বৈশাখের স্মৃতি, বিভাজনের রাজনীতি

লীনা দিলরুবা | মার্চ ২২, ২০২৬
April 16, 2026

স্মৃতি মানুষের জীবনের এক অনিবার্য অংশ; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা শুধু বদলায় না, বরং গভীরতাও পায়। আমার জীবনের পথচলায় বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা যেন আলাদা আলাদা রঙে আঁকা। বৈশাখের স্মৃতির কথা ভাবলে অবধারিতভাবে ছেলেবেলার স্মৃতিই বেশি মনে পড়ে।

শৈশব এবং কৈশোরের বৈশাখ কেটেছে ফেনীতে, আমার জন্মস্থানে। মফস্বল শহরের সরলতা, আর ঢাকার নগর জীবনের জটিলতায় মোড়া সব বয়সের অভিজ্ঞতার বৈশাখের কথা ভাবলে মনে হয়, বৈশাখ মানে শুধু উৎসব নয়, এটি বাঙালির ঐতিহ্য, অন্যদিকে সামাজিক ও ধর্মীয়-রাজনৈতিক দ্বন্দ্বেরও অংশ।

ছোটবেলার বৈশাখ ছিল নিখাদ আনন্দের। ফেনীর সেই দিনগুলোতে পহেলা বৈশাখ মানে ছিল পান্তা-ইলিশের গন্ধ, আর নতুন জামার উচ্ছ্বাস। সেই দিনগুলোতে বৈশাখ কোনো বিতর্কের বিষয় ছিল না; বরং সেটি লাল-নীল রঙে মিশে থাকত। নতুন বছরের সূচনা, নতুন আশার বীজ বোনা—সব মিলিয়ে আনন্দের দিন।

বৈশাখের সকালে আমাদের ছোট্ট পাড়াটা নতুন রঙ পেতো। রেললাইনের দুই পাশে গড়ে ওঠা পাড়া, যার নাম ছিল বনানীপাড়া। অধিকাংশ বাড়ির মালিক প্রাচীন হিন্দু পরিবার থেকে জমি কিনে বাড়ি করেছিল। বনানীপাড়ার শেষ মাথায় বিরাজ মজুমদারদের বাড়ি। বৈশাখের কয়েকটি দিন তারা পুরো পাড়াকে গান-বাজনায় উৎসবমুখর রাখত।

দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলে ভাইবোন এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে বৈশাখী মেলায় যেতাম। মেলা আয়োজিত হতো পাড়া থেকে মাইল খানেক দূরে, একটা মাঠের পাশে বটগাছের নিচে। মা-বাবার তরফ থেকে আমাদের জন্য নির্ধারিত থাকত দশ-বিশ টাকা। এই টাকায়ই হাত ভরে কেনাকাটা করতাম। রঙিন বাঁশি, কাঠের ঘোড়া, পুতুল, বাতাসা, এমন আরও কত কী! তখন ছোট ছোট আনন্দগুলোই ছিল আমাদের বৈশাখের আসল আনন্দ। সে-সময় চারপাশে ধর্মের কোনো বিভাজন ছিল না। হিন্দু-মুসলমান সবার জন্যই দিনটি ছিল সমান আনন্দের।

মানুষের জীবন তো রূপান্তরের অন্য নাম। ছেলেবেলায় চারপাশে ছিল খোলা মাঠ, রেললাইন, কাঁচা রাস্তা, আর অবাধ স্বাধীনতা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে যাওয়া, পুকুরে সাঁতার কাটা, কাঁচা আম খাওয়া। জীবন নিয়ে কোনো গভীর অর্থ বোঝার তখন প্রয়োজন ছিল না। বৈশাখ মানে ছিল ছুটি আর আনন্দ। ধর্ম, রাজনীতি, সমাজের বিভাজন—কিছুই ছিল না সামনে। আমাদের ছোট্ট পৃথিবী ছিল একেবারেই আলাদা, নির্ভেজাল, নির্মল।

বড় হয়ে বুঝলাম, জীবন এত সরল নয়। বৈশাখও এখন আর শুধু উৎসব নয়; এটি বিতর্কেরও কেন্দ্র। ধর্মীয় ব্যাখ্যা, রাজনৈতিক বক্তব্য—সবকিছু মিলিয়ে বৈশাখের সরলতা যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। বস্তুত কৈশোর পার হবার সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু বদলাতে শুরু করেছিল। তখন আর আনন্দে ডুবে থাকা যায়নি, বরং মন জর্জরিত ছিল নানা প্রশ্নে।

ঢাকায় এসে দেখলাম, সবকিছু দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। বৈশাখ উদযাপিত হচ্ছে বড় পরিসরে। রঙিন শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, মানুষের উচ্ছ্বাস—সব মিলিয়ে এক বিশাল আয়োজন। কিন্তু একসঙ্গে দ্বন্দ্বও স্পষ্ট। সংবাদ মাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বৈশাখ নিয়ে বিতর্ক দেখা যেত। কেউ বলছে এটি বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রতীক, আবার কেউ বলছে এটি ধর্মবিরোধী। এতসব বিতর্কের ভিড়ে নিজের অবস্থান খুঁজে পাওয়া ছিল মুশকিল।

ঢাকার এই অভিজ্ঞতা আমাকে শিখিয়েছে, সমাজে ঐক্য যেমন আছে, তেমনি অনৈক্যও আছে। অনৈক্য সবসময় নেতিবাচক নয়; বরং এটি সমাজের বহুমাত্রিকতার প্রকাশ। সমস্যা তৈরি হয়, যখন মতভেদগুলো সহিংসতা বা বিদ্বেষে রূপ নেয়। মানুষ নিজের ঐতিহ্য ভুলে যায়। কারণ বৈশাখ তো শুধু সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; এটি বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। বৈশাখ কোনো ধর্মের নয়; বরং এটি বাঙালির সামষ্টিক পরিচয়ের প্রতীক।

বাঙালির সবচেয়ে বড় শক্তি তার সংস্কৃতি, কিন্তু একই সঙ্গে তার দুর্বলতাও এই বিভাজন। একদিকে ঐক্যের কথা বলা হয়, অন্যদিকে ছোট ছোট বিষয়ে সবাই বিভক্ত হয়ে যায়। আবার দেখি, এই অনৈক্যের মধ্যেও আশা আছে, বড় কোনো সংকট এলে আমরা আবার এক হয়ে দাঁড়াই। এটিই প্রমাণ করে, আমাদের ভেতর ঐক্যের বীজ এখনো জীবিত।

সেই বোঝাপড়ার জায়গা থেকেই আমি বিশ্বাস করি, বাঙালির কাছে তার হাজার বছরের ইতিহাস প্রধান, সংস্কৃতি প্রধান, স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট প্রধান, ঐতিহ্য প্রধান। এই সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। তাই এই সংস্কৃতিতে কোনো বিভাজন আমরা মেনে নিতে পারি না। মতভেদ থাকতে পারে, আলোচনা থাকতে পারে, কিন্তু তা কখনোই আমাদের একতার ভিত্তি নষ্ট করতে পারে না।

শেষ পর্যন্ত আমরা সবাই একই স্রোতের অংশ। এই কথাটি শুধু আবেগঘন উচ্চারণ নয়, বরং এটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সত্যের সারাংশ। আবার একই ইতিহাস, একই সংস্কৃতি, একই স্বপ্ন– এই ধারণাগুলো বিশ্লেষণাত্মকভাবে দেখলেও বোঝা যায়, এগুলো কোনো একরৈখিক অভিজ্ঞতার ফল নয়; বরং সমাজে দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা বহুমাত্রিক প্রক্রিয়ার নির্যাস।

সমাজে সংস্কৃতির ভিন্নতা থাকলেও একটি সামষ্টিক সাংস্কৃতিক চেতনা গড়ে ওঠা সম্ভব, যা মানুষকে বৃহত্তর পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত করে। স্বপ্ন সবসময় ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীভেদে ভিন্ন হলেও, মৌলিক আকাঙ্ক্ষা থাকে—স্বাধীনতা, মর্যাদা, উন্নতি, মানবিক সমাজের নির্মাণ। এই স্বপ্নের বাস্তবায়নে মতভেদ স্বাভাবিক।

এই প্রেক্ষাপটে বৈশাখকে একটি উজ্জ্বল প্রতীক হিসেবে দেখা যায়। কারও কাছে এটি নিছক উৎসব, কারও কাছে জাতীয় পরিচয়ের বহিঃপ্রকাশ, আবার কারও কাছে প্রশ্নবিদ্ধ একটি চর্চা। বৈশাখের বহুমাত্রিক ব্যাখ্যাই প্রমাণ করে যে, প্রতীক কখনো সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। সময়, প্রেক্ষিত এবং ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা নতুন নতুন অর্থ লাভ করে।

এখানেই আসে ’আমরা ভিন্ন হতে পারি, কিন্তু বিচ্ছিন্ন নই’—এই ধারণা। ভিন্নতা সমাজের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। বরং ভিন্নতা না থাকলে সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে। আবার ভিন্নতা অসহিষ্ণুতায় রূপ নিলে জন্ম নেয় বিচ্ছিন্নতা। তাই বিভাজন মুছে ফেলা নয়, বরং তাকে সহাবস্থানের এমন জায়গায় নিতে হবে যেখানে বৈচিত্র্যই ঐক্যের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।


লীনা দিলরুবা | ঢাকা, বাংলাদেশ

ফিচার লেখক, ব্লগার ও ব্যাংকার। লেখালেখির মূল বিষয় বইয়ের পর্যালোচনা। জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে গবেষণাধর্মী লেখা লিখেছেন।

Previous Story

বাঙালির পয়লা বৈশাখ: শিকড়ের টান ও সময়ের বিবর্তন

Next Story

পয়লা বৈশাখ: বাঙালি জাতিসত্ত্বার মাইল ফলক

Latest from সমসাময়িক বিষয়

বৈশাখী যতন

পুতুল বিয়ের পরেই কেমন মনখারাপের পালা, মেয়ের মা-কে উজাড় করে সবটা দেওয়ার জ্বালা। - কবিতাটি রচনা করেছেন ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য।