যুদ্ধের ভেতর আরেক যুদ্ধ

হাসান ফেরদৌস
June 16, 2026
16 views
41 mins read

১। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জন মিয়ার্শহাইমারের একটা কথা এখন অনেকেই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছেন। তাঁর কথায়, কোন সামরিক সংঘর্ষে অধিকতর দূর্বল দেশ যদি অধিক শক্তিশালী দেশের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে যায়, তাহলে তার জন্য সেটি হবে স্ট্রাটেজিক বা রণকৌশলগত বিজয়। চলতি উপসাগরিয় যুদ্ধে ইরান তেমন জয়ই লাভ করতে চলেছে।

কথাটা ভেঙ্গে দেখা যাক।

যুদ্ধবন্ধ প্রশ্নে এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বেড়াল–ইঁদুর খেলা শুরু হয়েছে। তবে এই খেলায় কে বেড়াল আর কে পুলিশ সেটা খুব পরিষ্কার নয়। ইরানের ওপর ভয়াবহ বিমান হামলার পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বললেন- ইরান শেষ, তাঁর জয় হয়েছে। সে কারণে তিনি একতরফা ভাবে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করছেন। জবাবে ইরান বলল- রোশো, তোমরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও আমরা যুদ্ধ থামাচ্ছি না। তারা দুম করে হরমুজ প্রণালির ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল আটকে দিল, বলল যেতে হলে তার অনুমতি ও কর প্রদান করে যেতে হবে।

এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ট্রাম্প হরমুজ মুখ বরাবর সামরিক অবরোধ বসালেন, বললেন কোন ইরানী জাহাজ যেতে পারবে না। অন্য দেশের জাহাজ যাতে নিরাপদে যেতে পারে সেজন্য তারা সামরিক প্রহরা দেবে। ইরান বলল, তেমন চেষ্টা করলে মার্কিন রণতরীর উপর সে হামলা চালাবে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল প্রহরা বসিয়ে তেলবাহী জাহাজের চলাচল স্বাভাবিক করবে, তাতে তেলের দাম কমবে। কিন্তু ইরানী ধমকের পর ও একটি-দুটি জাহাজে হামলার পর কেউ আর সে মুখী হল না। ফলে তেলের দাম আরো বেড়ে গেল, সঙ্গে ট্রাম্পের বিপদও।  

যুদ্ধ বনাম শান্তি

ইরান শান্তি আলোচনায় রাজি, কিন্তু তার নিজের শর্তে। হরমুজ সে খুলে দেবে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে। দুদিন পর সে বা ইসরায়েল ফের হামলা করবে না, তেমন নিশ্চয়তাও দিতে হবে। পারমাণবিক বোমা সে বানাবে না, কিন্তু শান্তিপুর্ণ কাজে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের অধিকার তাকে দিতে হবে। 

ইরানকে পরাস্ত করা মানে ইরানের সরকারের পতন, সেখানে মার্কিন পছন্দের নতুন সরকার। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনে সফল না হয়ে ট্রাম্প একদিকে শান্তির প্রস্তাব, অন্যদিকে যুদ্ধের হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। যুদ্ধ বন্ধে ইরানের কোন তাড়া আছে বলে মনে হয় না, কিন্তু ট্রাম্পকে একটা সম্মানজনক পথে এই যুদ্ধ বন্ধ করতেই হবে। যত তেলের দাম বাড়ছে, নিজ দেশে তাঁর জনসমর্থন ততই কমছে। সামনে মধ্যবর্তি নির্বাচন, সেখানেও পাগলা ঘন্টি বেজে চলেছে।

তার জন্য অন্য ঝামেলাও আছে। মে মাসের মাঝামাঝি তিনি বেইজিং গিয়েছেন প্রেসিডেন্ট সি-র সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকের জন্য। ইরানে যুদ্ধ না থামিয়ে এই শীর্ষ বৈঠক তাঁর জন্য তেমন সুখের হয়নি। জুন মাসে অলিম্পিক, যুক্তরাষ্ট্র এবার অন্যতম আয়োজক দেশ। যুদ্ধের কারণে তেলের দাম না কমলে দর্শক সমাগম নাও হতে পারে, সে ভাবনাও ট্রাম্পকে মাথায় রাখতে হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অতি ক্ষুদ্র ও দুর্বল হওয়া সত্বেও ইরান কীভাবে আমেরিকার নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছে, এটি হল তার সর্বশেষ উদাহরণ। সেদিকে আঙ্গুল তুলেই কিছুদিন আগে জার্মানীর চ্যান্সেলর ফ্রেদরিক মেরজ বলেছিলেন, ইরানের হাতে যুক্তরাষ্ট্র অপদস্ত হচ্ছে।

ট্যাকটিকাল বনাম স্ট্রাটেজিক

প্রতিটি যুদ্ধেরই দুটি দিক বা লক্ষ্য থাকে— প্রথমটি তাৎক্ষণিক কৌশলগত (ট্যাকটিকাল) এবং দ্বিতীয়টি, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত (স্ট্রাটেজিক)। তাৎক্ষণিক কৌশলগত যুদ্ধে ইরান যে হেরে গেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল মিলে সেদেশের প্রায় ১৩,০০০ লক্ষ্যবস্তুর ওপর দেদার হামলা চালিয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের বড় অংশ নিহত। একই অবস্থা সেনা নেতৃত্বের। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যে ক্ষণে ক্ষণে ‘জিতে গেছি, জিতে গেছি’ বলে আওয়াজ দিচ্ছেন, তা এই ট্যাকটিকাল জয়। কিন্তু ঐযে দীর্ঘমেয়াদী রণকৌশলগত লক্ষ্য, সেখানে আটকে পড়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিছুতেই ইরানকে নাকে খত দেওয়ানো যাচ্ছে না। এর বড় কারণ, মুখোমুখি সমরে পাল্লা না দিয়ে ইরান অসম বা এসেমিট্রিক যুদ্ধের পথ বেছে নিয়েছে। এই অসম যুদ্ধে ইরানের প্রধান – প্রধান কেন, একমাত্র – অস্ত্র হরমুজ প্রণালি। তার ওপর নিয়ন্ত্রণ সে ছাড়বে না। মার্কিন ভাষ্যকার জন আলটারম্যান তো আগাম বলেই দিয়েছেন, ইরান নিজের শক্তির প্রমাণ পেয়ে গেছেন। যুদ্ধ শেষ হলেও হরমুজের ওপর নিয়ন্ত্রণ সে ছাড়বে না।

হরমুজ নিয়ে যে ওস্তাদি চালটি ইরান দিল, এবং দিয়ে যাচ্ছে, তা দেখেই পন্ডিতকুল বলছেন, দেখ, কীভাবে যুদ্ধে হেরেও শুধু টিকে থেকে জিতে যাচ্ছে ইরান।

আসলে এই অসম যুদ্ধে ইরানের টিকে থাকার প্রধান কারণ, কষ্ট সহ্য করার অপরিসীম ক্ষমতা। ইরানী বিপ্লবের পর ইরাকের সঙ্গে একটানা আট বছর যুদ্ধ করার অভিজ্ঞতা তার আছে। সেই প্রথম থেকেই দেশটির ওপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তবুও সে টিকে রয়েছে। শুধু টিকে নয়, সে যুক্তরাষ্ট্রকে শেখাচ্ছে একুশ শতকে এসে ড্রোনের মত নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করে কীভাবে যুদ্ধের ময়দানে নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা যায়।

যেভাবে বদলে যাবে মধ্যপ্রাচ্য

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে চুড়ান্ত বিজয় থেকে বঞ্চিত করে ইরান ইতিমধ্যে এক নতুন পরাশক্তি হিসাবে অবির্ভুত হয়েছে, এমন কথা বলা বোধহয় অযৌক্তিক নয়। এই অঞ্চলের সে সবচেয়ে বড় দেশ, সামরিক শক্তিতেও সবার সেরা। ইরানকে ঠেকাতে উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক আঁতাত করেছিল, কেউ কেউ ইসরায়েলের সঙ্গে উষ্ণ করমর্দনও করেছিল। কোনটাতেই কাজ হল না, বরং ইরানের পাল্টা হামলায় তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হল।

এই অবস্থায় অব্যাহত কোন্দলের পরিবর্তে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে সহাবস্থানের পথ বেছে নেওয়ার কথা ভাবছে। সৌদি ভাষ্যকার ও আশরাক আল-আসসোয়াতের প্রাক্তন সম্পাদক আবদেল রহমান আল-রাশেদ বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ সবার জন্য, বিশেষ করে সৌদি আরবের জন্য, খুবই ক্ষতিকর। চলতি যুদ্ধ থেকে সে প্রমাণ মিলেছে। সুতরাং যুদ্ধের পথে না গিয়ে ‘প্রাতিষ্ঠানিক সহাবস্থান’ অনুসরণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। সৌদি আরব দুই বছর আগে থেকেই চীনের মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে এক ধরনের দাঁতাতের পথ অনুসরণ করছে। ইরানের হামলার শিকার হওয়া সত্বেও তারা যে পালটা হামলা করেনি, সেও এই সহাবস্থানের ইঙ্গিত।   

অন্য আরেক ভাবে ইরান এই যুদ্ধে জয়ী হিসাবে পুরষ্কৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণের মুখে ইরান একাই দাঁড়িয়ে লড়াই করেছে। এর ফলে শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, সারা বিশ্বে নিজের জন্য বিশেষ সাধুবাদ সে ছিনিয়ে এনেছে। আল-জাজিরায় এক মন্তব্য প্রতিবেদনে সুপরিচিত আরব ভাষ্যকার ফয়সল আল-কাসেম লিখেছেন, এই একলা লড়াইয়ের মাধ্যমে ইরান তার কঠোর সমালোচকদের কাছেও প্রশংসিত হয়েছে।

তবে ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় লাভ এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবল প্রভাব খর্ব করা। আরব দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সামরিক ভাবে এতদিন যে পরিমাণ মুখাপেক্ষী হয়ে ছিল, যুদ্ধের পর সে অবস্থা বদলাবে। যুক্তরাষ্ট্র উপসাগরীয় দেশগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারেনি, বরং তাদের ভূখন্ডে সামরিক ঘাঁটি থাকার কারণে ইরানের হামলার শিকার হয়েছে। এই অবস্থায় নিজের সুরক্ষার তাগিদেই এইসব দেশ এক আমেরিকার হাত ধরার বদলে  চীন ও রাশিয়ার মত আরো দুই-একটি দেশের হাত ধরার চেষ্টা করবে। একে আমরা মাল্টি-এলাইনমেন্ট বা বহুপাক্ষিক জোট সম্পর্ক বলতে পারি। ইরান আগে থেকেই এসব দেশের সঙ্গে আঁতাতে রয়েছে, ফলে আখেরে লাভ তারই।

২। না শান্তি – না যুদ্ধ

ক্যাথলিকদের বিশ্বাস, স্বর্গ ও নরকের মাঝখানে একটি জায়গা আছে, যার নাম লিম্বো। স্বর্গে যেতে হলে এই লিম্বো পেরিয়ে যেতে হবে; কিন্তু কবে, কখন, কীভাবে এই লিম্বো পেরোবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তিচুক্তি নিয়ে আমরা এখন এই ‘লিম্বো’তে রয়েছি। শান্তির পথে অর্ধেক এগিয়ে এসেছি, কিন্তু বাকি অর্ধেক কবে পেরোব, কেউ বলতে পারে না। এখনকার অবস্থা না স্বর্গ, না নরক। না যুদ্ধ, না শান্তি।

চুক্তি হচ্ছে–হবে বলে কথা–চালাচালির প্রায় দুই মাস হতে চলল। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একবার নতুন করে হামলা শুরুর হুমকি দিচ্ছেন, আবার পরক্ষণেই বলছেন, চুক্তি প্রায় প্রস্তুত। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলছেন, খুব শিগগির এই চুক্তি হবে বলে মনে হয় না। ট্রাম্পের সামনে মধ্যবর্তী নির্বাচন, এই চুক্তি তাঁর চাই-ই চাই, কিন্তু ইরান গোঁ ধরে বসে আছে, তার শর্ত পূরণ না হলে সে কোনো চুক্তি স্বাক্ষর করবে না। সে বুঝে গেছে, ট্রাম্পের হাতে সময় নেই, কিন্তু তার হাতে বিস্তর সময়।

এদিকে চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে নতুন এক গেরো পাকিয়ে বসেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, একাধিক আরব ও মুসলিম দেশকে ‘বাধ্যতামূলকভাবে’ ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের লক্ষ্যে তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির অন্তর্ভুক্ত হতে হবে। ইরান যুদ্ধের সঙ্গে আরব-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের সম্পর্ক কী, সেটা বোঝা দুষ্কর। সে কারণে অধিকাংশ আরব রাজধানীতেই ট্রাম্পের এই দাবি ভ্রু-কুঞ্চনের জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্পের প্রথম দফা শাসনামলে উপসাগরের দুই দেশ, আরব আমিরাত ও বাহরাইন — ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের এই চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। মরক্কো ও সুদানের মতো দেশকেও এই চুক্তিতে ভেড়ানো গিয়েছিল। কিন্তু আসল ‘প্রাইজ’ সৌদি আরব, এই প্রশ্নে এক পা এগিয়ে দুই পা সরে এসেছে। চুক্তি স্বাক্ষরে তারা রাজি, তবে তার আগে ফিলিস্তিন প্রশ্নে স্পষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে হবে, এই দাবি তাদের। গাজায় ও লেবাননে অব্যাহত গণহত্যার পর শান্তি স্থাপন প্রশ্নে সৌদি অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।

এ ছিল ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের অবস্থা। এখন, এই যুদ্ধ শুরুর তিন মাস পর অবস্থার পরিবর্তন এসেছে। উপসাগরীয় দেশগুলোর, বিশেষ করে সৌদি আরবের ইরানের ব্যাপারে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল প্রবল রকম নেতিবাচক। ইসরায়েলকে নিয়ে তাদের যত ভয়, তার চেয়ে বেশি ইরানকে নিয়ে। সিকি শতক আগে সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছিলেন, ইরানকে যেন এমন শাস্তি দেওয়া হয়, যাতে সে আর মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেছিলেন, এই ‘বিষধর সাপের’ মাথাটা কেটে ফেলুন।

বাদশাহ আবদুল্লাহ আর নেই, সে দেশের প্রকৃত ক্ষমতা এখন তাঁর ভাতিজা মোহাম্মদ বিন সালমানের হাতে। ইরানের ব্যাপারে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও এক। চলতি মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার পেছনে তাঁর উসকানি ছিল, এ কথা একাধিক মার্কিন পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে। এ কথা মোটেই গোপন নয় যে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় সব দেশই ইরানের ব্যাপারে সন্দিহান।

শিয়া-সুন্নি বিবাদ তো রয়েছেই, কিন্তু আসল গেরো আঞ্চলিক আধিপত্য প্রশ্নে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ইরান সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছে। গায়ে–গতরেও অন্য সবার চেয়ে সে বড়। সে কারণে এই ইরানি সাপের মাথাটা যদি ছেঁটে ফেলা যায়, তাহলে মন্দ হয় না।

সমস্যা হলো, পৃথিবীর দুই প্রধান সামরিক শক্তির একযোগে হামলার পরও সে সাপের মাথাটা ছেঁটে ফেলা গেল না। লাগাতার বিমান হামলার ফলে সামরিকভাবে তাকে কাবু করা গেলেও কৌশলগতভাবে তাকে কাবু করা যায়নি। হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের আধিপত্য সরবে ঘোষণা করে উপসাগরীয় দেশগুলো তো বটে, সারা বিশ্বকেই কাঁপিয়ে দিয়েছে সে।

বিবাদ থেকে সহযোগিতা

ইরান যুদ্ধের একটা অভাবিত প্রতিক্রিয়া হয়েছে এই যে এক আরব আমিরাত ছাড়া উপসাগরের অন্য সব দেশই এখন ইরানের সঙ্গে সহযোগিতা ও সহাবস্থানের নীতি অনুসরণের কথা ভাবছে। কথায় বলে, হারাতে না পারলে হাত মেলাও। উপসাগরীয় দেশগুলো বুঝে গেছে, এই অঞ্চলে যদি স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হয়, তাহলে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত মৈত্রী বজায় রাখতে হবে। মার্কিন সামরিক বহর রেখে বা ইসরায়েলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ হবে না।

উপসাগরের দেশগুলোর মধ্যে যে সম্পর্কের নতুন মেরুকরণ ঘটছে, সে কথা অন্য কেউ নয়; খোদ ইসরায়েল থেকেই স্বীকার করা হয়েছে। সে দেশের প্রভাবশালী দৈনিক হারেৎজ বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা হারিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন নিজদের স্বার্থে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত আঁতাতের কথা ভাবছে। সুপরিচিত ভাষ্যকার জিভি বারেল লিখেছেন, আব্রাহাম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির শর্ত জুড়ে ট্রাম্প যখন এক কল্পজগতে বাস করছেন, ঠিক তখন উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জোট গঠনে উদ্যোগী হয়েছে।

একই কথা বলেছেন চীনা-আমেরিকান ভাষ্যকার ফ্রেড ডি টেং। এক সাম্প্রতিক ভাষণে তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের একটি সম্ভাব্য ফলাফল হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিয়ে একটি নতুন ‘ইসলামিক ন্যাটো’ গঠন। এটি যতটা না সামরিক, তার চেয়ে বেশ হবে কৌশলগত।

সৌদি আরব ও ইরান ছাড়া অন্য যে দেশটি এই কৌশলগত আঁতাতে যুক্ত হতে পারে সে হলো পাকিস্তান এবং অদৃশ্য যোগসূত্র হিসেবে চীন। তিন বছর আগে চীনা দূতিয়ালিতে ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপিত হয়েছে। গত বছর সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে সৌদি আরব এখন পাকিস্তানি পারমাণবিক প্রতিরক্ষাব্যূহের অন্তর্গত, তার পেছনেও একটি অলক্ষ্য শক্তি ছিল চীন।

ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করে এই যে নতুন কৌশলগত রাজনৈতিক ও প্রতিরক্ষাবলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, তার একটা প্রধান কারণই হলো সামরিক ও রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বল অবস্থান। উপসাগরীয় দেশগুলো এখন এ ব্যাপারে নিশ্চিত যে তাদের প্রয়োজনের সময় যুক্তরাষ্ট্র হয় পর্যাপ্ত সমর্থন দিতে অক্ষম অথবা অনাগ্রহী হবে। এই যুদ্ধেই দেখা গেছে, উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে ওয়াশিংটন ব্যস্ত থেকেছে ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে।

উপসাগরীয় দেশগুলো এখন বেশ বুঝতে পেরেছে, ইরান তাদের জন্য একটি অব্যাহত উদ্বেগের কারণ বটে, কিন্তু তার চেয়েও বড় উদ্বেগ আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা। এই অঞ্চলের দেশগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোত যে অভাবিত সমৃদ্ধি অর্জন করেছে, তার মুখ্য কারণ ‘সেফ হ্যাভেন’ বা নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে তাদের সুখ্যাতি। এখানে রাজনৈতিক সংকট নেই, যুদ্ধবিগ্রহ নেই, ফলে চুটিয়ে ব্যবসায় কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু এবারের যুদ্ধ থেকে বোঝা গেল, ইরানকে ঘাঁটালে বিপদ আছে। ফলে সামরিক পথে ইরানকে কাবু করার বদলে তার সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর জোট গড়ে তোলার কথা উঠেছে।

আম ও ছালা

একাধিক আরব ভাষ্যকার এই নয়া মেরুকরণের সম্ভাবনার পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ইয়াসমিন ফারুক ও আবদেল আজিজ সাগেরের মতো সুপরিচিত আরব ভাষ্যকার। তাঁরা দুজনেই বলেছেন, ইরানকে বাদ দিয়ে বা তার বিরুদ্ধে জোট বেঁধে উপসাগরীয় নিরাপত্তা বা স্থিতিশীলতা কোনোটাই অর্জিত হবে না।

গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক নিবন্ধে ইয়াসমিন ফারুক বলেছেন, ইরান বিশাল একটি দেশ, সে উপসাগরীয় দেশগুলোর নিকট প্রতিবেশী। চাইলেও তাকে বিচ্ছিন্ন করা যাবে না। অতএব, উপসাগরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ইরানের সঙ্গে সহযোগিতার পথ খোলা রাখতেই হবে। অন্যদিকে আবদেল আজিজ সাগের বলেছেন, ইরানকে একঘরে করতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘাড়ে বন্দুক রাখলে উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের আম ও ছালা দুটোই হারাবে।

নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা যাদের দরকার, সেই উপসাগরীয় দেশগুলোকেই ঠিক করতে হবে কীভাবে তারা এই দুই লক্ষ্য অর্জন করবে। ইরানকে বাদ দিয়ে কোনো ‘নিরাপত্তা স্থাপত্য’ নির্মাণ সম্ভব হবে না, সে কথা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।


হাসান ফেরদৌস | নিউ ইয়র্ক, যুক্তরাষ্ট্র

লেখক ও সাংবাদিক। সর্বশেষ প্রকাধিত গ্রন্থ: ভুট্টোর তওবা ও মুক্তিযুদ্ধের নানাদিক (প্রথমা, ঢাকা, ২০২৪)।


Leave a Reply

Your email address will not be published.

পেছনে ফিরে দেখা
Previous Story

পেছনে ফিরে দেখা: ছেষট্টির ছয়-দফা আন্দোলন

দুটি কবিতা
Next Story

দুটি কবিতা

Latest from নিয়মিত কলাম

বীরাঙ্গনা

অদ্বিতীয়া বইগল্প

ড. নীলিমা ইব্রাহিমের 'আমি বীরাঙ্গনা বলছি' বইয়ের আলোকে বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগ, সামাজিক প্রেক্ষাপট ও ন্যায়বিচার নিয়ে জাকিয়া আফরিনের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ।

রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ চেতনা

রবীন্দ্রনাথ মূলত প্রেমের কবি। তার সেই প্রেম ব্যক্তি থেকে সমষ্টি, সমষ্টি থেকে স্বদেশ, স্বদেশ থেকে বিশ্ব এবং... লিখেছেন আনিস আহমেদ।