পয়লা বৈশাখ: বাঙালি জাতিসত্ত্বার মাইল ফলক

আনিস আহমেদ | মার্চ ৩০, ২০২৬
April 16, 2026

পয়লা বৈশাখ সাধারণ অর্থে একটি তারিখ কেবল নয়, এমন কী কেবল নববর্ষ নয়। বাঙালীর অকৃত্রিম অস্তিত্বের সঙ্গে পয়লা বৈশাখের যে সম্পর্ক তা এতটাই আত্মিক যে বাঙালি ও পয়লা বৈশাখকে পৃথক করে দেখার কোন অবকাশই নেই। বাঙালির এই উত্সবকে বাংলাদেশে আমরা অনুভব করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে থেকেই। সেজন্যই যদি বলি যে আমাদের স্বাধীনতা দিবস কিংবা বিজয় দিবস আমাদের স্বাধীন অস্তিত্বকে তুলে ধরে তাতে যেমন বিন্দুমাত্র কোন সন্দেহ নেই তেমনি মানতেই হবে পয়লা বৈশাখ আমাদের সামগ্রিক জাতি সত্ত্বাকে উপস্থাপন করে ঐতিহাসিক ভাবেই। বস্তুত বাংলা নববর্ষের সঙ্গে আমাদের সংযোগ বহুকালের, সম্পৃক্তি আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামেরও। বাংলা নববর্ষের সাংস্কৃতিক দিকটিই আমাদের একেবারে মৌলিক দিক এবং এই পয়লা বৈশাখ উদযাপনকে কেন্দ্র করে বাঙালিকে লড়তে হয়েছে কিছু উগ্রবাদীর বিরুদ্ধে যেমন, তেমনি তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠির বিরুদ্ধেও। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বাংলা নববর্ষ পালন করার প্রথা বহু পুরোনো কিন্তু শহরে হালখাতা হিসেবেই এই পয়লা বৈশাখকে দেখতেন অনেকেই। পয়লা বৈশাখের প্রাথমিক পরিচয় ছিল শহুরে ব্যবসায়ীদের কাছে হালখাতা হালনাগাদ করার একটা উপলক্ষ্য মাত্র। সেই সময়ে দোকানিরা ক্রেতাদের মিষ্টিমুখ করাতেন, বিশেষত হিন্দু ব্যবসায়ীরা কিন্তু পয়লা বৈশাখকে আত্মপরিচিতির অনুষ্ঠান হিসেবে অনুভব করার কোন ভাবনা অন্তত ব্যবসায়ী মহলে সেই সময়ে ছিল না।

তবে পাকিস্তান আমলের দ্বি-জাতি তত্ত্বের মূল ভ্রান্তিটা যখন বাংলাদেশের মানুষ উপলব্ধি করলো তখন থেকে জাতির সেই ভুল সংজ্ঞা সংশোধিত হলো। রাজনৈতিক সুবিধাবাদিতার কারণে ১৯৪৭ সালের কিছু রাজনীতিক যখন হিন্দু ও মুসলমান এই দু’টি ধর্মাবলম্বী মানুষকে পৃথক জাতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করলেন তখন সাম্প্রদায়িকতা প্রবল আকার ধারণ করে। ইংরেজদের ‘ডিভাইড এন্ড রুল’ শীর্ষক কূট কৌশলও সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে উত্সাহিত করে। কিন্তু জাতিতো ধর্ম দ্বারা সংজ্ঞায়িত হতে পারে না। জাতি সংজ্ঞায়িত হয় তার আবাসভূমির বৈচিত্র, তার ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উপাদানের মাধ্যমে। কোন ধর্মই কোন জাতির নিয়ামক শক্তি হতে পারে না। তার সংস্কৃতি, তার পোশাক-আশাক, তার খাদ্যাভ্যাস, তার সাহিত্য ও সঙ্গীত এ সব কিছুই হয় জাতির মূল উপাদান। ধর্ম সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়, সেটি আধ্যাত্মিক ব্যাপার। তবে পাকিস্তান আমলে ২৩ বছর ধরে এই জাতির ভুল সংজ্ঞা দিয়ে বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতিকে দমন করা হয়েছে। ইতিহাসের এও এক মজার বিষয় যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বাঙালিত্বের সংজ্ঞা দিয়েছে বদলে। ধর্মবিশ্বাসে যারা মুসলমান তারা যে বাঙালি নয়, এ ব্যাপারে কট্টর ইসলামপিন্থরা যেমন তেমনি এই বিশ শতকের গোড়ার দিকে হিন্দুরাও তেমনটিই মনে করতেন। সম্ভবত সে কারণেই বাংলাদেশ নামের ভাষা ও সংস্কৃতি ভিত্তিক একটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করতে পারেননি নীরদ চন্দ্র চৌধুরীর মতো পন্ডিত ব্যক্তিরাও। কারণ নীরদ চৌধুরী তখনও ঐ কুড়ি শতকের গোড়ার দিকের ধারণাতেই নিজেকে আবদ্ধ রেখেছিলেন। শরৎচন্দ্রের উপন্যাসেও আমরা পড়ি, বাঙালি ও মুসলমানদের মধ্যে ফুটবল ম্যাচ হবার খবর, কারণ ঊনিশ শতকের এমন কী বিশ শতকের গোড়ার দিকেও বাংলায় কেবলমাত্র হিন্দু বাঙালিদেরই বাঙালি বলা হয়েছে, মুসলমান বাঙালিরা ছিলেন কেবলই মুসলমান। আর তাতে এক শ্রেণীর কট্টরপন্থি মুসলমানরা বরঞ্চ খুশিই হয়েছিলেন। তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়কেই বড় করে দেখার চেষ্টা করেছেন। লক্ষ্য করুন, বাঙালি মুসলমানের যে পরিচিতি সঙ্কটের কথা আমরা শুনি এর জন্য হিন্দু ও মুসলমান উভয়ই দায়ি। বোধ হয় নীরদ চন্দ্র চৌধুরীদের সঙ্গে গোলাম আজমদের মানসিক দূরত্বটা খুব বেশি নয়।

বাংলাদেশের মানুষের সৌভাগ্য যে একটি সফল সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তারা তাদের পরিচিতিকে সুনিশ্চিত করেছে এবং ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে নৃতাত্বিক বা জাতিগোষ্ঠিগত পরিচয়ে তারা সবাই বাঙালি। সে জন্যই বাংলাদেশে ঈদ কিংবা পূজাকে ছাপিয়ে প্রধান হয়ে দাঁড়িয়েছে পয়লা বৈশাখ। এক সময়কার হালখাতা মলাটের বাইরে এসে রূপান্তরিত হলো পয়লা বৈশাখের এক সর্বজনীন উৎসবে। পাকিস্তানি প্রতিবন্ধকগুলো অতিক্রম করেই তদনীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে সেই ১৯৬১ সালে কবিগুরুর জন্মের শতবার্ষিকী উদযাপন করা হয় বিচারপতি মাহবুব মোর্শেদের নেতৃত্বে গঠিত কমিটির মাধ্যমে। এই ষাটের দশকের গোড়ার দিকেই বাংলা নববর্ষ উদযাপনের উদ্যোগ নেয় ছায়ানট। প্রথমে ঢাকার বলধা গার্ডেনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পয়লা বৈশাখকে বরণ করা হয়। সেই সময়ে যাঁরা এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন ওয়াহিদুল হক, সনজিদা খাতুন প্রমুখ। আয়োজকরা উগ্রবাদিদের কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হন কারণ এই বাংলা বর্ষবরণকে কট্টরপন্থি এক শ্রেণীর মুসলমান সহজে মেনে নিতে পারছিলেন না। অথচ তারা অনেকেই জানতেনই না যে আজকের এই বাংলা বর্ষপঞ্জী প্রণয়ন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর। পুরোনো আমলের বর্ষপঞ্জিকে বদলিয়ে দিয়ে মুসলমান শাসকরা প্রথমে চালু করেছিলেন হিজরি সন। কিন্তু তাতে বিপত্তি দেখা গেল খাজনা আদায় করতে গিয়ে। চান্দ্র বছর বা হিজরি বছর প্রতি বছর ১১ দিন করে এগোতে থাকে এবং এর ফলে কৃষিজমির খাজনা দেয়ার সময়ের এই পরিবর্তন করদাতাদের সমস্যার মুখে ফেলে। সম্রাট আকবর তখন হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে যে সৌর বত্সর চালু করেন, সেটিই হচ্ছে আজকের বঙ্গাব্দ। অতএব বাংলা নতুন বছরের সঙ্গে ধর্মের কোন রকমেরই সম্পৃক্ততা নেই। যাঁরা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের বিরোধীতা করেছিলেন তাঁরা আসলে বাঙালি সংস্কৃতিকেই অবদমন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু না, বাঙালি সে কথা মেনে নেয়নি। ক্রমশই বাংলা নববর্ষ উদযাপন উপলক্ষ্যে পয়লা বৈশাখ জনসমাগম বাড়তেই থাকে এবং ১৯৬৭ সাল থেকে রমনার বটমূলে প্রায় কোন রকম বিরতি ছাড়াই এই উত্সব উদযাপিত হতে থাকে। ব্যতিক্রম ছিল ১৯৭১ সাল, যখন পাকিস্তানের দখলদার বাহিনী এলো, অবরুদ্ধ বাংলাদেশে পয়লা বৈশাখ পালন করা সম্ভব হয়নি। করোনার কারণে জনস্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার কারণেও রমনার বটমূলে পয়লা বৈশাখ আয়োজিত হতে পারেনি দুই বছর। আবার শুরু হলো বর্ষবরণের প্রথাগত আয়োজন রমনার বটমূলে। বাঙালির জন্য পয়লা বৈশাখ সম্পূর্ণ এক নতুন মাত্রা নিয়ে আসে। আমাদের ভিন্ন জাতিসত্ত্বার পরিচিতি এই পয়লা বৈশাখ। ভৌগলিক মানচিত্রের স্বাধীনতা অর্জনের পেছনে ছিল বাঙালির দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম।

সংস্কৃতি মাটি থেকেই উদ্ভূত এক প্রকৃতিক সত্য। আর বাঙালির সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্বের লড়াইটা যদিও শুরু হয় প্রথমত ভাষা দিয়ে কিন্তু পরবর্তীতে সামগ্রিক অর্থে সাহিত্য, সঙ্গীত, পোশাক এবং জীবনাচরণের নানান দিক এতে সম্পৃক্ত হয়। পয়লা বৈশাখ হচ্ছে বাঙালির জীবনের সেই বিশেষ একটি দিন যখন সে তার সার্বভৌম সংস্কৃতিকে তুলে ধরে বিশ্ববাসীর সামনে। সে জন্যই ইংরেজি কিংবা অন্যান্য নববর্ষের তূলনায় বাঙালির কাছে বাংলা নববর্ষ অনন্য। আর বলতে দ্বিধা নেই যে বাংলা নববর্ষের এই সাংস্কৃতিক মাত্রাটি সব চেয়ে বেশি উচ্চকিত এবং উচ্চারিত বাংলাদেশে কারণ বাংলাদেশকেই লড়তে হয়েছে তার সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার জন্য। রমনার উদ্যানের সেই বিখ্যাত বটতলা এখনও বাঙালি সংস্কৃতির যেন এক তীর্থ স্থান হয়ে রয়েছে বাংলাদেশের মানুষের কাছে। সূর্যোদয়ের আগেই সেখানে হাজার হাজার দেশী-বিদেশী মানুষের সমাগম ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য ছায়ানট ছাড়াও আরও বহু সাঙ্গীতিক প্রতিষ্ঠান এই পয়লা বৈশাখে নানান রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। তাদের মধ্যে রয়েছে সুরের ধারার মতো বর্তমানে প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে বের করা হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা।

তবে কষ্টের ব্যাপার হচ্ছে এই যে স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এখন আবার বাঙালি জাতীয়তাবোধ বিরোধী উগ্র মনোভাব সম্পন্ন কিছু লোক পয়েলা বৈশাখতো বটেই, মুক্তিযুদ্ধর অনুভূতিকে প্রান্তিক অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। সেখানে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবমাননা করা হচ্ছে, পহেলা বৈশাখের সময়ে মঙ্গল শোভাযাত্রাকেও গত বছর বন্ধ করা হয়। বাঙালি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এই সব প্রতিবন্ধকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতেই হবে। নইলে যে অনুভূতি নিয়ে আমরা আমাদের জাতিসত্ত্বাকে চিহ্নিত করি, তাতে বাধা পড়বে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং এই মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতাই আমাদের সব সাংস্কৃতিক আয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

আর এ সব কিছুই বাঙালিকে তার শেকড়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। আর এক আশ্চর্য নান্দনিক আনন্দে সকলেই যেন গেয়ে ওঠে ‘আজি প্রাতে সূর্য ওঠা সফল হলো কার?’ কার আবার! বাঙালির।


আনিস আহমেদ | ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র

গবেষক, লেখক এবং বিবিসি ও ভয়েস অফ আমেরিকার প্রাক্তন বেতার সাংবাদিক। স্বনামে ও ছদ্ম নামে দেশ বিদেশের পত্রপত্রিকায় অসংখ্য নিবন্ধ লিখেছেন।

Previous Story

বৈশাখের স্মৃতি, বিভাজনের রাজনীতি

Next Story

নিউইয়র্কে পহেলা বৈশাখ উদযাপন

Latest from সমসাময়িক বিষয়

বৈশাখী যতন

পুতুল বিয়ের পরেই কেমন মনখারাপের পালা, মেয়ের মা-কে উজাড় করে সবটা দেওয়ার জ্বালা। - কবিতাটি রচনা করেছেন ঝর্ণা ভট্টাচার্য্য।