“পিতা স্বর্গ পিতা ধর্ম পিতাহি পরমন্তপঃ।
পিতাহি প্রীতিমাপন্নে প্রিয়ন্তে সর্বদেবতা।”
সন্তান হলো এমন এক বার্তা যা আমরা সময়ের কাছে প্রেরণ করি, যে সময়টা আমরা দেখতে পাবো না।
হিন্দু শাস্ত্র অনুযায়ী আমরা আমাদের আদি পিতা হিসেবে মহাদেব কে মেনে এসেছি।
কারণ শিব সৃষ্টি-স্থিতি-লয়রূপ তিন কারণের কারণ, পরমেশ্বর- এটা তার প্রণাম মন্ত্রেই বার বার উঠে এসেছে। তিনি জন্মরহিত, শাশ্বত, সর্বকারণের কারণ; তিনি স্ব-স্বরূপে বর্তমান, সমস্ত জ্যোতির জ্যোতি; তিনি তুরীয়, অন্ধকারের অতীত, আদি ও অন্তবিহীন।
আর এখান থেকেই পিতা শব্দের প্রকৃত অর্থ উন্মোচিত হয়। একটি পরিবারের অর্থাৎ মানুষের সংঘবদ্ধ জীবনের একটি বিশ্বজনীন আধারে মা যদি হন মধুবৃক্ষ তবে বাবা হচ্ছেন পরিবারের বটবৃক্ষ।মা যদি হন নদী বাবা হলেন সেই নদীতে বয়ে চলা নৌকোর মাঝি।
পিতা চরিত্র বিশ্লেষণ করার আসলে কোনো প্যারামিটার নেই। সন্তানের জন্য বাবার ভালোবাসা অসীম এই কথাটাই আদি ও অনন্ত সত্য।
তবুও বাবা ঠিক মা নয়, মা যেমন নরম কোমল, উল্টোদিকে বাবা মানেই কঠিন, কঠোর, শক্ত চোয়াল। বাইরে বাইরে বেশি থাকেন। কথা বলতে হয় মেপেঝেপে, ভুলচুক হলে চোখ রাঙানি, বকা খাওয়ার ভয়। নিজেই নিজের মধ্যে একটা অদৃশ্য দেওয়াল তৈরি করে দেওয়া, যার ওপারে দাঁড়িয়ে বাবা। হ্যাঁ, তাঁর ভূমিকা তো তাই, সর্বদা সন্তানের সুরক্ষার জন্য অতন্দ্র প্রহরীর মতো অক্লান্ত দাড়িয়ে। পৃথিবীতে ভালো মায়ের উদাহরণ প্রচুর, কিন্তু ভালো বাবা হতে পারার দায় অনেক। মা হলেন এমন এক ব্যক্তি যার ভালো হবার পিছনে কোনও কারণ লাগে না, যাকে ভালোবাসার জন্য শর্ত প্রযোজ্য হয় না, কিন্তু বাবার ক্ষেত্রে হয়। চাহিদামত খাওয়া-দাওয়া, কাপড়-চোপড়, ভালো জায়গায় পড়াশোনা, জীবনে চলার ক্ষেত্রে যে কোনও কিছুতে টান পড়লেই বাবা আর ভালো বাবা থাকে না।
বাবা যেন সমস্ত দায়-দায়িত্বের গুরুভার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ সারথি, সন্তানদের হাত ধরে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াই তার কর্তব্য। ‘এটা দাও ওটা দাও, এটা কেন নেই?’ এই সব অভিযোগ শুনতে শুনতে জেরবার হয়ে যায় যে মানুষটা সেই তো বাবা। সন্তানকে অবাধ স্বাধীনতা না দিলে ব্যাকডেটেড, আর অতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়ে অমানুষ হলে ব্যর্থ অভিভাবক। তার সাফল্য আর ব্যর্থতার চুলচেরা বিশ্লেষণ চলে অহরহ। বাবা হলেন সেই মানুষটা যাকে খুব সহজেই ব্যর্থতার তকমা এঁটে দেওয়া যায়। ‘তুমি তো কিছুই করোনি আমাদের জন্য’ বাবার কষ্টের টাকায় বড় হয়ে উঠে এই ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দিই আমরা অক্লেশে। তবুও অভিযোগ নেই, শুধু ভিতরে ভিতরে যন্ত্রণায় দগ্ধ হওয়া ছাড়া কোনও ভাষা থাকে না বাবার মুখে। আঘাত পেলেও তার কষ্ট পাওয়া বারণ/ তিনি যে বাবা হয়তো এটাই তার কারণ।’
জীবন সায়াহ্নে এসে সন্তানের থেকে প্রাপ্তির ঝুলি হিসাবে মায়ের জন্য যদি বা কিছু থাকে, বাবার জন্য তা প্রায় শূণ্য। কিন্তু বাবা কি এতটাই অবহেলার পাত্র? শুধুমাত্র সন্তানের জন্য যাকে সবকিছুই নির্দ্বিধায় ত্যাগ করতে হয়। আদর-শাসন-বিশ্বস্ততার এক মূর্ত প্রতীক তিনি।
“মরিয়া বাবর অমর হয়েছে নাহি তার কোনো ক্ষয়/
পিতৃস্নেহের কাছে হয়েছে মরণের পরাজয়।”
বেশিরভাগ বাবা’ই ভালোবাসি শব্দটা বলতে জানেন না, শুধু করতে জানেন। তারা আজীবন তাদের ভাগের বিলাসিতার ভাগ দিয়ে স্ত্রী সন্তানকে ভালোবেসে যান। কথায় আছে পকেট খালি তবুও, বাবাকে নেই বলতে শুনিনি। আমি বাবার চাইতে, ধনী কাউকে দেখিনি। আমাদের ইচ্ছে পূরণের জন্য তার নিজের ইচ্ছেকে চাপা দিতে তিনি পিছপা হননি। তাই মানুষটার কাছে সন্তানের সুখটাই সবসময় বড়ো হয়ে উঠে।
বাবা, এই শব্দটা শুনলেই মিশ্র এক অনুভূতির জন্ম নেয় মনের মধ্যে কিছুটা ভয়, কিছুটা ভালোবাসা, কিছুটা মনমালিন্য আর অনেকটা ভরসা। তবু বাবার হাত ধরে উঠে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য সব সন্তানের হলেও, হাত ধরে উঠে দাঁড়ানোর সৌভাগ্য সব বাবার হয় না। সময়ের সাথে সাথে সেই ভরসার হাতটাও আলগা হয়ে যায়, মনের মধ্যে জমে থাকা ভালোবাসার গুটি পোকা যখন প্রজাপতি হয়ে উড়তে চায় তখন অজান্তেই ভরসাস্থলটা বদলে যায়।
তারপর ধীরে ধীরে বাবার জায়গা নেয় বাবান, শুরু হয় আর এক পিতৃত্বের পথ চলা। এক পিতৃত্বের দায় নিতে গিয়ে নিজের পিতা হয় উপেক্ষিত। হয়তো পিতাদের এটাই ভবিতব্য।
২৬ মে, ২০২৬

ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য | কলকাতা, পশ্চিম বঙ্গ, ভারত
গীতিকার, কবি, লেখক এবং সমাজকর্মী।
