আপনি কি সত্যিই সুস্থ? — অদৃশ্য অসুস্থতার গল্প

মুন ইরা মীম | মার্চ ২৫, ২০২৬
April 16, 2026

আপনি কবে শেষবার ভেবেছেন— “আমি সুস্থ”?

হয়তো এই কিছুক্ষণ আগেই। কারণ আপনার জ্বর নেই, ব্যথা নেই, আপনি কাজ করতে পারছেন। তাহলে সাধারণ বোধ বলছে আপনি সুস্থ, তাই না? কিন্তু বিজ্ঞান বলছে— এটা সবসময় সত্য না।

অসুস্থতা সবসময় আওয়াজ করে উঁকি দেয় না। আমরা সাধারণত অসুস্থতা বুঝি লক্ষণ দিয়ে— ব্যথা, জ্বর, দুর্বলতা। কিন্তু শরীরের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো শুরু হয় নিঃশব্দে। এদিকে রক্তে চিনি বাড়ছে, আপনি টের পাচ্ছেন না। লিভারে চর্বি জমছে অথচ কোনো ব্যথা নেই, রক্তচাপ বাড়ছে, কোনো অ্যালার্ম বাজছে না। অর্থাৎ শরীর ভাঙতে শুরু করে, অনেক আগেই। তাই যা দৃষ্টির অগোচরে আছে তা যে একেবারেই অদৃশ্য তা কিন্তু নয়।

“প্রি-ডায়াবেটিস”! এ হলো অপেক্ষার ঘর। ডায়াবেটিস হঠাৎ করে হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার ৫–১০ বছর আগে থেকেই শরীরের ভেতরে পরিবর্তন শুরু হয়। এ সময়টাকে বলা হয় প্রি-ডায়াবেটিস। সমস্যা হলো এই পর্যায়ে বেশিরভাগ মানুষের কোনো লক্ষণ থাকে না। আপনি স্বাভাবিক জীবন চালাচ্ছেন, কিন্তু আপনার শরীর ধীরে ধীরে ইনসুলিনের প্রতি প্রতিরোধী হয়ে উঠছে। একইভাবে “ফ্যাটি লিভার”! যেখানে ব্যথা নেই, কিন্তু ঝুঁকি আছে। বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বাড়তে থাকা সমস্যাগুলোর একটি হলো ফ্যাটি লিভার। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা একদমই কোনো উপসর্গ অনুভব করেন না। নিয়মিত চেকআপ না করলে ধরা পড়ে না। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটি লিভারের ক্ষতি, এমনকি সিরোসিস পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।

অর্থাৎ আপনি ভালো আছেন মনে করলেও, আপনার লিভার হয়তো তা মনে করছে না। আবার যেমন উচ্চ রক্তচাপ! একে “silent killer” এমনি বলা হয় না। কারণ এটি দীর্ঘদিন কোনো লক্ষণ ছাড়াই থাকতে পারে। এই সময়ের মধ্যে রক্তনালীগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, হৃদপিণ্ডে চাপ পড়ে, স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। আপনি হয়তো শুধু মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা অনুভব করছেন। কিন্তু ভেতরে অনেক বড় পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে।

বর্তমান যুগে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো ঘুমের অভাব। এ যেনো পুরোটাই অদৃশ্য ক্ষয়। আমরা ঘুমকে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু মাত্র কয়েক রাত কম ঘুম ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়, ক্ষুধা বাড়িয়ে দেয়, ওজন বাড়ার ঝুঁকি তৈরি করে, মস্তিষ্কের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমায়। অর্থাৎ ঘুমের অভাব সরাসরি আপনার শরীরের প্রতিটি ক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। আর মানসিক অসুস্থতার অন্যতম উদাহরণ হলো স্ট্রেস। এক্ষেত্রে তা আপনি অনুভব করেন, কিন্তু মাপেন না। দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ বা ক্রোণিক স্ট্রেস শরীরের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। কর্টিসল হরমোন দীর্ঘসময় বেশি থাকলে রক্তে গ্লুকোজ বাড়ে, ইমিউন সিস্টেম দুর্বল হয়, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে বড় কথা হলো স্ট্রেসকে আমরা “স্বাভাবিক” মনে করি।

অথচ সমস্যা রোগ না, সমস্যা অজানা থাকা। এই সবকিছুর মধ্যে একটি সাধারণ বিষয় আছে— এগুলো শুরু হয় নিঃশব্দে, এগুলো বাড়ে ধীরে ধীরে এবং আপনি জানতেই পারেন না। অর্থাৎ আপনি অসুস্থ নন, কারণ আপনি জানেন না আপনি অসুস্থ। তাহলে এর সমাধান হিসেবে আপনার জানা উচিৎ যে এমন সব অবস্থাকে অবহেলা করারও সুযোগ নেই। কিছু সহজ কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ… যেমন বছরে অন্তত একবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা, নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম (প্রতিদিন ৩০ মিনিট হাঁটা), পর্যাপ্ত ঘুম (৭–৮ ঘণ্টা), প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানো, স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই বড় রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

স্বাস্থ্য মানে শুধু “অসুস্থ না থাকা” না। স্বাস্থ্য মানে শরীরের ভেতরের সবকিছু সঠিকভাবে কাজ করা। আপনি আজ যেভাবে জীবনযাপন করছেন, তা হয়তো আগামী ১০ বছরের শরীর তৈরি করছে। আপনার কাছে আমার প্রশ্নটা সহজ- আপনি কি সত্যিই সুস্থ, নাকি শুধু এখনও অসুস্থ হননি?


মুন ইরা মীম | আইডাহো, ইউএসএ

মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে অধ্যয়নরত। সঙ্গীত, আবৃত্তি, নাচ, বিতর্কের পাশাপাশি লেখালেখির চর্চাও ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠায় বিজ্ঞানের পাশাপাশি শিল্পকলায় ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।

Previous Story

ভালোবাসা ৩.০ : একাকীত্ব, প্রযুক্তির সঙ্গ ও পে-ওয়াল

Next Story

প্রবাসে সাহিত্য চর্চা