এ বছর এপ্রিল মাস তথা বাংলা বৈশাখ মাস থেকে ‘পড়শী’ আবার প্রকাশিত হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগে পড়শী’র সম্পাদক শ্রদ্ধেয় সাবির মজুমদার ভাইয়ের কাছ থেকে একটি মেসেজ পেলাম। অসম্ভব ভালো একটি খবর। এ সংবাদ পেয়েই তার সঙ্গে ফোনে কথা হলো— তাকে অভিনন্দন জানালাম এবং এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানালাম। জানলাম পড়শী পরিবারের অনেক পুরনো সদস্যদের সঙ্গে বেশ কিছু নতুনদের নিয়ে নতুন উদ্যমে আবার যাত্রা শুরু করছে বিশ্ব বাঙালির মুখপত্র— ‘পড়শী’।
পড়শী’র সাথে আমার পরিচয় যত দূর মনে পড়ে— ২০০৪ সাল থেকে। প্রথম দিকে আমি যেখানে থাকি অর্থাৎ অ্যারিজোনার বাংলাদেশী কমিউনিটির খবরা-খবর নিয়ে রিপোর্টিং করতাম। সাবির ভাই আর হাসান ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়তে থাকে। একসময় তারা জানতে পারেন যে, আমি অ্যারিজোনায় একটি বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত এবং সেই বাংলা স্কুল প্রতিষ্ঠার কারনে প্রবাসের বিভিন্ন দেশের বাংলা স্কুলের সাথে আমি যোগাযোগ করেছিলাম। তাদের বিশেষ অনুরোধে ২০০৫ সালে আমি পড়শী’র একটি সংখ্যার প্রচ্ছদকাহিনী ‘প্রবাসে বাংলা স্কুল’-এর অতিথি সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলাম। সেটি হয়তো ভালোভাবে করতে পেরেছিলাম বিধায় পরবর্তীতে আরো দুই-তিনটি সংখ্যার অতিথি সম্পাদকের দায়িত্ব আমাকে দেয়া হয়েছিল। সেই সূত্রে— তখন পড়শী’র অনেক নিয়মিত লেখকদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল যেমন— নাজমুস সাকিব, বেলাল বেগ, দলিলুর রহমান, মিনহাজ আহমেদ, ফেরদৌস আহমেদ, রানু ফেরদৌস, নাহিদ রিয়ানন সহ আরো অনেকে। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে পড়শী’র নিয়মিত দু’টি বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্বও কাঁধে এসে পড়েছিল— ‘উত্তর আমেরিকা কর্মকাণ্ড’ এবং ‘পাঠকের মতামত।’
সে সময় সবার লেখা আসতো হাতে লেখা ইমেইল বা ফ্যাক্সের মাধ্যমে, সেগুলো কম্পোজ (টাইপ) করতে হতো। এখনকার মতো ভালো বাংলা লেখার সফটওয়্যারও ছিল না। সেটি ফ্যাক্স করে পড়শী’র সম্পাদকদের পাঠাতে হতো। তারা সেটি আবার কম্পোজ করে ফাইনাল করার আগে আবার প্রুফরিড মার্ক করে ব্যাক-এন্ড-ফোর্থ কয়েকবার পাঠাতে হতো এবং শেষে বাংলাদেশ থেকে পড়শী প্রিন্ট হয়ে আসতো আর আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতাম। পড়শী’র প্রতিটি সংখ্যা এরকম অনেক স্বেচ্ছাসেবকদের পরিশ্রমের ফসল ছিল।
পড়শী’র সাথে সেই সময়টা খুব উপভোগ করেছি। একসময় পড়শী’র সাবস্ক্রিপশন মার্কেটিং পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ঠিক হয় পড়শী’তে বিভিন্ন সংখ্যায় উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাঙালিদের অভিবাসনের ইতিহাস এবং কর্মকাণ্ড তুলে ধরা হবে— দরকার হলে দুইটি সংখ্যায়। এবং সেই সংখ্যা দু’টিতে ঐ শহরের বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের অবদান, লেখা, গল্প, কবিতা, আঁকা ছবি ইত্যাদি তুলে ধরা হবে এবং সংখ্যা দু’টি ঐ শহরের একশটি বাঙালি পরিবারকে বিনামূল্যে উপহার দেওয়া হবে। পড়শী’র সম্পাদকরা ঠিক করলেন এই মার্কেটিং স্ট্র্যাটেজিটি তারা পরীক্ষামূলকভাবে ফিনিক্স শহরের বাংলাদেশী কমিউনিটি দিয়ে শুরু করবেন এবং আমাকে সেই সংখ্যা দু’টির অতিথি সম্পাদক হতে হবে। সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম।
সে দু’টি সংখ্যার প্রচ্ছদকাহিনী সম্পাদনা করতে গিয়ে মনে আছে— আমার ফিনিক্সের অনেক পুরনো বাংলাদেশীদের সাক্ষাৎকার নিতে হয়েছিল। শহরের অনেক সুপ্ত লেখকদের সন্ধান পেলাম। দু’টি সংখ্যার প্রচ্ছদ এঁকেছিলেন আমাদের শহরেরই দুইজন শিল্পী। সে সুবাদে ফিনিক্সের বাংলাদেশীদের অভিবাসনের ইতিহাস আমার জানা হয়ে গেল এবং সেটি আরো অনেককে পড়শী’র মাধ্যমে জানাতে পেরেছিলাম।
ঐ দশকের শেষের দিকে হঠাৎ পড়শী’র প্রিন্টেড ভার্সন থেকে শুধুমাত্র অনলাইন ভার্সনে চলে গেল। খারাপ লেগেছিল। এখনো পড়শী’র সকল প্রিন্টেড সংখ্যাগুলো আমি যত্নে রেখে দিয়েছি। বছরখানেক পরে একসময় পড়শীর অনলাইন ভার্সনটিও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। পড়শী’র মতো একটি উচ্চমানসম্পন্ন পত্রিকা এভাবে বন্ধ হয়ে যাবে— ভাবতে খারাপ লেগেছিল। সম্পাদকদের সাথে তখন কথা বলেছিলাম। কিন্তু বিভিন্ন কারণে তারা সেটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।
অ্যারিজোনাতেও ২০০৩ সাল থেকে আমি একটি বার্ষিক সাহিত্য পত্রিকা ‘সিঁড়ি’-এর সাথে জড়িত। আমরা সেটি পাঁচ বছর টানা প্রকাশ করার পর ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার কারণে পত্রিকাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। তখন খুব খারাপ লেগেছিল। কিন্তু পনেরো বছর পর আমরা ২০২৩ সাল থেকে নতুন উদ্যমে আবার নিয়মিত ‘সিঁড়ি’ প্রকাশ করা শুরু করতে পেরেছি। কাজেই প্রায় পনেরো বছর পর নতুন উদ্যমে আবার পড়শী’র পুনর্জন্মের খবর আমাকে সত্যিই অনুপ্রাণিত এবং আশাবাদী করছে।
আশা করি, নিকট ভবিষ্যতে কোনো একসময় হয়তো পড়শী’র নতুন এই যাত্রার সাথে আবারও সম্পৃক্ত হতে পারব। পড়শী’র এই নতুন যাত্রায় শুভকামনা রইলো।

শেখ ফেরদৌস শামস (ভাস্কর) | ফিনিক্স, অ্যারিজোনা, যুক্তরাষ্ট্র
প্রকৌশলী, স্বেচ্ছাসেবক এবং কমিউনিটি সংগঠক। বাংলাদেশ থিয়েটার অব অ্যারিজোনা ও শিকড় বাংলা স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। আদি পড়শী’র একজন নিয়মিত পাঠক, লেখক ও বিভাগীয় সম্পাদক।
