পড়শী পৃথিবী ও পরিবেশ বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ এবং বর্তমান অবস্থা

বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ এবং বর্তমান অবস্থা

Post Views: 77

বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) একসময় কলেরা ছিল অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা, ছিল বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাব, ছিল সীমিত চিকিৎসা সেবা এবং মুখে খাওয়ার স্যালাইন (ওআরএস) আবিষ্কার ও ব্যাপক ব্যবহার তখনো শুরু হয়নি, ডাবের পানিও ছিল না প্রতুল। প্রতি বছর বহু মানুষ কলেরায় আক্রান্ত হয়ে মারা যেতো।

ষাট দশকের আগে অধিকাংশ মানুষ পুকুর, খাল-বিল, নদী, কূপ ও অন্যান্য ভূপৃষ্ঠস্থ কূপের পানির ওপর নির্ভরশীল ছিল। নলকূপ ছিল খুবই সীমিত এবং ছিল মূলত কিছু সচ্ছল পরিবারের বাড়িতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও সরকারি অফিস আদলতে।অধিকাংশ মানুষের নিরাপদ পানীয় জলের প্রাপ্যতা ছিলনা। সে সময় কলেরা, গুটিবসন্ত, যক্ষ্মা ও টাইফয়েড সম্পর্কে মানুষের ধারণা থাকলেও রোগের জীবাণু, সংক্রমণ ও প্রতিরোধ সম্পর্কে সচেতনতা ছিল না বললেই চলে।

আর্সেনিক
পুকুর ও ডোবার পানি সংগ্রহ

ষাটের দশকে আন্তর্জাতিক সহায়তায় নিরাপদ পানীয় জল, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কর্মসূচি সম্প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে নলকূপ স্থাপন বৃদ্ধি পায় এবং বন্যার পানি ফুটিয়ে বা ফিটকিরি দিয়ে পরিশোধন করে পান করার প্রচারণা চালানো হয়।

2026.07 12 01 02
গ্রাম বাংলার নলকূপের পানি পান, কলসিতে বাড়ী নিয়ে যাচ্ছে শিশু ও বধূরা
আর্সেনিক দূষণের ইতিহাস

স্বাধীনতার পর নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করতে ইউনিসেফের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ১৯৭৩–১৯৭৫ সাল থেকে সারা দেশে ব্যাপকভাবে অগভীর নলকূপ স্থাপন শুরু হয়। ১৯৭৮ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লক্ষ এবং ১৯৯১ সালের মধ্যে প্রায় ২৫ লক্ষ নলকূপ স্থাপিত হয়। ফলে গ্রামীণ বাংলাদেশের প্রায় ৯৫% মানুষ নলকূপের পানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।

2026.07 12 01 03
বর্ষাকালে নলকূপের পানি ব্যবহার

একই সময়ে অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচব্যবস্থার দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটে, যা উচ্চফলনশীল ধানসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং দেশের খাদ্যে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

নলকূপ স্থাপনের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিরাপদ ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করে কলেরা, ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ কমানো এবং কৃষিতে সেচের সুযোগ বৃদ্ধি করা।

যে অগভীর নলকূপ একসময় বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয় জলের উৎস হয়ে আশীর্বাদ বয়ে এনেছিল, প্রায় দুই দশক পর দেশের অনেক অঞ্চলে সেই একই উৎসে প্রাকৃতিক আর্সেনিকের উপস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক গুরুতর সংকটে পরিণত হয়।

 
সর্ব প্রথম কোথায় এবং কিভাবে আর্সেনিক সনাক্ত করা হয়

১৯৯৩ সালের সর্বপ্রথম শনাক্ত হওয়া রোগীদের মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মানুষের রোগীদের হাতে-পায়ে কালো-সাদা দাগ মেলানোসিস, (melanosis), চামড়া মোটা হয়ে যাওয়া কেটারোসিস (keratosis) ইত্যাদি লক্ষণ দেখে চিকিৎসগণ বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ করেন। পরে কুষ্টিয়া, যশোর জেলায় একই রকমের পাওয়া যায়। এরপর দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য জেলায়ও একই ধরনের রোগী শনাক্ত হতে থাকে। রোগীদের জীবন যাত্রার মান পর্যালোচনা করে বুঝতে পারেন,তারা আর্সেনিক বিষক্রিয়া আক্রান্ত, তারা দীর্ঘদিন নলকূপের পানি পান করেছেন এবং রান্নাসহ সব ব্যবহার করেছেন।
বাংলাদেশে আর্সেনিক সনাক্ত করার যন্ত্র ও পরীক্ষার ব্যবস্থা ছিল, তবে শুরু থেকেই তা সব জায়গায় সহজলভ্য ছিল না। মুষ্টমেয় রোগীদের চুল, নখ, প্রস্রাব এবং নলকূপের পানির পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায় যে পানিতে আর্সেনিক রয়েছে। আর্সেনিক যুক্ত পানিই মেলানোসিস এবং কেটারোসিসের কারণ।

 
আর্সেনিকের উপস্থিতি এবং পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়

আর্সেনিকের উপস্থিতি এবং পরিমাণ পরীক্ষাগারে নির্ধারণ করা হয়, Atomic Absorption Spectrophotometer (AAS), বিশেষ করে Hydride Generation AAS-এর মাধ্যমে। বর্তমানে আরও উন্নত যন্ত্র ICPM এবং ICPM-MS- এর মাধ্যমে আর্সেনিকের পরিমাণ নির্ণয় করা হয়।

সারা দেশে লক্ষ লক্ষ নলকূপ দ্রুত পরীক্ষা করার জন্য আর্সেনিক টেস্ট কিট (Field Test Kit) ব্যবহার করা হয়। এই কিটের সাহায্যে মাঠ পর্যায়েই পানি পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল, যদিও এটি ল্যাবরেটরির যন্ত্রের মতো সম্পূর্ণ নির্ভুল ছিল না। বাংলাদেশে বৃহৎ পরিসরে আর্সেনিক টেস্ট কিট (Arsenic Test Kit) সংগ্রহ ও ব্যবহার মূলত বিদেশি উন্নয়ন সহযোগীদের আর্থিক সহায়তায় করা হয়েছিল। ১৯৯৫-এর মাঝামাঝি থেকে এবং বিশেষ করে ১৯৯৮–২০০৫ সালের মধ্যে, দেশের লাখ লাখ নলকূপ পরীক্ষা করার জন্য সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার অর্থায়নে টেস্ট কিট ক্রয় করে। এই অর্থায়নের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে লক্ষ লক্ষ নলকূপ পরীক্ষা করা হয় এবং নিরাপদ নলকূপে সবুজ ও অনিরাপদ নলকূপে লাল রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। টেস্ট কিট বিদেশি নির্মাতাদের কাছ থেকে আমদানি করা হয়েছিল, আবার কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় প্রতিষ্ঠানও কিট সরবরাহ বা প্রস্তুত করেছিল। সামগ্রিক কর্মসূচির অর্থায়নের একটি বড় অংশই আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে এসেছিল। এ কর্মসূচিতে উল্লেখযোগ্য ভাবে সহায়তা করে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ), বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (ডিএফআইডি), ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (ড্যানিডা), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), সুইস উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংস্থা (এসডিসি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও; কারিগরি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা)।

প্রথমে ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে নলকূপের পানিতে আর্সেনিক দূষণ শনাক্ত হয় এবং পরবর্তীকালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE), বিভিন্ন জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণা ও জরিপে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে দেশের বহু অঞ্চলের অগভীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক বিদ্যমান। বিষয়টি দ্রুতই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে।

2026.07 12 01 04
আর্সেনিক বিষাক্ততা

প্রথমদিকে বাংলাদেশে আর্সেনিক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগার ও যন্ত্রপাতি সীমিত ছিল। বিপুল সংখ্যক নলকুপের পানি পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

বিপুল সংখ্যক নলকূপ দ্রুত পরীক্ষা করার জন্য আর্সেনিক টেস্ট কিট ব্যবহার করা হয়, যদিও এর নির্ভুলতা পরীক্ষাগার ভিত্তিক বিশ্লেষণের তুলনায় কিছুটা কম। ১৯৯৫ সালের পর এবং বিশেষ করে ১৯৯৮–২০০৫ সময়কালে সরকার আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে ব্যাপক সংখ্যক টেস্ট কিট সংগ্রহ করে। এসব কিটের মাধ্যমে লাখ লাখ নলকূপ পরীক্ষা করে নিরাপদ নলকূপে সবুজ এবং আর্সেনিকযুক্ত নলকূপে লাল রঙের চিহ্ন দেওয়া হয়।

2026.07 12 01 07
নিরাপদ ও অনিরাপদ নলকূপ

কিটের অধিকাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করা হলেও কিছু দেশীয় প্রতিষ্ঠানও এগুলো প্রস্তুত বা সরবরাহ করেছিল।এই কর্মসূচিতে আন্তর্জাতিক সংস্থা; ইউনিসেফ (UNICEF), বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিভাগ (DFID), ডেনিশ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (DANIDA), জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (JICA), সুইস উন্নয়ন ও সহযোগিতা সংস্থা (SDC) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা প্রদান করে।

বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তর, জাতীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার পরীক্ষা ও জরিপে প্রমাণিত হয়, দেশের বহু অঞ্চলের অগভীর ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে আর্সেনিক বিদ্যমান। এ সংকট দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগের কারণ হয়ে ওঠে এবং বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক দূষণপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত হয়।

 
আর্সেনিকের ধরন, শনাক্তকরণ ও পরীক্ষার পদ্ধতি

বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির অক্সিজেন স্বল্প (reducing) পরিবেশে প্রধানত আর্সেনাইট (As³⁺) এবং অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে আর্সেনেট (As⁵⁺) বিদ্যমান। এর মধ্যে আর্সেনাইট আর্সেনেটের তুলনায় অধিক বিষাক্ত এবং মানবস্বাস্থ্যের জন্য বেশি ক্ষতিকর।

পানিতে আর্সেনিকের উপস্থিতি ও মাত্রা নির্ণয়ে মূলত Atomic Absorption Spectrophotometer (AAS), বিশেষ করে Hydride Generation AAS, ব্যবহৃত হতো। বর্তমানে অধিক নির্ভুল ICP-MS (Inductively Coupled Plasma Mass Spectrometry) প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে।

 
আর্সেনিক বিষক্রিয়ার কার্যপ্রণালি (Mechanism of Arsenic Poisoning)

পানির সংস্পর্শে এসে এগুলো রাসায়নিকভাবে হাইড্রোলাইসিস/দ্রবীভূত হয়ে বিভিন্ন আর্সেনিক প্রজাতি (species) তৈরি করে।

As₂O₃ + H₂O → As(III) (মূলত arsenious acid, H₃AsO₃, যা আর্সেনাইট [As(III)] রূপে থাকে)
As₂O₅ + H₂O → As(V) (মূলত arsenic acid, H₃AsO₄, যা আর্সেনেট [As(V)] রূপে থাকে)

আর্সেনাইট [As(III)] এনজাইমের সালফহাইড্রিল (–SH) গ্রুপের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত পাইরুভেট ডিহাড্রোজেনেজ হয়ে (Pyruvate Dehydrogenase) এনজাইম কমপ্লেক্সকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে পাইরুভেট থেকে অ্যাসিটাইল-কোএ (Acetyl-CoA) তৈরি ব্যাহত হয়, কোষীয় শ্বসন ব্যাহত হয় এবং ATP উৎপাদন কমে যায়। অন্যদিকে, আর্সেনেট [As(V)] ফসফেটের পরিবর্তে বিভিন্ন জৈব-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশ নিয়ে এটিপি (ATP) সংশ্লেষণ ব্যাহত করে। এছাড়া আর্সেনিক ROS (Reactive Oxygen Species) উৎপাদন বৃদ্ধি করে, যা ডিএনএ, প্রোটিন ও কোষঝিল্লির ক্ষতি করে এবং অক্সিডেটিভ স্ট্রেস সৃষ্টি করে।

 
বর্তমান অবস্থা ও স্বাস্থ্যগত প্রভাব

দীর্ঘদিন আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করলে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদিও আর্সেনিক বিষক্রিয়ার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণ ত্বকের ক্ষত (আর্সেনিকোসিস), বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক এক্সপোজার কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাস, দীর্ঘমেয়াদি কিডনি রোগ (Chronic Kidney Disease) এবং বিরল ক্ষেত্রে কিডনি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশে আর্সেনিক-আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর ওপর পরিচালিত গবেষণায় কিডনির কার্যকারিতা এবং কিডনির ক্ষতির জৈব-সূচক ক্রিয়েটিনিন মূল্যায়ন করা হয়েছে। এসব গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক এক্সপোজারের সঙ্গে কিডনির কার্যক্ষমতা হ্রাসের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। এছাড়া চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিবেদনে আর্সেনিক-আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে কিডনি ক্যান্সারের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে বাংলাদেশে আর্সেনিকজনিত কিডনি রোগ বা কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর সুনির্দিষ্ট জাতীয় পরিসংখ্যান প্রকাশিত হয়নি। কারণ রোগ নিবন্ধনে (Registry) কিডনি রোগ বা ক্যান্সারের কারণ হিসেবে আর্সেনিককে আলাদাভাবে নথিভুক্ত করা হয় না।

একইভাবে, আর্সেনিক দূষণজনিত ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীরও কোনো নির্ভুল জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক এক্সপোজার ত্বক, ফুসফুস, মূত্রথলি, যকৃত এবং কিডনির ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করে।

একটি বহুল উদ্ধৃত গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিক দূষণের কারণে ফুসফুস, মূত্রথলি ও যকৃতের ক্যান্সারে মৃত্যুর আজীবন ঝুঁকি প্রায় দ্বিগুণ হতে পারে। এছাড়া ২০১৫ সালের একটি স্বাস্থ্যঝুঁকি মূল্যায়ন গবেষণায় অনুমান করা হয়েছে যে, সারা জীবনের আর্সেনিক এক্সপোজারের ফলে বাংলাদেশে প্রায় ১১.৫ লক্ষ (১.১৫ মিলিয়ন) অতিরিক্ত ক্যান্সারের ঘটনা ঘটতে পারে। তবে এটি একটি মডেলভিত্তিক আজীবন ঝুঁকির (lifetime risk) হিসাব; এটি বাস্তবে শনাক্ত রোগীর সংখ্যা নয়।

১৯৯৩ সালে শনাক্ত প্রথম রোগীদের শরীরে আর্সেনিকের সুনির্দিষ্ট মাত্রা (µg/L বা µg/g) প্রকাশিত গবেষণায় উল্লেখ নেই। তবে গবেষণায় রোগীদের প্রস্রাব, চুল ও নখে স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক পাওয়া যায়।প্রথমদিকে আক্রান্ত এলাকার নলকূপগুলো মূলত টেস্ট কিটের মাধ্যমে শনাক্ত করা হলেও পরে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে ফলাফল নিশ্চিত করা হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নির্দেশিকা অনুযায়ী, পানীয় জলে আর্সেনিকের গ্রহণযোগ্য সর্বোচ্চ মাত্রা ১০ মাইক্রোগ্রাম/লিটার, যদিও বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড ৫০ মাইক্রোগ্রাম/লিটার। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE) দেশের পশ্চিমাঞ্চলের বিভিন্ন নলকূপে ৫৯–৩৮৮ মাইক্রোগ্রাম/লিটার আর্সেনিক শনাক্ত করে।

১৯৯৬–২০০২ সালের গবেষণায় দেখা যায়, আর্সেনিক আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রায় ৯৪% প্রস্রাব, ৯৫% নখ এবং ৯৬% চুলের নমুনায় স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক ছিল। এছাড়া IARC (International Agency for Research on Cancer) আর্সেনিক ও অজৈব আর্সেনিক যৌগকে মানুষের জন্য নিশ্চিত ক্যান্সার সৃষ্টিকারী (Group 1 Carcinogen) হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে। অন্যদিকে, প্রায় ১০০–৩০০ মিলিগ্রাম আর্সেনিক ট্রাইঅক্সাইড গ্রহণ প্রাণঘাতী হতে পারে; এটি পাকস্থলী ও অন্ত্রে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি করে এবং পেটব্যথা, বমি, বমিভাব ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ দেখা দেয়।

 
আর্সেনিক বিষক্রিয়ার বর্তমান অবস্থা ও বাংলাদেশে প্রশমন কার্যক্রম

আর্সেনিক বিষক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ সরকার দ্রুত জাতীয় আর্সেনিক নীতি ও প্রশমন কর্মপরিকল্পনা (২০০৪) প্রণয়ন করে। এর আওতায় সারা দেশে নলকূপ পরীক্ষা ও চিহ্নিতকরণ, গভীর নলকূপ স্থাপন, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর-বালু ফিল্টার ও পরিশোধিত ভূপৃষ্ঠের পানি ব্যবহারের প্রসার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পানি পর্যবেক্ষণ এবং আর্সেনিক অপসারণ প্রযুক্তি ও গবেষণায় সহায়তাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়।

 
আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যা

২০১২ সালের গৃহস্থালি জরিপে দেশে ৬৫,৯১০ জন আর্সেনিকোসিস রোগী শনাক্ত হয়। ২০২০–২০২৬ সময়কালের জন্য নতুন আক্রান্ত রোগীর জাতীয় পরিসংখ্যান সরকার প্রকাশ করেনি। তবে ২০২৩ সালে জাতীয় সংসদে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, দেশে ৭,৭৭৬ জন নিবন্ধিত আর্সেনিকোসিস রোগী রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি উল্লেখ করেন, ২০১২ সালের পর রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং এ পর্যন্ত ৭৯ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের স্বাস্থ্য বুলেটিন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮,০০০, যার মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগ ও কুমিল্লা জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতি বছর নতুন রোগীর পৃথক পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না।

 
বর্তমান পরিস্থিতি

বাংলাদেশ আর্সেনিক সমস্যা মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও সমস্যাটি এখনও পুরোপুরি সমাধান হয়নি। দেশের মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু অগভীর নলকূপে প্রাকৃতিকভাবে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিক রয়েছে। বর্তমান গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ বাংলাদেশের জাতীয় মানদণ্ড অতিক্রমকারী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমা অতিক্রমকারী আর্সেনিকযুক্ত পানি প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মানুষ ব্যবহার করে। যদিও ২০০০-এর দশকের শুরুতে এই ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা আনুমানিক ৩.৫–৫ কোটি ছিল, তবুও আর্সেনিক এখনও দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সমস্যা।

 
প্রশমন কার্যক্রমে অগ্রগতি

বাংলাদেশ আংশিকভাবে সফল হয়েছে। উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • লক্ষ লক্ষ নলকূপ পরীক্ষা করে নিরাপদ ও অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিতকরণ।
  • দূষিত অগভীর নলকূপের পরিবর্তে নিরাপদ নলকূপ ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান।
  • হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন।
  • আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ সম্প্রসারণ।
  • জনসচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি।

দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিকের সংস্পর্শ কমার ফলে হৃদ্‌রোগ, ক্যানসারসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও কমেছে।

 
আর্সেনিক প্রশমনে বাংলাদেশী বিজ্ঞানীর অবদান

বাংলাদেশে আর্সেনিক দূষণ শনাক্ত হওয়ার পর, বিশেষ করে ১৯৯৩–২০০৫ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ও ভূতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমূহ, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা আর্সেনিকের উৎস, বিস্তার, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রতিকার নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। তাঁদের গবেষণার ফলাফল বহু আন্তর্জাতিক, পিয়ার-রিভিউড বৈজ্ঞানিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের গ্রেজুয়েট বাংলাদেশের জন্মগ্রহণকারী মার্কিন নাগরিক রসায়নবিদ অধ্যাপক ড. আবুল হুসসাম বাংলাদেশের ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক দূষণ মোকাবিলায় উদ্ভাবন করেন স্বল্পমূল্যের ও কার্যকর SONO Filter। এই ফিল্টারে বিশেষভাবে প্রস্তুতকৃত Composite Iron Matrix (CIM), বালি, কাঠকয়লা ও ইটের কুচি ব্যবহার করে আর্সেনিক অপসারণ করা হয়।

2026.07 12 01 06
SONO filter

ফিল্টারটি বিদ্যুৎ বা রাসায়নিক যৌগ ছাড়াই সহজে ব্যবহার করা যায় এবং বাংলাদেশের হাজার হাজার পরিবারকে নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এই অসামান্য উদ্ভাবনের জন্য ২০০৭ সালে তিনি National Academy of Engineering প্রদত্ত Grainger Challenge Prize for Sustainability-এর স্বর্ণ পদক এবং ১০ লক্ষ (US$1 million) ডলারের পুরস্কার লাভ করেন। একই বছর টাইম মেগাজিন তাঁকে বিশ্বের Heroes of the Environment-এর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এলামনাইকে তাঁর অবদানের জন্য ২০০৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনারারি পিএইচডি প্রদান করে।

 
প্রধান চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের প্রশমন কার্যক্রম আংশিকভাবে সফল হয়েছে। লক্ষ লক্ষ নলকূপ পরীক্ষা করে নিরাপদ ও অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, দূষিত অগভীর নলকূপের পরিবর্তে নিরাপদ নলকূপ ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে, হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে, আর্সেনিকপ্রবণ এলাকায় পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ সম্প্রসারণ করা হয়েছে এবং জনসচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, আর্সেনিকের সংস্পর্শ কমার ফলে হৃদ রোগ, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দীর্ঘস্থায়ী রোগে মৃত্যুর ঝুঁকিও হ্রাস পেয়েছে।

তবুও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক বসতবাড়ি নিরাপদ নলকূপ থেকে দূরে। বহু নলকূপ এখনও পরীক্ষা করা হয়নি বা পুনঃপরীক্ষার প্রয়োজন। অনেক পানি পরিশোধন ব্যবস্থা ও কমিউনিটি ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকার্যকর। নিরাপদ পাইপ লাইনের পানি সরবরাহ এখনও পর্যাপ্তভাবে সম্প্রসারিত হয়নি।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানির প্রাপ্তি সীমিত।

 
সার্বিক মূল্যায়ন

বাংলাদেশ আর্সেনিকের সংস্পর্শে থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখ্য যোগ্য ভাবে কমাতে সক্ষম হয়েছে এবং আর্সেনিকোসিস রোগীর সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে। তবে সবার জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে আর্সেনিক সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করলেও এটিকে এখনও অসম্পূর্ণ সাফল্য বলা যায়। কিন্ত এটাও সত্য বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে, গ্রাম-গঞ্জে কোমল পানিয়ের সাথে সুপেয় পানি বোতলে পাওয়া যায়।

বাংলাদেশ আর ২০০০-এর দশকের শুরুর মতো তীব্র আর্সেনিক সংকটে নেই। সরকারি ও উন্নয়ন সহযোগীদের বিভিন্ন উদ্যোগে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা ও জনসচেতনতা বেড়েছে এবং স্বাস্থ্যগত সুফলও মিলেছে। তবুও কোটি মানুষ এখনও নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানির ওপর নির্ভরশীল। তাই নিরাপদ পানির অবকাঠামো সম্প্রসারণ, নিয়মিত নলকূপ পরীক্ষা এবং পাইপ লাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ আরও সম্প্রসারণ করা ভবিষ্যতেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আর্সেনিক সমস্যা মোকাবিলায় বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করলেও এটিকে এখনও সম্পূর্ণ সাফল্য লাভ করেছে বলা যায় না।

৬ জুলাই, ২০২৬


ঢাকা, বাংলাদেশ

অধ্যাপক এবং প্রাক্তন সভাপতি, রসায়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়।


Previous
Next

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

দীর্ঘ বিরতির পর আবার ফিরে এসেছে বিশ্ববাঙালির প্রিয় পত্রিকা ‘পড়শী’।
নব উদ্যমের এই যাত্রায় আপনার মতো গুণী মানুষের সৃজনশীল লেখা ও সাহচর্য আমাদের কাম্য।

প্রকাশিত সকল লেখা ও মতামতের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে সংশ্লিষ্ট লেখকের,
এর জন্য ‘পড়শী’ কর্তৃপক্ষ দায়ী নয়।