বীরাঙ্গনা

অদ্বিতীয়া বইগল্প

জাকিয়া আফরিন
June 16, 2026
21 views
24 mins read

‘আমি বীরাঙ্গনা বলছি’ – ড. নীলিমা ইব্রাহিম

‘টেপরি রানী বর্মন: এক মহীয়সী নারীর বিদায়’ এমনি কিংবা কাছাকাছি শিরোনামের একটি লেখা গত ১৫ই মে বাংলাদেশের বিভিন্ন অনলাইন সংবাদমাধ্যমে চোখে পড়ল। ১৯৭১ সালে তরুণী বধূ এই নারী বিয়ের মাত্র আট দিন পর নিরাপত্তার কথা ভেবে ফিরে এসেছিলেন বাবার বাড়ী। সেই তার দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি। নিরাপদে থাকতে দেয়ার দোহাই দিয়ে এলাকার প্রভাবশালী জনৈক মকবুল হোসেন টেপরি বর্মন ও তার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যান নিজের কাছে। তারপর ধ্বংস করে দেন তার পারিবারিক ঘর বাড়ী-পোষা প্রাণী সব। কোন কোন পত্রিকায় এসেছে পরিবারের সদস্যদের বাঁচাতে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেয়া হয় তাকে। কেউ লিখেছে, সেনাবাহিনী জোর করে ধরে নিয়ে যায় মকবুল হোসেনের বাড়ী থেকে। তারপরের সাত-আট মাস টেপরী রানী পৃথিবীতেই নরক যন্ত্রণা ভোগ করেছেন। প্রতিদিন অসংখ্য ধর্ষণের শিকার হয়েছেন এবং একপর্যায়ে গর্ভবতী হয়ে পড়েন তিনি। বাবার ভালবাসা পেয়েছেন, কষ্ট করে হলেও মেয়েকে যুদ্ধের পর সুস্থ্য করে তুলতে আপ্রাণ চেষ্টা করেন তিনি। তবু সনাতন ধর্মের নারীর গর্ভে মুসলমান অনাকাঙ্ক্ষিত সন্তানের জন্ম ভুগিয়েছে তার পরিবারকে। ‘জারজ’ ‘ভিনদেশী’ বলে গালাগাল, স্কুলে, খেলার মাঠে একরকম অচ্ছুৎ হয়েই বাড়তে থাকে টেপরি রানীর পুত্রসন্তান। একাই সমাজ সামলে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে গেছেন এই বীরাঙ্গনা। ২০১৬ সালে রাষ্ট্রের ‘বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা’ খেতাবপ্রাপ্ত এই নারীর শেষকৃত্যের খবর লিখতে গিয়ে সুরমা জাহিদ প্রশ্ন করেছেন, ‘তার ত্যাগের ঋণ কি শোধ করতে পারবে বাংলাদেশ? না, টেপরি রানী বর্মন, তার মত বেঁচে যাওয়া লাখো ধর্ষণের শিকার নারী কিংবা শহীদ হয়ে যাওয়া তিরিশ লক্ষ মানুষের রক্তের ঋণ আমরা শোধ করতে পারব না। যে বীর মুক্তিযোদ্ধারা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক নেতৃবৃন্দ যুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে আশাভঙ্গের বেদনায় জর্জরিত হয়েছেন, যুদ্ধের নৃশংসতায় সৃষ্টি মানসিক অবসাদ থেকে মুক্ত হতে পারেননি সারাজীবন, তাদের ঋণও আমরা শোধ করতে পারব না। তবে, সম্মান জানিয়ে তাদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সমাজ সংস্কার হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। টেপরি রানী বর্মন এবং তার মত বীরাঙ্গনাদের সম্পর্কে জানতে হবে, বুঝতে হবে সেই সাহস আর শক্তির মূলে গভীর শেকড়সম দেশপ্রেমের কথা। সেখানেই ড. নীলিমা ইব্রাহিমের ধ্রুপদী সৃষ্টি, ‘আমি বিরাঙ্গনা বলছি’র প্রাসঙ্গিকতা।

অদ্বিতীয়া বইগল্প

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হবার পর যে সময় এর ভয়াবহ নির্যাতন- বীভৎস অত্যাচারের কথা বাংলাদেশের মানুষের কাছে যে স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ঠিক সেই সময়েই পুনর্বাসন কেন্দ্রে বীরাঙ্গনাদের সাথে কথা বলার সুযোগ হয় ড. নীলিমা ইব্রাহিমের। তবে এই-সাক্ষাৎকারগুলো প্রকাশ করতে সময় নিয়েছেন ‘মাত্র’ ২১ বছর। প্রথম পর্ব প্রকাশের ভূমিকায় বলেছেন, ‘- গ্রন্থের পাণ্ডুলিপি অনেক দিন ধরেই প্রস্তুত করছিলাম। প্রকাশে শঙ্কা ছিল।’ প্রথমবার হতাশ হতে হয়নি তাকে। ভূমিকায় লিখেছেন, ‘১৯৯২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বইমেলার জন্য “আমি বীরাঙ্গনা বলছি’র ১ম খণ্ডের পাণ্ডুলিপি ভীতকম্পিত হস্তে, সংশয় শঙ্কাকুল চিত্তে প্রকাশকের হাতে তুলে দিয়েছিলাম। কিন্তু না, প্রজন্ম একান্তই এই দেশপ্রেমিক-রমণীদের মাতৃসম্মানে সমাদৃত করেছে’’। প্রথম দুই খণ্ডে প্রকাশিত হয় ৭ জন বীরাঙ্গনার মুখে শোনা ঘটনার অনুলিখন। তৃতীয় খণ্ডের কথা ভেবে রেখেছিলেন সংগ্রহে থাকা সাক্ষাৎকার নিয়ে, তবে সেই বই আর লেখা হয়নি। দুই খণ্ডের সমন্বয়ে তৈরি অখণ্ড বইটির প্রকাশ ভূমিকায় কারণও উল্লেখ করেছেন তিনি। ‘প্রথমত, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে লিখতে গিয়ে আমার হৃদয় ও মস্তিষ্কের ওপর প্রচুর চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সুতরাং নতুন করে আর এ অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করতে পারলাম না। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সমাজের রক্ষণশীল মনোভাব। বর্তমান সমাজ ’৭২ এর সমাজের চেয়ে একদিকে অধিকতর রক্ষণশীল। বীরাঙ্গনাদের পাপী বলতেও তারা দ্বিধা বোধ করেন না। সুতরাং পঁচিশ বছর আগে যে সমাজ-স্বাভাবিক জীবন থেকে তারা বঞ্চিত হয়েছেন, তাঁদের নতুন করে অপমানিত করতে আমি সংকোচ বোধ করছি’। ড. নীলিমা ইব্রাহিমের কাছ থেকে তাই এই সাতজন বীরাঙ্গনার কথা জেনেছি আমরা। নাম, পরিচয় উল্লেখ না করেই তাদের জীবনালেখ্য মমতার সঙ্গে লিপিবদ্ধ করেছেন তিনি।

শুরুতেই আমরা পড়ি মিসেস টি নিয়েলসনের ঢাকা থেকে ডেনমার্কে স্বেচ্ছা নির্বাসনের গল্প, সেখানে নতুন জীবন গড়ে নেবার সফল যাত্রা। নিজ দেশত্যাগ করে শত্রুর সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যাওয়া মিনি নিরাপদ বলে ভেবেছেন, সেই মেহেরজানের কথা। দেশ ছেড়ে যাবার মুহূর্তে ফিরিয়ে আনা রীনা, যুদ্ধে বিধ্বস্ত জীবনকে ফিরে যাওয়া মিনার কথা। শেফালীর ঘৃণামিশিত হুঙ্কার, ‘-আপনি যদি বাঙালি মুসলমান ঘরের পুরুষ হন, আর আপনার বয়স যদি পঞ্চাশ পার হয়ে থাকে, তাহলে মনোবলে আপনি আমার চেয়ে নিকৃষ্ট। কারণ একদিন আমি আপনাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলাম, আপনাদের আপাদমস্তক দৃষ্টিপাত করার এবং দেহভেদ করে অন্তরের পরিচয় পাওয়ার সৌভাগ্য অথবা দুর্ভাগ্য আমার হয়েছিল। এদেশের মায়ের সন্তান যারা ছিল, তারা  হয় শহীদ, নয় গাজি। যুদ্ধকালে যারা খেয়ে পরে সুখে ছিলেন তাদের আমি ঘৃণা করি’। আরো আছে ফাতিমা, যার নির্যাতন এতই ভয়ংকর এবং নির্মম ছিল-মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ছিলেন। খাদের কিনার থেকে ফিরে এসে নতুন জীবনে প্রবেশ করেছেন আবার।

বীরাঙ্গনাদের এই অভিজ্ঞতা পাঠককে কাঁদাবে, হৃদয় করে তুলবে ব্যথিত। কিন্তু আমরা কি মনে রাখবো এই জীবনযাপনের বর্ণনা শুনে? যুদ্ধে নির্যাতনের বর্ণনা আমরা শুনেছি, সেই সময়কার সমাজ-ব্যবস্থা, পুনর্বাসনের অল্প হলেও নানাভাবে গ্রন্থিত হয়েছে- স্বাধীন দেশে। আমাদের বীরাঙ্গনাদের-দত্তক দেয়া সন্তনরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখনো ফেরেন মায়ের খোঁজে। শুধু কথা হয়নি স্বাধীন দেশে ধর্ষণের শিকার নারী এবং শিশুদের প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ নিয়ে। ২০২৬ সালেও ধর্ষণের খবর মানেই রগরগে বর্ণনা, বিভিন্ন মহলে নারীটি কি পোশাক পরে ছিল, শিশুটি কেন কর্মজীবী মায়ের নিরাপত্তা বঞ্চিত ছিল কিংবা ধর্মীয় আইন থাকলে নারীদের বাইরে এত থাকারই উপায় ছিল না-এই আলোচনার ঝড়। ২০২৬ সালেও ন্যায়বিচার মানে প্রকাশ্যে ‘ঝুলিয়ে দেয়া’ ‘গুলি করে মারা’ ‘আর ‘অঙ্গহানি’র দাবী। ২০২৬ সালেও রাষ্ট্রযন্ত্র ধর্ষকের সাথে নির্যাতিত নারীর বিয়ে দেবার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত দেয়-ঘটকালি করতে চায়। ২০২৬ সালেও ধর্ষণের জন্য নানাভাবে দায়ী করে চলি নারী ও তার পরিবারকেই। ধর্ষণের কারণ যৌন উন্মাদনা নয়, শারীরিক আকর্ষণের চাইতে নারীকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার- এই ভাবনা এখনো সর্বজনীন করতে পরিনি আমরা। ২০২৬ সালেও নারীকে অপমান করা, নারীদেহ, মাতৃগর্ভ নিয়ে অশ্লীলতার সায় দানকারীরা আমাদের সংসদে ‘মাননীয়’ পর্যায়ে থাকেন। বীরঙ্গনাদের জীবনকাহিনী থেকে তাই আমরা মনে নিতে পারিনি সামাজিক উন্নয়নের উদ্যম- মেনে নিয়েছি মাত্র।

দেরীতে হলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে আমরা বিচার করার চেষ্টা করেছি ১৯৭১ এ নারী নিগৃহের জন্য দায়ী রাজাকার গোষ্ঠীর, বিচার সম্পন্ন হয়েছে অনেকের। ন্যয়বিচারের অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে স্বীকৃত ‘ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ’ ও ‘পুনর্বাবাসন’ এর বিবেচনা এবং উদ্যোগ নেয়া হয়েছে স্বাধীনতার পর পরই। বীরাঙ্গনাদের নিজ কন্যাসম সম্মান, পিতৃপরিচয় দেয়া অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর হত্যাকাণ্ডের আগে পর্যন্ত। ২০০০ সালের পরে আবার শুরু হয়েছে বীরাঙ্গনাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবস্থান, নিয়মিত সম্মানী ভাতা। মৃত্যুর পর সসম্মানে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় গৌরবে (গার্ড অব অনার) সমাহিত হচ্ছেন তাঁরা। হাজারো অনিয়ম, অব্যবস্থা, অসম্মানের বিপরীতে রাষ্ট্র প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে গেছে বীরাঙ্গনাদের জাতীয় বীরের মর্যাদায় ও স্বাধীনতা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাদের আত্মত্যাগ তুলে ধরতে। তাই পৃথিবীর বেশিরভাগ যুদ্ধ বিধ্বস্ত সমাজের গড়ে ওঠার ইতিহাসের বিচারে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে।

নতুন প্রজন্ম তাই এই বই পড়বে বুকভরা ভালবাসা আর সমাজ উন্নয়নের চিন্তা নিয়ে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র যে ঈর্ষণীয় মূলনীতির ওপর দাঁড়িয়ে, সেই ভিত্তি যেন নড়বড়ে না হয়ে যায়। নারী পুরুষ/সকল জাতি, ধর্মের মানুষের সে সমতার স্বপ্ন নিয়ে আমরা শুরু করেছিলাম পথচলা তা থেকে বিচ্যুত যেন না হই। ন্যায়বিচার শুধু শাস্তি নয়, সমাজকে সুস্থ্য করার রসদ জোগাবে। অপরাধীকে সুযোগ দিতে হবে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার-তবে তা নির্যাতিতের মানসিক আঘাতকে বিবেচনা করেই। শুধুমাত্র শরীরের দোহাই দিয়ে নারীকে সুযোগ বঞ্চিত করে রাখা। এ যুগে প্রহসনের মত মনে হয়। সকল তরুণ নিজ ইতিহাস জানুক-শেকড় মজবুত না হলে, বৃক্ষ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ‘আমি বীরঙ্গনা বলছি’ বাধ্যতামূলক পাঠ হবে- সেই আশায় রইলাম।


জাকিয়া আফরিন | ইউনিয়ন সিটি, ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র

আইনের অধ্যাপক, সাংস্কৃতিক কর্মী ও লেখক।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

দুটি কবিতা
Previous Story

দুটি কবিতা

ঘেউউউ
Next Story

ঘেউউউ

Latest from নিয়মিত কলাম

যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ

যুদ্ধে হেরেও কীভাবে জিতছে ইরান? মধ্যপ্রাচ্যের নতুন ভূরাজনৈতিক মেরুকরণ ও 'যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ' নিয়ে হাসান ফেরদৌসের তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণটি পড়ুন।

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনা

রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রেমের কবি। তার সেই প্রেম ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে স্বদেশ, স্বদেশ থেকে বিশ্ব এবং... লিখেছেন আনিস আহমেদ।