পেছনে ফিরে দেখা

পেছনে ফিরে দেখা: ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলন

আনিস আহমেদ
June 16, 2026
23 views
40 mins read

এই জুন মাসটি বাংলাদেশের ইতিহাসের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  মাস। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান প্রণীত ৬-দফা প্রস্তাবের সমর্থনে এই জুন মাসেই সংঘটিত হয় এক তীব্র আন্দোলন। প্রতি বছর ৭ই জুন বাংলাদেশে ‘৬ দফা দিবস’ পালন করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন ৬ দফা দাবির পক্ষে দেশব্যাপী তীব্র গণ-আন্দোলনের সূচনা হয়। এই দিনে আওয়ামী লীগের ডাকা হরতালে টঙ্গী, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ ও ইপিআরের গুলিতে মনু মিয়া, শফিক, শামসুল হক, মুজিবুল হক সহ মোট ১১ জন বাঙালি নিহত হন। ছয় দফা আন্দোলনে প্রথম নিহত হয়েছিলেন সিলেটের মনু মিয়া।

ছয় দফা মূলত স্বাধীনতার এক দফা ছিল। ছয় দফার মধ্যেই স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল। কাজেই কেউ কেউ যখন অর্বাচিনের মতোই প্রশ্ন তোলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর কতটুকু  ভূমিকা ছিল? কিংবা এমন কথা বলতেও দ্বিধা বোধ করেন না যে পাকিস্তান যদি তাঁকে প্রধানমন্ত্রীত্ব দিয়ে দিতো তা হ’লে তো তিনি আর বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাইতেন না। তাঁরা হয়ত ভুলে যান যে সত্তুরের নির্বাচনের পর ঢাকায় এসে ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্বোধন করেছিলেন কিন্তু তার পরও পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য মূলতবি করার ফলে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার যখন অনিশ্চিত হয়ে গেল, তখন ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু স্পষ্ট কন্ঠে বলেছিলেন, “আমি প্রধান মন্ত্রীত্ব চাই না, আমি এ দেশের মানুষের অধিকার চাই”। এ সেই অধিকার যার জন্য বঙ্গবন্ধু সংগ্রাম করেছেন, জীবনের একটি বড় সময় জেলে কাটিয়েছেন। আর এই অধিকার তাঁর ঘোষিত ছয়-দফা প্রস্তাবে পরিস্কার ভাবে প্রতিধ্বণিত হয়েছে।  

ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির জন্য  মুক্তির সনদ বা ম্যগনা কার্টা। ছয় দফার মধ্যে আমাদের স্বাধীনতার বীজ নিহিত ছিল।যাঁরা এখন বলেন যে মুক্তিযুদ্ধে কিংবা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর কোন অবদান নেই, তাঁরা ভুলে যান যে এই ৬ দফা না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হতো না। ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে বঙ্গবন্ধু ৬ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যাকে পাকিস্তানিরা প্রধানত প্রত্যখ্যান করে, এর পরই  ৬ দফাকে কেন্দ্র করে একদিকে আন্দোলনের সূচনা হয়, অন্যদিকে বঙ্গবন্ধুর উপর নিপীড়ন-নির্যাতন বেড়ে যায়। ১৯৬৬ সালে ২১শে এপ্রিল তাঁকে ঢাকায় গ্রেপ্তার করা হয়। শেখ মুজিবকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে ৯ই মে তাঁকে আবার গ্রেপ্তার করা হলো পাকিস্তান প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে। তদানীন্তন শাসক শ্রেণী তাঁকে ও তাঁর সহকর্মীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও ভারতের দালাল বলে আখ্যায়িত করলো্। কিন্তু সব ধরণের দমন-নিপীড়নকে অস্বীকার করে ১৯৬৬ সালের ৭ই জুন জনতা রোষে ফেটে পড়লো। ঢাকা শহরে ব্যাপক আন্দোলন ঘটে গেল। এই আন্দোলনকে দমন করতে, নিরস্ত্র মানুষের মিছিলের উপর সশস্ত্র পুলিশ আক্রমণ চালালো, প্রাণ হারালেন কয়েকজন। তবু মানুষ থাকলো বঙ্গবন্ধু প্রণীত ৬ দফার প্রতি নিরাপোষ।

দফাগুলো ছিলো:

১. পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাধীন সংসদীয় পদ্ধতির সরকার। সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটে নির্বাচন অনুষ্ঠান।

২. কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মাত্র দুটি বিষয় থাকবে—প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্য সব বিষয়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে।

৩. সারা দেশে হয় অবাধে বিনিয়োগযোগ্য দুই ধরনের মুদ্রা, না হয় বিশেষ শর্ত সাপেক্ষে একই ধরনের মুদ্রা প্রচলন করা।

৪. সব ধরনের কর ধার্য করার ক্ষমতা থাকবে আঞ্চলিক সরকারের হাতে। আঞ্চলিক সরকারের আদায় করা রাজস্বের একটা নির্দিষ্ট অংশ কেন্দ্রীয় সরকারকে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে।

৫. অঙ্গরাজ্যগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে। এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে।

৬. অঙ্গরাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা সামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া।

ছয় দফা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিকসহ সব অধিকারের কথা তুলে ধরে। আইয়ুব খান সরকার ৬ দফাকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মসূচি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। এতে প্রত্যক্ষভাবে স্বাধীনতার কথা বলা না হলেও এই ৬ দফা কর্মসূচি বাঙালিদের স্বাধীনতার মন্ত্রে গভীরভাবে উজ্জীবিত করে। এটি ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।

শেখ মুজিব তখনও পাকিস্তানে প্রতিরক্ষা আইনের অধীনে কারারুদ্ধ। বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহানের প্রস্তুত করা ৬-দফা প্রস্তাবে এমন কিছু ধারা ছিল যা প্রকৃত পক্ষেই অভিন্ন পাকিস্তান রক্ষার জন্য একটা বড় রকমের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই প্রস্তাবে বাঙালির জন্য যে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার দিক দর্শন ছিল, সে কথা মানতে পারেনি তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসক শ্রেণী, মানতে পারেনি এমন কী পশ্চিম পাকিস্তানের কথিত উদারপন্থি দলগুলিও। অথচ বাংলাদেশে ৬-দফা প্রস্তাবের পক্ষে আন্দোলন গড়ে ওঠে এবং তা অব্যাহত থাকে সত্তুরের নির্বাচন পর্যন্ত। নির্বাচনী ইস্তেহারে মূল স্থান পায় এই ৬-দফা। বস্তুত বঙ্গবন্ধু ছিলেন একজন বিচক্ষণ রাজনীতিক, তিনি জানতেন যে পাকিস্তান সরকার কখনই ছয় দফা মেনে নেবে না, তা সত্ত্বেও তিনি ৬-দফাকেই তাঁর নির্বাচনী ইস্তেহারে অন্তর্ভূক্ত করেছিলেন। এই ছয়-দফার ভেতরেই নিহিত ছিল স্বাধীনতার ডাক, ছয় দফাই ছিল মুক্তির সনদ।

১৯৬৬ সাল থেকেই তদনীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে প্রতিবাদ শুরু হয়, ছয় দফা প্রস্তাবকে অগ্রাহ্য করার বিরুদ্ধে। তবে সেই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ আরও অনেক তীব্র হয়ে ওঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করায়। সেই সময়ে, বিশেষত ইত্তেফাক পত্রিকায়, এই মামলার প্রতিদিনের বিবরণী প্রকাশিত হতো এবং তাতে এ রকমটি প্রায় নিশ্চিত হয়ে উঠেছিল যে তাঁর বিরুদ্ধে আরোপিত কথিত দেশদ্রোহিতার জন্য তাঁকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হতে পারে। শেখ মুজিব কিন্তু একটুও শংকিত ছিলেন না, সামান্যতম ও মনোবল হারাননি। যারাই তাঁর সঙ্গে  দেখা করতে গিয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে তিনি নির্ভয়ে তাঁর সংগ্রাম অটুট রাখার কথা জানান। আটষট্টি  সাল পেরিয়ে উনসত্তুর সালে গণ অভূত্থান শুরু হয় যা ছিল মূলত তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অভিন্ন আন্দোলন। এতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় আওয়ামী পার্টি ও পূর্ব পাকিস্তান কমিউন্স্টি পার্টি এবং তাদের শিক্ষার্থী শাখা ও সাংস্কৃতিক শাখাসমুহ, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের নিপীড়নমুলক সামরিক সরকার ও রাজনৈতিক দমন নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। কবি, লেখক, সঙ্গীত শিল্পী, অভিনেতা-অভিনেত্রীর সম্মিলিত দাবি ছিল আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করে শেখ মুজিবর রহমানসহ সকল বন্দির নিঃশর্ত মুক্তি। আন্দোলনকে বেগবান ও সর্বদলীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালের ৫ই জানুয়ারি সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করা হয়। এই আন্দোলন যে উত্তাল উচ্চতায় পৌঁছায় তাতে পাকিস্তান সরকার কথিত আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। ২২শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আটক থাকা শেখ মুজিবর রহমান মুক্তি পান। পরের দিন,  ২৩শে ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবর রহমানকে গণ-সম্বর্ধনা দেওয়া হয় সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে (তদানীন্তন রেসকোর্স ময়দানে) এবং সেখানে ছাত্র নেতা তোফায়েল আহমেদ তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধিতে ভূষিত করলেন। সেই থেকে শেখ মুজিবর রহমান আমাদের সকলের কাছে বঙ্গবন্ধু নামে পরিচিতি লাভ করেন এবং তাঁর অবিরাম সংগ্রামের জন্য তিনি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের কাছে সম্মান ও শ্রদ্ধার মানুষ হয়ে ওঠেন।

আইয়ুব খানের পতনের পর, ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক শাসক হিসেবে ক্ষমতা কুক্ষিগত করলেন বটে কিন্তু ইয়াহিয়া ও তার সাঙ্গ-পাঙ্গরা এটা বুঝতে পারছিলেন যে এবার পাকিস্তানে একটি সাধারণ নির্বাচন দিতেই হবে। পাকিস্তানের সামরিক শাসক ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বর পাকিস্তানে সাধারণ নির্বাচনের ঘোষণা দিল। কিন্তু তারা এটা অনুধাবন করতে পারেনি যে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের যে বিপুল জনপ্রিয়তা অবিচ্ছিন্ন অনুভূতির জন্ম দিয়েছে তাতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা সম্ভব নয়।পূর্ব পাকিস্তানে এই নির্বাচন নিয়ে সন্দিহান ছিলেন কেউ কেউ। মাওলানা ভাসানী দিয়েছিলেন ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ শ্লোগান কিন্তু তাতে বাঙালী তেমন কর্ণপাত করেনি। বঙ্গবন্ধু জানতেন ভোটে জয়লাভ করলে ভাতের ব্যবস্থাও নিশ্চিত হবে। বঙ্গবন্ধুও নির্বাচনে তাঁর দলকে নিয়ে যাওয়ার জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত ছিলেন। ‘এর কারণ এ নয় যে তিনি পাকিস্তানের  প্রধানমন্ত্রী হতে উদগ্রীব ছিলেন কারণ তিনি জানতেন পাকিস্তানিরা কখনই বাঙালীদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা ছেড়ে দেবে না। বাঙালীর হাতে রয়েছে ৬-দফা প্রস্তাব যা বাহ্যত বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসনকে (প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতাকে) সুনিশ্চিত করবে। ৬-দফা  সম্পর্কে পাকিস্তানের সামরিক সরকার অবগত ছিল কিন্তু তারা ভেবেছিল মুজিব নির্বাচনে যদি জয়লাভ করেন, তা হলে তিনি সম্ভবত ক্ষমতায় যাবার জন্য আপোস করবেন। পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৯৭০-এর নির্বাচনের আগে ইয়াহিয়া খানের সামরিক প্রশাসন Legal Framework Order (LFO) জারি করে। বঙ্গবন্ধু যে সব কিছুকে পাশ কাটিয়ে সত্তুরের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন তার প্রধান কারণ তাঁর ৬-দফা প্রস্তাব বাস্তবায়নের দাবিকে বৈধতা প্রদান। ১৯৭০ সালের ৭ই ডিসেম্বরের নির্বাচনে তদনীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত ১৬৯টি আসনের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে।

পাকিস্তানের টনক নড়ে। বাঙালীদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে তারা দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পড়ে যায়। ডিসেম্বরে নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর, তারা পরের বছর মার্চ মাসে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকে আর তাতেই বোঝা যায় যে বাঙালীর এ বিপুল বিজয়ে তারা শঙ্কিত, বাহ্যত নানান কারণে অধিবেশন আহ্বান করাতে এই বিলম্ব। কিন্তু নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করলেন যে আগে এটা ঠিক করতে হবে যে ৬ দফার ব্যাপারে তাঁর নিজের দলের কেউ যেন কোন রকম আপসের পক্ষে না যায়। অতীতে, ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করার আগে, বেসামরিক সরকার পতনের পেছনে দলীয় আনুগত্য পরিহার করে সংসদে অন্য দলে ভিড়ে যাওয়ার ঘটনা দায়ী ছিল। বঙ্গবন্ধু সেই অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে এসেছিলেন। তিনি ১৯৭১ সালের  ৩রা জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে (তদানীন্তন রেস কোর্স ময়দানে) জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সকল নব-নির্বাচিত সদস্যকে নিয়ে একটি জনসভার আয়োজন করেন। বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশ্য ছিল জনতার সামনে এদেরকে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করা যে তারা যেন কোন ক্রমেই, কোন প্রলোভনেই ৬-দফা প্রস্তাবের বিষয়ে আপোষ না করেন। এই প্রস্তাবের সঙ্গে অবশ্য শিক্ষার্থীদের ১১ দফা প্রস্তাবও সংযোজিত ছিল। তিনি এটিও পরিস্কার করে বলেন যে ৬-দফা প্রস্তাব তাঁর নয়, আওয়ামী লীগেরও নয়, প্রস্তাবটি বাংলাদেশের জনগণের। এই শপথবাক্য পাঠ করানোর মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে জনগণকে নিয়ে গেলেন।

অস্বাভাবিক রকমের বিলম্ব করে প্রথমে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকা হয় ৩রা মার্চ ঢাকায় যদিও প্রথমে আওয়ামী লীগ জানিয়েছিল এই অধিবেশন ১৫ই ফেব্রুয়ারি ডাকা হোক। তবে বঙ্গবন্ধুকে জানানো হয় যে ভূট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টির ইচ্ছা অনুযায়ী অধিবেশন ডাকা হচ্ছে ৩রা মার্চ।  আওয়ামী লীগের তরফ থেকে এই অধিবেশনে যোগদানের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়; এমনকী পশ্চিম পাকিস্তান থেকেও কিছু সদস্য এই অধিবেশনে যোগ দিতে ঢাকায় এসে পৌঁছান। হঠাৎ ১লা মার্চ দুপুর ১টার দিকে রেডিও পাকিস্তানের এক ঘোষণায় জানানো হয় যে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এই ঘোষণা জেনারেল ইয়াহিয়ার কন্ঠে নয়, বরঞ্চ রেডিওর এক ঘোষকের কন্ঠে প্রচার করা হয়। ড. কামাল হোসেন তাঁর বই Bangladesh Quest for Freedom and Justice-এ জানান যে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর এসএম আহসানের মাধ্যমে জানানো হয় যে অধিবেশন স্থগিত করা হলে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। ৭ই মার্চ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সেই ঐতিহাসিক ভাষণ দেন যার পরিপূর্ণ ভাষাতাত্বিক বিশ্লেষণ রয়েছে আমার একটি লেখায়। পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান একতরফা ভাবে অনির্দিষ্ট কালের জন্যে মূলতবি করে দেওয়ার প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষের পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ছিল তাঁর নিজের জন্যেই এক বড় চ্যালেঞ্জ। পরবর্তী কর্মসূচি যে কঠিন এবং তা থেকে যে প্রত্যাবর্তনের কোন সুযোগ নেই সে কথা তাঁর জানা ছিলো। অতএব জনগণের সামনে পরবতী কর্মসূচি ঘোষণা যেমন তাঁর লক্ষ্য ছিল, তেমনি লক্ষ্য ছিল সেই কর্মসূচির চূড়ান্ত উদ্দেশ্যও তুলে ধরা। এই দ্বিবিধ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তাঁর সাতই মার্চের ভাষণ। বিশেষত এই ভাষণে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করছেন, কী করছেন না সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার এক অত্যন্ত গুরুভারও তাঁর প্রশস্ত কাঁধে পড়েছিলো। বাঙালির ইতিহাসের সব চেয়ে সন্ধিক্ষণে দেওয়া এই ভাষণ একদিকে যেমন ইতিহাসেরই ফল, অন্যদিকে তেমনি ইতিহাস নির্মাণেরই উপাদান, সেটা আমাদের মনে রাখা দরকার।

অবশেষে ইয়াহিয়া এবং ভূট্টো উভয়ই এলেন ঢাকায় কিন্তু আপস-রফা হলো না কারণ ৬-দফা প্রস্তাবের দু’টি দফা তারা মানতে রাজি হলেন না। তার একটি ছিল  প্রদেশগুলো নিজেদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার মালিক হবে। এর নির্ধারিত অংশ তারা কেন্দ্রকে দেবে। আর অপরটি ছিল  অঙ্গরাজ্যগুলোকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য আধা সামরিক বাহিনী গঠন করার ক্ষমতা দেওয়া। বঙ্গবন্ধু জানতেন যে গুরুত্বপূর্ণ এই দু’টি দফায় পাকিস্তানিরা সম্মত হবে না কারণ এই দুই দফা কেবল স্বায়ত্ত্বশাসনকেই নিশ্চিত করবে না, স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করবে। আর এই বিচক্ষণতার কারণেই তিনি বরাবর ৬-দফার ব্যাপারে নিরাপস ছিলেন। তারপরই ২৫শে মার্চ রাতের সেই আক্রমণ, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণা। সে ইতিহাস সবারই জানা। কিন্তু যেটা গুরুত্বপূর্ণ কথা সেটা হলো, যাঁরা বলেন বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, তাঁরা জানেন না যে বঙ্গবন্ধু কেন ছয়-দফার ব্যাপারে সম্পুর্ণ আপসহীন ছিলেন কারণ ৬-দফাই ছিল সেই মুক্তির সনদ যা পাকিস্তানিরা কোন ক্রমেই মেনে নেবে না, আর সেটা মেনে না নিলেই শুরু হবে মুক্তিযুদ্ধ। সত্তুরের  নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ এবং তাতে নিরঙ্কুশ বিজয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে বৈধতা দিয়েছিল এবং বঙ্গবন্ধু তাই বিচ্ছিন্নতাবাদী ছিলেন না ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী এক মহানায়ক। 


আনিস আহমেদ | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

গবেষক, লেখক এবং বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার প্রাক্তন বেতার সাংবাদিক। স্বনামে ও ছদ্ম নামে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন।


2 Comments Leave a Reply

  1. A thoughtful and well-grounded article by Anis Ahmed on the historical significance of the Six-Point Movement and its connection to the broader struggle that eventually led to the birth of Bangladesh. The article is objective, analytical, and balanced in presenting how the political developments of the 1960s shaped the national consciousness of the Bengali people.

    What I appreciate most is the calm and fact-based tone of the writing. Anis Ahmed brings the depth of a researcher and the clarity of an experienced journalist, shaped by his years with BBC and Voice of America. I was one of the almost regular listeners of his VOA programs, and I especially used to enjoy his show “Hello Washington.” I am truly glad to have found his writing here in The Porshi.

    One may have different political interpretations of that period, but the historical role of the Six-Point Movement, Bangabandhu’s leadership, the 1970 election mandate, and the road to the Liberation War cannot be denied without denying the very foundation of Bangladesh itself.

    Thank you to Anis Ahmed for this valuable and timely reflection.

  2. Again, a very thoughtful article! One point that especially caught my attention is the brief mention of the Legal Framework Order, or LFO, issued by Yahya Khan’s military regime before the 1970 election.

    In my own study of that period, I have found the LFO to be one of the most significant and under-discussed elements of the entire political process. The Pakistani junta had to issue it because they could no longer avoid a general election after the mass uprising of 1969, yet they also wanted to define and control the rules under which power would be transferred. Political parties that chose to participate in the election had to operate within that framework.

    What is remarkable is how Bangabandhu handled it. He did not reject the election simply because it was being held under a military-imposed framework. Instead, he used that election to give democratic and legal legitimacy to the Six-Point demand. That was a very strategic political decision.

    I would be very interested to read Anis Ahmed’s deeper analysis of the LFO itself — why it was issued, how the parties responded to it, and how Bangabandhu turned that imposed framework into a mandate for the people of Bangladesh.

Leave a Reply

Your email address will not be published.

বাবা
Previous Story

বাবা

Next Story

যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ

Latest from নিয়মিত কলাম

বীরাঙ্গনা

অদ্বিতীয়া বইগল্প

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইয়ের আলোকে বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ন্যায়বিচার নিয়ে জাকিয়া আফরিনের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ।

যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ

যুদ্ধে হেরেও কীভাবে জিতছে ইরান? মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ ও 'যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ' নিয়ে হাসান ফেরদৌসের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণটি পড়ুন।

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনা

রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রেমের কবি। তার সেই প্রেম ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে স্বদেশ, স্বদেশ থেকে বিশ্ব এবং... লিখেছেন আনিস আহমেদ।