এক অজানা, অচেনা প্রান্তে। কেউ কেউ ওই প্রান্তের মায়াজালে জড়িয়ে ভুলে গেছে এই নদী মেখলার নরম কাদামাখা মাটি, উড়ন্ত ধুলোবালি, পশু-পাখি, ফুল-ফল আর প্রিয় মুখগুলোকে। বলবেন, কেউ হয়ত এখন তো স্কাইপে, ফেসবুকে, হোয়াটস অ্যাপে, মোবাইলে সহজেই পুরনো বন্ধনকে সুদৃঢ় করা যাচ্ছে। কিন্তু একবার নিজেকে প্রশ্ন করুন তো? জীবন্ত উপস্থিতি আর প্রযুক্তির উপস্থিতি কোনটা বেশি কার্যকর?

আমার বাবাকে ছেড়ে বা রেখে একবারও কোথাও যাইনি। আমিও বাবা হয়েছি। আমার দু’পুত্র যখন ‘বাবা’ বলে ছুটে আসে আমার কাছে, মায়ায় ভরে যায় আমার বুক। ওদেরও সৌভাগ্য যে, আমার বাবা-মা’কে ওরা প্রতিদিন দেখে দেখে বড় হচ্ছে। আমিও প্রতিদিন সকাল-বিকাল আমার স্নেহময়ী মা এবং প্রিয়তম বাবার মুখ দেখে দেখে দুঃখ-সুখের জীবন পথে হাঁটছি। বুঝি তাঁরা ছাড়া অন্তর দিয়ে ভালবাসার আর কেউ নেই পৃথিবীতে আমার। বয়সের ভারে তাঁরা যখন শিশুর মতো হয়ে গিয়েছিলেন, তখন তারা আরো মায়াবী হয়ে উঠেছিলেন। অনেক অনেক কথা বলতেন তাঁরা। যে জীবন-নদী পাড়ি দিয়ে এসেছেন, সেই নদীর দু’পাড়ের অনেক গল্প ছিল তাদের। অনেক উপদেশ, অনেক পরামর্শ দিতেন। তাঁরা দু’জনেই বার্ধক্য ও নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে গিয়েছিলেন বলে, আমি কখনো কখনো নীরবে জল ঝরাতাম। তাঁদের মৃত্যু-ভাবনা আমাকে আক্রান্ত করে, ব্যথিত করে। আমার বাবা? সব বাবার মতই। আমার বাবা? সব বাবা থেকে একটু আলাদা। তিনি একজন সাধারণ মানুষ। অতি সাধারণ যাকে বলা যায়। নিরাহংকারী, সৎ, নিষ্ঠাবান, পরিশ্রমী, আদর্শবান, অত্যন্ত সাহসী, পরোপকারী, সন্তাদের প্রতি আজীবন যত্নবান, ধার্মিক এবং একজন খাঁটি বাঙালি। শেষ নিঃশ্বাসের দিন পর্যন্তও নিজের কাপড় নিজে ধুতেন। পোশাক-আশাকে সাধারণ। বিলাসিতা করেননি। মিতব্যয়ী। স্বাস্থ্যবান। শ্যামল বাংলার শ্যামল মানুষ।

পিছনের তাকিয়ে আমার বাবাকে নিয়ে কথা বলি—আমার বাবাকে আমি ‘আব্বা’ বলে ডাকি। আব্বার নাম মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর নামানুসারে নিশ্চয়ই আমার দাদা তাঁর নাম রাখেননি। কারণ আমার দাদা আবদুল হামিদ সরকার পঁচানব্বই বছর আগে ব্রহ্মপুত্র নদী পাড়ে বসে বহু-ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে চিনবার কথা নয়। তবু আব্বার নাম শহীদুল্লাহ ভেবে গর্ববোধই করি। তাঁর সঙ্গে আমার আব্বার অনেক মিলও ছিল। আব্বা তাঁর কথা আমাদের বহুবার বলতেন। বলতেন, তিনি ১৮টি ভাষা জানতেন। অনেক বড় বাঙালি পণ্ডিত। বাংলা ভাষায় তাঁর অবদান বিশাল।

আমার আব্বা একজন শিক্ষক মানুষ। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিশেবে ১৯৮৯ সালে অবসরগ্রহণ করেছেন। সর্বশেষ শিক্ষানরাগী বাবা (আব্বা তাঁর বাবাকে ‘বাজি’ বলে ডাকতেন) হামিদ সরকারের দেওয়া জায়গার উপর গড়ে উঠা শেরপুর জেলার সর্ব-দক্ষিণের গ্রাম চরখারচর সাতানি পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতা জীবনের ইতি টানেন। বিদায় বেলায় তিনি খুব আবেগায়িত ছিলেন। তাঁর সহ-শিক্ষক ও প্রাণপ্রিয় ছাত্র-ছাত্রীদের অশ্রুসিক্ত বিদায়ে তিনিও চোখের টলটলে জল ধরে রাখতে পারেননি। এই সকরুণ মুহূর্তটি সব বিদায়ের ক্ষেত্রেই ঘটে। কারণ মায়া বড়ই কাঁদায়। শিক্ষকতা জীবন শেষ করে সেই বছরই নাড়িপোতা জায়গা ছেড়ে তিনি চলে আসেন নগর ঢাকায়। এই ছেড়ে আসা কতটা সঠিক হয়েছে, কতটা বেঠিক হয়েছে—তার অংক বড় জটিল। আমরা সন্তানরা চেয়েছি, তিনি আমাদের সঙ্গে থাকুন আর তাঁর মন হয়ত পড়ে আছে ছায়াভরা গ্রাম। অথচ গ্রামে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ নেই এবং আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর জীবন চিন্তা করে তিনি ঢাকায় জায়গা-জমি কিনে স্থায়ীভাবে বসবাসের ব্যবস্থা করে দেন। আমরাও আজ গ্রাম ভুলে গেছি।

আব্বার কথা বলতে গেলে ফুরাবে না। কারণ তাঁর বর্ণাঢ্য জীবন, তাঁর সঙ্গে প্রতিদিনের মায়া-ভালবাসা, স্মৃতি সহজেই শেষ হবার নয়। তাঁর ঋণও পরিশোধ করতে পারবো না। জন্মদাতার ঋণ কেউ কোনোদিন পরিশোধ করতে পারেনি, পারবেও না। আজকের এই নষ্ট সময়ে কোনো কোনো ভ্রষ্ট কু-সন্তান নিজের পিতাকে খুনও করছে। এটি কী ভাবা যায়? তবু আমরা দেখছি। শুরুতে যেমনটা বলেছি প্রবীণ সংঘে অসহায় বাবার কথা, সেটিও আমরা দেখছি।

বাবার আঙুল ধরে হাঁটেননি, এমন কোনো সন্তান নেই? দু’ একটি ব্যতিক্রম ছাড়া। আমি কতদিন কতবার আব্বার হাতের শক্ত তর্জনি আঙুলটি ধরে কত পথ অতিক্রম করেছি তার ইয়ত্তা নেই। কতবার তাঁর ঘাড়ে উঠেছি—বায়না ধরে অথবা হাঁটতে হাঁটতে অপারগ হয়ে সেটিরও হিসাব নেই। আমাকে কাঁধে নিয়ে তাঁর অনেক কষ্ট হচ্ছে তারপরও তাঁর কণ্ঠ থেকে গুনগুন গানের সুর বেরুচ্ছে। খেয়াল করতাম আব্বা যখনই হাঁটতেন, তখনই একটি সুর তিনি আওরাতেন। এটি তাঁর নিজস্ব একটি সুর-ধ্বনি। ওই একটিই সুর ছিল তাঁর। তবে মাঝে মাঝে—‘এই সুন্দর ফুল, সুন্দর ফল, মিঠা নদীর পানি…’ আব্বাস উদ্দিন আহমেদের এই গানটি গাইতেন। আসলে ফুল-ফল-পাখি আর নদীর কাছেই কেটেছে তাঁর বহু যুগ। জল-মাটি-কাদার ঘ্রাণ তাঁর চেয়ে কে আর বেশি পেয়েছে? গ্রামের সোঁদা-গন্ধ নিতে নিতে কাটিয়ে দিয়েছেন বেলা। এখন ইট-ক্রংক্রিটের দেয়ালের পাশে শুয়ে থেকে সেই ফেলে আসা দিনগুলোকে বড় বেশি নাড়াচাড়া করেন। ফিরে ফিরে যেতে চান সেই স্মৃতির নদীঘেষা গ্রামে। কিন্তু শরীর-স্বাস্থ্য তাঁকে সায় দেয় না। জানি, এজন্য নিভৃতে তাঁর বুকে হাহাকার হয়। হৃদয়ে বেদনার জল-তরঙ্গ হয়। ওইটুকু হয়ত আমরা দেখি, হয়ত দেখতে পারি না।

আমাদের ব্যস্ততার আড়ালে অবসরপ্রাপ্ত মানুষটি ধীরে ধীরে জীবন সায়াহ্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। আমিও নীরবে মাঝে মাঝে মন খারাপ করি, বেদনাবোধ করি। কিছুই তো করতে পারলাম না জন্মদাতা পিতার জন্য। একবার ঘুরে আসতে চান তাঁর নাড়িপোতা জন্মভিটায়। হৃদয়ের দাগ যেখানে রেখে এসেছেন। এখন অনেকগুলো রোগ তাঁর শরীরে বাসা বেঁধেছে। চিরচেনা গ্রাম ছেড়ে আসার পর থেকেই নীরব চিন্তায় প্রথমে ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হন সু-স্বাস্থ্যবান মানুষটি। টাটকা শাক-সবজি, দুধ-মাছ-মাংস খাওয়া মানুষটি ঢাকায় এসে কৃত্রিম বিষাক্ত-মাখানো খাবার খেয়ে দিন দিন নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছেন। মাইলের পর মাইল হেঁটে মুক্ত বাতাসের শ্বাস নেওয়া মানুষটি বন্দি হয়ে গেছেন চার দেয়ালের মাঝে। শ্রবণ শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন, শ্বাস-কষ্ট, উচ্চরক্ত-চাপ, কিডনির সমস্যা, হার্টের রোগ—এসবের কারণে একগাদা ওষুধে ডুবে থাকেন। অপারেশন করা চোখ দু’টো দিয়েই প্রতিদিন দৈনিক পত্রিকা পড়েন, লেখালেখি করেন, কখনো ধীরে ধীরে পায়চারি করেন, মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়েন। ফেলে আসা নিজ জেলার ইতিহাস নিয়ে একটি বই লিখেছেন—‘শেরপুর জেলার ইতিবৃত্ত’। লিখছেন তাঁর আত্মজীবনী—‘জীবনের অনেক বাঁক’। কুরআন পড়েন। বাকি সময় শুয়ে থাকেন। একবার দেশের বাইরে গিয়েছেন—সৌদি আরবে। হজ্ব পালন করতে গিয়ে সেখানে মরুভূমির বালুর ও আরব সাগরের জল-ঢেউ প্রত্যক্ষ করে এসেছেন। স্মৃতিতে নিজের আবাসভূমি ছাড়া ওইটুকুই।

আব্বা আমার স্বপ্ন পূরণের মূল মানুষ। মা আঙুল উঁচিয়ে চাঁদ দেখাতেন, আব্বা তাঁর বুকে ঘুম পাড়াতেন। যখন থেকে বুঝি, তখন থেকেই আব্বাকে আমি দেখি, আব্বাকে আমি চিনি, আব্বাকে আমি ভালবাসি। আব্বা আমার জীবনের ভূগোল। আমার বেড়ে উঠার বড় আশ্রয়। বড় শক্তি। কত কিছু যে শিখিয়েছেন—তিনি আমার জীবন-শিক্ষক। এখনো বলেন, বাবাÑ সৎ, পরিশ্রমী ও নিষ্ঠাবান হলে জীবনে কোনো দিন কোথাও ঠেকবে না। এই কথা আমার জীবনের শুরু থেকেই শুনে আসছি। অসাধারণ তাঁর স্মরণ শক্তি। বাঙালির ইতিহাস, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাস, পাশ্চাত্যেও ইতিহাস এখনো তাঁর মনে গেঁথে আছে। পড়াশোনায় বেশি এগোতে পারেননি। সে এক করুণ ও বেদনাদায়ক ঘটনা। ১৯৫১ সালে মেট্রিক পাশ করার পর কলেজে ভর্তি হতে পারেননি। একজন শিক্ষক তাঁকে বলেছিলেন, বাড়ি গিয়ে দশ টাকা নিয়ে এসো, ভর্তি করার ব্যবস্থা করে দিবো। মাত্র দশ টাকা জোগাড় হয়নি। ভর্তিও হতে পারেননি কলেজে। গ্রহণ করতে পারেননি উচ্চ শিক্ষা? তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। বড় ও ছোট ভাই কেউই পড়াশোনার ধারে কাছে যাননি। ফলে আমার বাবার সঙ্গে হিংসা ও ঈর্ষা করতেন। সে কেনো মাঝখান থেকে শিক্ষিত হয়ে যাবে?

তাদের ইচ্ছা আব্বাও তাদের মত হাল-চাষ, কৃষিকাজ করবে ও নিরক্ষর থাকবে। যদিও আমার দাদা আব্বাকে দারুণ সহযোগিতা করতেন। আব্বার উপর খুব ভরসা করতেন। আমার দাদাকে হজ্ব করিয়ে এনেছেন আব্বা। তিনি বেঁচে ছিলেন ১০৪ বছর মতান্তরে ১১০ বছর। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আব্বা তাঁর বাবা ও মা’কে নিজের কাছে রেখে সেবা যত্ন করেছেন। অন্য দুই ভাই তেমন ধারে কাছেও আসতেন না। আব্বা ভাইদের এই অসহযোগিতার মধ্যেও দৃঢ় মনোবল ও প্রবল ইচ্ছা শক্তি নিয়ে এগিয়ে গেছেন। উচ্চ শিক্ষা হয়নিÑ এতে কষ্ট পেয়েছেন কিন্তু দমে যাননি। ব্রিটিশ শাসন ও পাকিস্তানি স্বৈর-শাসন দেখে দেখে বড় হয়েছেন এবং পারিবারিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক নানা সংকট ও সমস্যার মধ্যেও নিজের প্রচেষ্টার বিরতি দেননি। মেট্রিক পাসের সার্টিফিকেট নিয়ে নিজের চেষ্টায় যোগদান করলেন মহান পেশা শিক্ষকতায়।

একদিকে সংসার ও অন্যদিকে শিক্ষকতা— এক সঙ্গে চালিয়ে গেলেন দীর্ঘ দীর্ঘ বছর। পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগের বলা যায় অনাধুনিক-অন্ধকার অজগ্রাম— যেখানে সভ্যতার আলো নেই, নদী-বিধৌত অঞ্চলে রাস্তা-ঘাট নেই, বর্ষায় কলা গাছের ভেলা, ডিঙ্গি নৌকা আর শুকনা মৌসুমে পায়ে হাঁটা দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া, মহিষের গাড়ি অথবা গরুর গাড়ি দিয়ে কখনো কখনো গন্তব্যে যাওয়ার কালে এক কঠিন জীবন যাপন করেছেন আমার আব্বা। ভরা বর্ষায় এক সেট জামা হাত রেখে সেই হাত জলের উপরে তুলে ধরে নদী ও বিল সাঁতরিয়ে তীরে উঠতেন এবং শুকনা জামাটি পরে স্কুলে ঢুকতেন। বিকেলে স্কুল শেষে পুনরায় একই কায়দায় বাড়ি ফিরতেন। বাড়ি ফিরেই ডুব দিতেন সংসারের নানা কাজে।

গ্রাম থেকে শেরপুর সদর ছিল প্রায় ১২ থেকে ১৪ মাইল। মাসে দু’ একবার তাঁকে অফিসের ও ব্যক্তিগত কাজে যেতে হতো। পায়ে হেঁটেই যেতে আসতেন। খুব ভোরে ফজরের নামাজ পড়েই সদরের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতেন। শহরে গিয়ে হয়ত একটা-দুইটা রুটি দিয়ে নাস্তা সেরে দুপুরের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করে বাড়ির দিকে রওনা দিতেন। কোনো কোনো দিন আসতে রাত হয়ে যেতো। আমরা চার ভাই ঘুমাতাম না। জেগে থাকতাম আব্বার জন্যে। মাঝে মাঝে আমাদের জন্য শহর থেকে কিছু খাবার অথবা নতুন জামা-কাপড় নিয়ে আসতেন। সে সব পেয়ে আমরা খুশিতে বাগ বাগ হয়ে যেতাম। আব্বা আমাদের উদ্দেশ্যে বলতেন, বাবারা ভাল করে পড়াশোনা করতে হবে, মানুষেন মত মানুষ হতে হবে। গ্রামে আমাদের সম-বয়সী অন্যান্যদের থেকে তিনি একটু আলাদা করে রাখার চেষ্টা করতেন, কারণ তারা অধিকাংশই স্কুলগামী ছিল না। মিশতে দিত, তবে প্রয়োজনে। বুঝাতে চাইতেন সঙ্গ দোষে আমরা যেন আক্রান্ত না হই। তো আমরা সেভাবেই বেড়ে উঠতে লাগলাম। গ্রামের পাঠ চুকিয়ে শহরমুখী হতে লাগলাম।

নদী-জল-হাওয়া আর মাটির ঘ্রাণে এক সময় পাগল মানুষ ছিলেন আমার আব্বা। ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদী, দশানি নদী, বেতমারি বিলের জল তাঁর চিরচেনা দৃশ্যপট ও নিত্যসঙ্গী। কাদামাটি, ধুলোবালি, বাঁশঝাড়, শনক্ষেত, ধান-পাট-কলাই-সরিষা-তিল-তিশ্বি ক্ষেত তাঁর চোখের কোটরে খেলা করত। অনাধুনিক গ্রাম হলেও স্বীকার করতে হবে প্রকৃতি আর নিসর্গের মিলনমেলা ছিল নদী তীরের সেই অঞ্চল। নদীতে নিয়ে গিয়ে এক এক করে আমাদের চার ভাইকে সাঁতার শিখিয়েছেন তিনি। তাঁর সঙ্গে সাঁতার কাটতে, মাছ ধরতে নদীতে নামতাম। নানা পদ্ধতিতে মাছ ধরার কলা কৌশলও শিখাতেন। হাট-বাজারে নিয়ে যেতেন। গাছের পরিচর্যা করাতে শিখাতেন। আমাদের মনে আছে, বাড়ির আশে-পাশে প্রায় পঞ্চাশ জাতের ফল-ফলান্তির গাছ তিনি লাগিয়েছিলেন। কী যে অদ্ভুত সেই ফল খাওয়ার অভিজ্ঞতা? পেয়ারা, আম, জাম, কাঁঠাল, করমচা, লেবু, জলপাই কত রকমের যে ফলগাছ থেকে পেড়ে নিজ হাতে খাওয়াতেন। টাটকা শাক-সবজি, ফল-মূল খেয়ে খেয়ে বড় হয়েছি। নিজেরা খেয়ে শেষ করতে পারতাম না। আব্বা বিলাতেন পাড়া-পড়শি ও আত্মীয়-স্বজনের কাছে। গরিব এলাকার অনেক মানুষ যারপর নেই খুশি হতো।

আব্বা সারা জীবন পরিশ্রম ও কষ্ট করেছেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কি পেয়েছেন, কি পাননি, এই অংক হয়ত কষেণ নি? অবশেষে ৯২ বছরের জীবন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তলোকে। ঘুমিয়ে আছেন তাঁর জন্মগ্রামের নিজ ভূমিতে। আমি চিণ ফিরে তাকালেই আব্বাকে দেখি। এই স্মৃতির রেখায় আব্বাকে নিয়ে লিখি একটি কবিতা:

বাবা
বাবা, তোমাকে আশ্রমের গাছের দিকে
তাকাতে দেইনি—চেয়েছি বুকের পাশেই থাকো
তুমি নিজেই বেছে নিয়েছো—দেয়ালঘেরা কুঁজো ঘর?
বলেছো, এই বন্ধনযুক্ত কক্ষেই কাটুক বেলা—শেষের দিনগুলো

বাবা, তুমি ভাল করেই জানো
ক্যালেন্ডার দেখে দেখে জীবন চলে না
কিন্তু—স্বপ্নগুলো লুকিয়ে থাকে
তুষকের নিচে, বালিশের সাদা কভার
মশারির ঘোরলাগা, সুতার ঘূর্ণিপাক
লেখার ছোট্ট টেবিল, ডায়রির পাতায়
আর বলপেনের কালিযুক্ত নিপে—
এরপর ভয়েড, গ্যারেজ—তারপর কালো রাস্তা
তুমি সেই চার নং রোড ধরে—কখন যে
ঘুরতে ঘুরতে চলে গেছো, কখন?
কেউ তা টের পায়নি…
এই যাওয়ায় তোমার নস্টালজিক কাগজ উড়েছে!

বাবা, তুমি এরইমধ্যে—হেঁটে ফেলেছো তরমুজক্ষেত
তারপর দাঁড়িয়েছো লাউয়ের জাংলার পাশে
তোমার চোখ ভরে গেছে মাঘের মিষ্টি আলোয়
আমি তোমার কাঁধে উঠার জন্য ছটফট করছি
তুমি বললে, উঠ—
তোকে মাছেরঘের দেখাইয়া আনি…এ যেন
সুনীলের তিন প্রহরের বিল দেখানোর মতই
তারপর—ঘুঘুর কালো চোখ, আমের হলুদ বৌল
মাগুর মাছের ছটফটানি, সন্ধ্যার কেরোসিন বাতি
এসব দেখিয়ে বললে—এবার নেমে যা বাবা
ঐ ধূলিপথ ধরে দৌড় দে—
সামনে পাবি—ঘন বালু, ব্রহ্মপুত্র, গঞ্জের গন্ধ
পাবি—ট্রেন রেললাইন…

বাবা, নগরের নাভি খুব চওড়া
এর উত্তাপ তুমিও নিচ্ছ—নাকে সরিষার তেল নেয়ার মতো
আমাদের দীর্ঘ শুয়ে থাকা—ক্রমশ ঘারের ব্যথা বাড়ছে
বলেছিলে বই, ফল আর নদী তোকে তাজা রাখবে
আমি প্রতিদিন তোমারে স্নেহের আঙুলে
হাতপাখার হাওয়া দিতে চাই—বাবা

বাবা, তুমি কী আমার মন খারাপ করে দিবে?
বলবে না আর—এই মিঠা নদীর পানি…


শিহাব শাহরিয়ার | ঢাকা, বাংলাদেশ

কবি, ফোকলোর গবেষক, প্রাবন্ধিক, সম্পাদক, কলামিস্ট, উপস্থাপক। সম্পাদনা করছেন লোকনন্দন বিষয়ক পত্রিকা ‘বৈঠা’। তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ৩১টি।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

শিরোপার লড়াই সমীকরণ
Previous Story

ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ – শিরোপার লড়াই এবং কিছু সমীকরণ

বাবা
Next Story

বাবা

Latest from সমসাময়িক বিষয়

বাবা

বাবা

পরিবারের বটবৃক্ষ হিসেবে পিতার নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও নীরব আত্মত্যাগের মর্মস্পর্শী বিশ্লেষণ ফুটে উঠেছে ঝর্ণা ভট্টাচার্য্যের প্রবন্ধ 'বাবা'-তে।

মাদার্স ডে

সকালে চোখ খুলে মোবাইলে টাইমটা দেখে হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়ল সুচেতনা। সাতটা বেজে গেল আজ। কি করে সামাল দেবে... ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য-এর রচনায় একজন নারী বিভিন্ন

মা; এক অনন্ত কবিতা

'প্রতিদিনই মায়ের জন্যে। প্রতিদিনই মা-দিবস। আলাদা করে এই দিবস পালন করার কোনও যৌক্তিকতা দেখি না' ... রিমি রুম্মান লিখেছেন মা শব্দের ব্যাপকতা ও তাঁর

আমার ঠাকুমা, অন্তরঙ্গ প্রমীলা নজরুল ইসলাম

দাদুকে নিয়ে অনুষ্ঠান করতে আনন্দিত উচ্ছসিত হয়ে আমেরিকায়  এসেছিলাম ২০১৬ সালে দাদুকে ধারণ করে, তাঁর সৃষ্টি... অনিন্দিতা কাজী লিখেছেন তার দাদুকে নিয়ে।